২৪শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

দেওবন্দের সূর্য সন্তান ‘মাওলানা কাজি মুতাসিম বিল্লাহ’

  • ফয়জুল্লাহ আমান

মহান আল্লাহর নিরানব্বইটি গুণের মধ্যে দুটি গুণ প্রকাশ করা হয়েছে জাহির ও বাতিন শব্দে। জাহির অর্থ প্রকাশ্য ও বাহ্যিক, বাতিন অর্থ অপ্রকাশ্য গুপ্ত ও আভ্যন্তরীণ। অন্তর্মুখি ও বহির্মুখি শব্দেও ব্যক্ত করা যায়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার গুণগুলি প্রতিটি মুসলিমকে নিজের ভেতর আত্মস্থ করতে হবে বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে হাদীসে। তাখাল্লাকু বিআখলাকিল্লাহ। তোমরা আল্লাহর আখলাক বা গুণে নিজেদের বিভূষিত করো। ইসলাম ধর্মের এক বড় সৌন্দর্য হচ্ছে, এখানে জাহের ও বাতেনের সুসমন্বয় রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, পবিত্র কুরআনের একটি জাহের আছে আরেকটি বাতেন রয়েছে। ইবনু হিব্বানের বর্ণনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি আয়াতের একটি জাহের ও বাতেন রয়েছে। অর্থাৎ একটি বাহ্যিক ও অন্য আরেকটি গুঢ় অর্থ।

মানুষের গঠন যেমন বাহ্যিক আকার আকৃতি ও আভ্যন্তরীণ মানস প্রকৃতির সমন্বয়ে, ইসলামেরও দুটি দিক। এ দুটির সমন্বয়ে আল্লাহর দ্বীনের পূর্ণতা প্রতিষ্ঠিত। মাক্কি জিন্দেগি ছিল মুসলিমদের অভ্যন্তর গড়ে তোলার সময়। অপরদিকে মাদানি জীবনে বাহ্যিক অগ্রগতি লাভ হয়েছে। জাহেরকে সুসংহত করতে হলে বাতেনকে অবশ্যই সুদৃঢ় করতে হয়। মাদানী জীবনের ভিৎ গড়েছে মূলত মাক্কি জীবনের নির্মাণ। আনসারিদের তুলনায় মুহাজিরদের শ্রেষ্ঠত্ব এজন্যই স্বতসিদ্ধ বিষয়। মায়ের পেটে যে শিশুটির গঠন ঠিকভাবে নির্মিত হবে না বাইরের পৃথিবীতে এসে সে পূর্ণ অবয়ব ফিরে পাবে কি করে? এককথায় অন্তর্মুখিতা বিহীন বহির্মুখিতা; গড়ার চেয়ে নষ্ট করে বেশি। নির্মাণের চেয়ে ধ্বংসই হয় তার পরিণতি।

ভূমিকা দীর্ঘায়িত না করে আমি আমার মূল কথাটি বলে ফেলব। আমাদের উস্তায মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. মূলত একজন অন্তর্মুখি মানুষ ছিলেন। অন্তর্মুখিতাই ছিল তার জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। প্রথম জীবনে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন সত্য। পাকিস্তান আমলে জমিয়তের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ছিলেন প্রথম সারির নেতৃবৃন্দের একজন। অথচ তখন তরুণ বয়স। সেই সময় মাঠে ঘাটে সভা সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। সাংগঠনিক কাজে ব্যয় করেছেন দীর্ঘ সময়, শ্রম ও মেধা। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। সব কিছু বাদ দিয়ে একান্ত মুদাররিস হয়ে ছিলেন জীবনের শেষ অর্ধেক।

কওমী অঙ্গন নিয়ে তার নিজস্ব ভাবনা ছিল। ঢাকার মালিবাগে তিরিশ বছরে একটি অনুপম মাদ্রাসা গড়ে তোলেন। এই মাদ্রাসার আদলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠে আরও বহু প্রতিষ্ঠান। এই সব প্রতিষ্ঠানে তার প্রভাব এখনও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। তিনি তাঁর ছাত্র শিষ্যদের মাধ্যমে যে বিষয়টির গুরুত্ব দিতেন সেটি হচ্ছে দারুল উলুম দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার চেষ্টা করা।

একজন ছাত্রকে তারবিয়াতের মাধ্যমে প্রকৃত মুসলিম রূপে গড়ে তোলা। কেবল পড়াশোনা নয়।

