এই সময়। সফিউল আযম
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন
দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক ব্যাধি, এটি একটি সামাজিক সমস্যাও বটে। দুর্নীতির প্রভাব দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন প্রতিটি ক্ষেত্রে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।। দুর্নীতি দমনে সরকারের দায়বদ্ধতার পাশাপাশি জনগণেরও দায় রয়েছে। এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। প্রয়োজন সরকার ও জনগণের কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ। বাংলাদেশ দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক ফ্রেমওয়াকের আওতায় জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের ভূমিকাকে সমর্থন করছে এবং জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী সনদের নির্দেশনা অনুসারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পদ পুনরুদ্ধারে অনেকটাই অগ্রগতি সাধন করেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন, তার সুফল ইতিমধ্যে ভোগ করছে জনগণ। বর্তমান সরকার স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দুর্নীতি কমিশনকে কার্যপরিচালনার জন্য সার্বিক সহায়তা প্রদান করছে। জনগণ যাতে দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ সহজে প্রদান করতে পারে, সেজন্য প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ‘অভিযোগ গ্রহণ বাক্স’ স্থাপন করা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে সুফলও জনগণ পাচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্ম পরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করা এবং আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এবং প্রায়োগিক ব্যবহারে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও তদারকি কার্যক্রমকে জোরদার করছে। ঘুষ, অনোপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার মোতাবেক বেশ কিছু সফল উদাহরণ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্বারোপ করেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অনেকেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়েছেন এবং অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। দুর্নীতির ব্যাপারে কোনো প্রকার শৈথিল্য নয়, বরং সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সততা ও নৈতিকতা চর্চার বিকাশে দেশের প্রায় ৩০ হাজার স্কুল-কলেজে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে সততা সংঘ গঠন করা হয়েছে। যা একটি যুগান্তকারী বলা চলে, কারণ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা ছাড়া কোনোভাবেই দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপের অংশ হিসেবে দেশের ৩ হাজার ৬৫৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সততা স্টোর গঠন করা হয়েছে। এসব সততা স্টোরে খাতা, কলম, পেন্সিলসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ রয়েছে। তবে এসব স্টোরে কোনো বিক্রেতা নেই। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে পণ্যের নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে থাকে। উত্তম চর্চার বিকাশে এসব স্টোর গুরুত্বপূর্ণ অনুকরণীয় ভূমিকা রাখছে। কিশোর বয়সে যেভাবে সততার চর্চা শেখানো হচ্ছে, তা নিকট ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে দুনীতিমুক্ত করতে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে।
দুর্নীতি দমন কমিশন সমাজের সৎ, মর্যাদাবান এবং চারত্রিক দৃঢ়তা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে দেশব্যাপী ৫৪১ টি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেছে। যারা নিজেদের এলাকায় দুর্নীতি প্রতিরোধে সোচ্ছার ভূমিকা পালন করছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো টোল ফ্রি হটলাইন নম্বর চালু। যেকেউ এই নম্বরে ফোন দিয়ে দুর্নীতির তথ্য জানাতে পারেন। কমিশনে দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন ১০৬ চালু হওয়ার পর থেকে সাধারণ জনগণ সুফল ভোগ করছে। তৎক্ষণাৎ দুর্নীতির তথ্য কমিশনকে জানানোর এই উদ্যোগটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু জাতির জনকের শাহাদাত বরণের পর সেই স্বপ্ন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং মুখ থুবড়ে পড়েছে। জাতির জনকের সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নে হাল ধরেছে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকার কর্তৃক বেশকিছু আইন কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯, জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ ইত্যাদি। একথা ঠিক যে, দুর্নীতিকে কেবল আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন অধিকতর সামাজিক আন্দোলন। এই আইনগুলো সামাজিক আন্দোলনের পথকে আরো সুগম করেছে।
দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য আরো বেশি ও বাস্তবধর্মী তথ্যচিত্র নির্মাণ ও প্রচারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর সহায়তায় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের দুর্নীতি বিরোধী ক্ষুদে বার্তা পাঠানোর যে কার্যক্রম কমিশন চালু করেছে, মনে রাখতে হবে বার বার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক বিভিন্ন বার্তা পাঠানো যায়, তা সুফল বয়ে আনবে। দুনীতি দমন কমিশনের যে প্রচারাভিযান রয়েছে, “খারাপ কাজ করবো না-খারাপ কাজ সইবো না”, “ভালো কাজ করবো-দেশকে সবাই গড়বো”, “দেশকে নিয়ে ভাববো, নীতির পথে চলবো”, “সত্য কথা বলবো অন্যায়-অবিচার রুখবো”, “আইন মেনে চলবো-নিরাপদে থাকবো”, “দেশেপ্রেমের শপথ নিন-দুর্নীতিকে বিদায় দিন”, “মিথ্যাবাদীকে কেহ বিশ্বাস করে না”, “গুরুজনের সহিত উপহাস করিও না” ইত্যাদি সুবচন সংবলিত খাতা, স্কেল, জ্যামিতি বক্স দেশব্যাপী ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম, এবং ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করার যে কার্যক্রম রয়েছে, সেটি প্রয়োজনের তুলনায় বেশ নগণ্যই বলা চলে। এটিকে আরো ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দিতে হবে। দুনীতি প্রতিরোধে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও অন্ত নেই। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রভাবশালীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, কিংবা প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে দুদক আশাতীত সফলতা দেখাতে ব্যর্থ হয়। কমিশনে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নৈতিক অবস্থানকে আরো দৃঢ় করতে হবে। সাধারণ জনগণের কাছাকাছি আসতে হলে দৃশ্যমান আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। নৈতিক অবস্থান পোক্ত করার জন্য বেশি বেশি নৈতিকতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুর্নীতিমুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে শিক্ষার সব স্তরে নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রশাসনের সাথে জড়িতদের দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যে কার্যক্রম চালু আছে, এটিকে আরো সম্প্রসারন করা প্রয়োজন। সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই এই শুদ্ধাচার কৌশলের আওতায় নিয়ে আসার পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
দুর্নীতি সার্বিক অগ্রগতি এবং উন্নয়ন ব্যাহত করছে। এটা প্রতিরোধ করা শুধু সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে সম্ভব নয়। সর্বস্তরে মূল্যবোধ সৃষ্টি এবং সচেতনতা বাড়ানো। সামাজিক অবক্ষয় রোধ ও নৈতিকতা শিক্ষার মাধ্যমে কিছুটা রোধ করা সম্ভব হলেও প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। প্রথমে নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত ঘোষণা এবং তারপরই এই সামাজিক আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ার মধ্য দিয়েই একটি বৃহৎ পরিসরে সুফল পাওয়া যেতে পারে। পিআইডি নিবন্ধ
০৩.০৬.২০২০