দারুল উলুম দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য কী? এ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। অনেক কথা বলা যায় এ বিষয়ে। কিন্তু একটি কথা খুবই পরিস্কার। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যক্তিগঠনের উদ্দেশ্যে। ব্যক্তির মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র ভাবনা। একজন ছাত্রকে তারবিয়াতের মাধ্যমে প্রকৃত মুসলিম রূপে গড়ে তোলা। কেবল পড়াশোনা নয়। তালিমের সাথে সাথে তারবিয়াত। প্রথম দিকে একজন আগন্তুক দারুল উলুম দেওবন্দে ঘুরতে এসে বলেছিলেন দর মাদরাসা খানকা দিদাম। মাদরাসার ভেতর আমি সুফিদের খানকা দেখেছি। সেসময় মুহতামিম থেকে নিয়ে দারোয়ান ও চাপরাশি পর্যন্ত প্রত্যেকেই ছিল সাহিবে নিসবত বুযুর্গ। প্রত্যেকেই রাত জেগে তাহাজ্জুদ নামায পড়ত। এই চেতনার উপরই গড়ে উঠেছিল দারুল উলুম দেওবন্দ।

ভারতীয় উপমহাদেশে সাহাবা তাবেয়ি যুগ ফিরিয়ে এনেছিল দেওবন্দ। আলিগড় ও নদওয়ার সাথে তুলনা করে এজন্যই উর্দু ভাষার বিখ্যাত কবি আকবর ইলাহাবাদি বলেছিলেন, আলিগড় হচ্ছে একটি সম্মানিত পেট। অর্থাৎ বৈষয়িক ভাবনার বাইরে সেখানে কিছু নেই। নদওয়াকে বলেছিলেন যবান বা জিহ্বা। ভাষা সাহিত্যের চর্চার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। আর দেওবন্দের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে বলেছিলেন দরদি অন্তর। বড় দরদ দিয়ে আকাবিরে দেওবন্দ উপনিবেশ আমলের মুসলিম সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

মাওলানা কাসিম নানুতুবি ও মাওলানা রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি রহ. বিপ্লবী আলেম ছিলেন। তারা ঘরের ভেতর গর্তে মুখ গুজে থাকা মোল্লা মুনশি ছিলেন না। কিন্তু তারা কেন মাদ্রাসা ও খানকার চার দেওয়ালে আবদ্ধ হলেন? একটি বড় স্বপ্ন নিয়ে। কী ছিল সেই স্বপ্ন? এটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে পৌনে দু’ শ বছর আগের ভারতবর্ষে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ দেখুন। তারও আগে ইংরেজদের বাংলা দখল দেখুন। সিরাজুদ্দৌলা পলাশির আম্রকাননে পরাজিত হলেন। ভারতের স্বাধীনতা সূর্য অস্ত গেল।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ এ সময় বুঝতে পারছিলেন, ঘুনে ধরে গেছে মোগল সাম্রজ্যের ভিত। নড়বড়ে হয়ে গেছে মুসলিমদের সব প্রতিষ্ঠান। প্রথম তিনিই এ শ্লোগান ওঠান, ফুক্কা কুল্লা নিজাম, পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলো, ভেঙ্গে ফেল সব শৃংখল। কিন্তু এই শৃংখল ভেঙ্গে ফেলার অর্থ অরাজকতা সৃষ্টি নয়। বরং সমাজের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সংস্কার কার্যক্রম সূচিত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। শাহ ওয়ালিউল্লাহ বুঝতে পারছিলেন, দ্রুততার সাথে বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে পুরনো ব্যবস্থা। নতুন পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজকে নতুন করে গড়ার কাজ তিনি তখনই শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। মাওলানা নানুতুবি বুঝতে পারেন এখন বস্তুবাদের নতুন এক আগ্রাসি ফেতনা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। এ থেকে বিশ্ব মানবতাকে বাঁচাতে হলে আধ্যাত্মিকতার নতুন সবক ছড়িয়ে দিতে হবে সমাজে।

মুসলিমদের বিজয়ের সময় আর পরাজয়ের সময় এক নয়। এই কথাটি কাজি সাহেব আমাদের বলতেন। আমি একবার হেদায়ার একটি ইবারত নিয়ে গেলাম। যেখানে যিম্মিদের সাথে আচরণের বিষয়ে একটি কথা আমার কাছে একটুও পছন্দ হচ্ছিল না। কাজি সাহেব মনে পড়ে তখন আমাকে একথাটি বলেছিলেন, মুসলিমদের বিজয়ের সময়ের প্রেক্ষাপট আর বর্তমান প্রেক্ষাপট এক নয়। এই কিতাবগুলো লেখা হয়েছে আব্বাসী খেলাফতের সময়ে। যখন মুসলিমদের স্বর্ণ যুগ ছিল। পৃথিবীকে তারাই শাসন করতো।

একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল মুসলিমদের। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের কারণে কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হয়। এই কৌশলগত পরিবর্তন দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবিররা করেছেন। সময়ের ভাষা তারা বুঝতে পারছিলেন। তারা কেবল বাতাসে ভেসে চলতেন না। বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করার মত যোগ্যতা তাদের ছিল। সে যোগ্যতা না থাকলে একটি শিক্ষা ব্যবস্থা শত ঝড় ঝাপ্টার ভেতর দিয়ে দেড় শতাধিক বছর বিশ্বব্যাপী টিকে থাকতে পারে না।

বর্তমান দুনিয়ায় মুসলিমদের যে মাক্কি জীবনের পার্ট চলছে সে বিষয়টিই আমরা কাজি হুজুরের কাছ থেকে বুঝেছি।

সোজা সাপ্টা বললে, ইসলামে বীরত্ব ও নির্ভিকতার এক চর্চা আছে। রাসূল সা.-এর জিহাদগুলো এর উৎস। কিন্তু এই জিহাদের মূলে মক্কার তের বছরের দীর্ঘ সাধনা। যেখানে একেকজন সাহাবিকে নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন রাসূল সা.। তো বর্তমান দুনিয়ায় মুসলিমদের যে মাক্কি জীবনের পার্ট চলছে সে বিষয়টিই আমরা কাজি হুজুরের কাছ থেকে বুঝেছি। এসময় আগামি সংগ্রামের জন্য উম্মাহকে গড়ে তোলাই মূল কাজ। শক্তিই যখন নাই তখন মিথ্যা আস্ফালন আর শক্তির বড়াই না করে কিছুটা কোমলতা আর নরম মাটির মত করে নিজেদের অন্তর্জগত তৈরিই গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যায় বহু হলেও আজকের মুসলিমদের শক্ত ভিতের জন্য ভূমিকা স্বরূপ যেই তিতিক্ষা প্রয়োজন সেটাকে অস্বীকার করা যায় না। ময়দানে হয়ত নামতে হবে একসময়। কিন্তু তার জন্য সৈনিক হিসেবে গড়ে নিতে হবে ইসলামি কাফেলাকে।

এখানে একটি উদাহরণ খুব প্রাসংগিক মনে করছি। মনে করুন, একজন নারী যে আজনবী, যার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, এমন এক নারীকে দূর থেকে উঁকি মেরে দেখলেই অসচ্চরিত্র লুইচ্চা ইত্যাদি গাল শুনতে হবে। কিন্তু এই মেয়েটিকেই বিবাহ করার পর যদি কেউ তাকে পর্দা করে চলে তাহলে সেটা হবে চরম নির্বুদ্ধিতা। তো সব কিছুর একটা সময় আছে। সময়কে পাঠ করা শিখতে হবে। বিয়ের পর যেই দৃষ্টি প্রশংসনীয় ইবাদত, সময়ের আগে সেই দৃষ্টিই হয়ে যায় চরম পাপ। একটা মাটির ঘড়া কাদা মাটি দিয়ে তৈরির পর শুকানোর আগেই যদি তাতে পানি রাখা হয় তাহলে তা গলে নষ্ট হয়ে যাবে। পুরোপুরি গড়ে পিটে নেবার পর যত পানিই তাতে রাখা হোক তা গলবে না, নষ্ট হবে না। এখনকার মুসলিম সমাজের যে অবস্থা তাতে এই মুসলিমদের নিয়ে বহির্মুখি প্রোগ্রামের চেয়ে অন্তর্মুখি কার্যক্রম অধিক আবশ্যক জ্ঞান করতেন কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহ.।

বিশেষত কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে ছিল তার সুদূর প্রসারী চিন্তা। দীর্ঘ সময়ের গবেষণায় একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি। দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তার সঙ্গে যা ছিল সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। তালিবুল ইলমদের পাঠ নিমগ্ন করার আজীবন সাধনা করে গেছেন। কিতাবের পোকা বানাতে চেয়েছেন ছাত্রদের। আশির দশকের গোড়ায় ঢাকার মালিবাগ মাদ্রাসাকে কেন্দ্র কওমী মাদ্রাসা কেন্দ্রিক একটি ছাত্র সংগঠন সাড়া ফেলেছিল সারা দেশে। লাজনাতুত্তালাবা। এই লাজনাতুত্তালাবায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন তারা পরবর্তী সময়ের ইসলামী অঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখনও তাদের সগর্ব উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ., মাওলানা ইসহাক ফরীদী রহ., মাওলানা যাকি রহ., মাওলানা ডক্টর মুশতাক আহমাদ প্রমুখ আলেম মনীষী এই লাজনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা ও লেখকদের মাঝে মাওলানা হেমায়েত, মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ, মাওলানা আবুল বাশার, মাওলানা আব্দুল গাফফার, মাওলানা আব্দুল মতিন, মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ ও মাওলানা জায়নুল আবেদিন সহ অসংখ্য লেখক সাহিত্যিক চিন্তক এই সংগঠনের সদস্য ছিলেন।

হুজুর চেয়েছিলেন এই সংগঠনটিকে মাদ্রাসা অঙ্গনের বাইরে প্রসারিত না করতে। পক্ষান্তরে লাজনার অন্যান্য আকাবিররা চেয়ে ছিলেন ভিন্ন কিছু। তাই তারা পরবর্তীতে বারিধারা মাদরাসায় গিয়ে নতুন আঙ্গিকে লাজনার কার্যক্রম শুরু করেন। এর থেকেই বোঝা যায় কতটা অন্তর্মুখি ছিলেন মাওলানা কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহ.। মূলত এটাকে রক্ষণশীলতাও বলা যায়। যুগের যে পরিস্থিতি তাতে তিনি আস্থা রাখতে পারতেন না। কোনো নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে না আবার তালিবুল ইলমদের ইলম চর্চার ক্ষতি হয়ে যায়। খুব সচেতনভাবে মাঠের আন্দোলন সংগ্রামের বদলে তিনি চাইতেন মাদ্রাসার ছেলেরা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মুকাবেলার জন্য প্রস্তুত করুক নিজেদের। মাদ্রাসার ভেতরই সাময়ীক আবদ্ধতা বেছে নিক তারা। গড়ে উঠুক একটি দক্ষ দল। যোগ্যতাসম্পন্ন আলেমদের এক বিরাট কাফেলা।

ইসলামপন্থি রাজনীতিবিদদের সাথে বিবাদে না জড়িয়ে তিনি মাদ্রাসার ছাত্রদের ইলমি আমলি দিক নিয়ে কাজ করা জরুরি মনে করেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশের পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে বিপ্লবাত্মক এক রাজনীতির সূচনা করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ কংগ্রেস নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। সুধীর বাবু নামে একজন হিন্দুকে বানান এর সভাপতি এবং নিজে হন জেনারেল সেক্রেটারি। কিন্তু কিছু দিনেই বুঝতে পারেন এখানের ইসলামপন্থিরা এটাকে অগ্রসর হতে দিবে না। ইসলামপন্থি রাজনীতিবিদদের সাথে বিবাদে না জড়িয়ে তিনি মাদ্রাসার ছাত্রদের ইলমি আমলি দিক নিয়ে কাজ করা জরুরি মনে করেন। কারণ বিশুদ্ধ ইলম সংরক্ষণ করতে না পারলে ইসলামের বিশুদ্ধ রূপ ধরে রাখা যাবে না। ইলমে দ্বীনের গুরুত্ব ছিল কাজি সাহেব রহ.-এর কাছে অপরীসীম। যার কারণে তালিবুল ইলমের পড়াশোনার ক্ষতি তিনি কোনো ভাবেই মানতে পারতেন না। যেসব প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন সব খানেই বা-যওক উস্তাদ নিয়োগ দিয়েছেন। সব সময় তিনি মেধাবী ও প্রতিভাবানদের কদর করতেন। প্রতিভার বিকাশে সহায়তা করতেন জীবনভর। যার যে প্রতিভা তাকে সে দিকে অগ্রসর হবার পরামর্শ দিতেন।

কওমী অঙ্গনে আজ এত বছর পরও তিনি প্রাসংগিক হয়ে আছেন যে কারণে তাহলো তার দৃঢ়তা। নিজের মাসলাক মাশরাবের দৃঢ়তা ছিল অনন্য এক বৈশিষ্ট্য। কেবল অন্তর্মুখিতাই নয়। তার ভেতর ছিল অসম্ভব রকমের এক দার্ঢ্য। সকালে এক রকম বিকালে আরেক রকম এমন পরিবর্তন পসন্দ করতেন না তিনি। জীবনের শুরু থেকেই যেন একটি দর্শন লালন করতেন। বিনয় ও দৃঢ়তার অনন্যতা ছিল তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক। সত্য ও সুন্দরের প্রত্যয় ছিল তার মানসভূমিতে সুদৃঢ়ভাবে প্রথিত। ইসলামি সমাজ নির্মাণের এক দৃঢ় সংকল্প ফুটে উঠত তার চিন্তা ও কর্মে। উন্নত আখলাকে বিভূষিত ছিলেন। ছিলেন দরদি কা-ারি। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের সূর্য সন্তান এবং অসংখ্য আল্লাহ ওয়ালা আলেমের দীক্ষাগুরু। আল্লাহ তার মাকাম উচু করুন। তার কবরকে নূর দিয়ে ভরপুর করুন।

লেখক: খতিব, শিক্ষক, গবেষক

আরও পড়ুন: পাকিস্তানের ভিত্তি; একটি নির্মোহ পর্যালোচনা

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান কাসেমী, সিনিয়র মুহাদ্দিস জামিআ ইকরা বংলাদেশ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com