দেওবন্দ আমার চেতনার বাতিঘর

দেওবন্দ আমার চেতনার বাতিঘর

দেওবন্দ আমার চেতনার বাতিঘর

আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: ৩০ মে। ১৮৬৬ সনের এই দিনে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারাণপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে, ভিত স্থাপন করেন হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতবী রহ.।

কি এক বিভীষিকাময় অবস্থা। চারিদেকে শুধু লাশ আর লাশ। বাতাসে ভেসে আসে লাশ পঁচার গন্ধ। কেননা, দোর্দণ্ড- প্রতাপশালী ব্রিটিশবাহিনী যেভাবে আলেমদের হত্যা করেছিল, পুরো ভারতবর্ষ যেন ছিল ওদের কসাই খানা।

রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল আলেমদের তাজা রক্তে। গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয় হাজার হাজার আলেম। জালিমের বন্দী খানায় কাতরাতে হয়েছে শত- সহস্র নবীর ওয়ারিছের। নিরপরাধ আলেমদের স্কন্ধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল কত যে জুলুম – নির্যাতনের খড়গ, তা হিসেব করা যাবে না।

ইংরেজ বাহিনী হণ্যে হয়ে গিয়েছিল এদেশের শাসন কার্য অব্যাহত রাখতে। কিন্তু দুর্দমনীয় আলেম সমাজ বুক চিতিয়ে দিয়েছেন, তাজা রক্ত ঢেলেছেন, শহীদ হয়েছেন, তারপরেও তাঁরা ছিল বীর সেনানী। আলেমগণ ছিলেন বীর মুজাহিদের ভূমিকায়। পরাজয় বরণ করেন নি। বশ্যতা স্বীকার করেননি ইংরেজদের কাছে।

এমনই এক সংকটময় সময়ে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বীন ইসলামের বাতি নিভু নিভু প্রায়। সে বাতি প্রজ্জালন করা, দেশের স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব অন্যের হাতে বন্দী, সেই হাত থেকে ছিনিয়ে স্বাধীনতার সূর্য উদয় করার মানসে নতুন এক তাহরিক বা সংগ্রামের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন আমাদের পুর্বসুরী আলেম সমাজ।

আমরা যাদের উত্তরসুরী। তাদের কেউ কিন্তু বাদ যায়নি ব্রিটিশ জালিম শাহীর রোষানল থেকে। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী রহ., রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ., কাসেম নানুতবী রহ., শায়খুল হিন্দ রহ., মাদানী রহ.।

এসব বুজুূর্গরা যেমন খানকায়ে পীর ছিলেন আবার ময়দানে বীরের ভূমিকায় ছিলেন। সশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে। বহু আলেমের ফাঁসির অর্ডার হয়েছিল, গুলির অর্ডার হয়েছিল। তারপরেও তাঁরা ছিলেন হক- হক্কানিয়্যাতের উপর অটল- অবিচল। আর জেল খাটাতো তাদের কাছে মামুলি ব্যাপার। কত বুজুূর্গ কত বার জেলে বন্দী ছিলেন তা আল্লাহ পাক মালুম।

যাইহোক, সেই ক্রান্তিকালে দারুল উলুম দেওবন্দ আলোর পথ দেখাল। অন্ধকারাচ্ছন্ন জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দিল। জালিমের জুলুমে অতিষ্ঠ হওয়া মানুষকে ঠাঁই দিল দারুল উলুম দেওবন্দ।

কি যে এক সময়োপোযোগী সিদ্ধান্ত ছিল আমাদের মুরুব্বীদের, তা বর্ননা করার ভাষা আমার নেই। এমন গন্তব্যে যাচ্ছিল এ জাতি, এদেশ, হয়ত আমরা হারিয়ে যেতাম। আজ এদেশে আমাদের মুসলমানিত্ব টিকে থাকত কিনা সন্দেহ হয়। এখনো হয়ত আমাদের গোলামীর শেকল বাঁধা থাকত। মুখ খুলতে পারতাম না। ওদের কাছে ধর্না দিতে হত সারাটা জীবন।

আজ যদি দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত না হত, কোথায় যেতাম আমরা? একটু মনের ভিতরে জিজ্ঞেস করলেই বেরিয়ে আসবে। আজ দারুল উলুমের উছিলায় সারা ভারত বর্ষ এমনকি বিশ্বের আনাচে- কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে ইলমে হাদীসের সৌরভ। দেওবন্দের অবদানে দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে ভরে গেছে বিশ্বের সব জায়গায়। দেওবন্দের মেহনতে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র দাওয়াতের কাজ।

একটু চেয়ে দেখুন! স্পেন, তুরস্ক, রাশিয়া, কি সোনালী অতীত আমরা হারিয়েছি। যেখানে বিশ্বের বাঘা বাঘা মুহাদ্দিস, ফকীহ দের পদচারণা ছিল, আজ যেন সে স্মৃতি যাদুঘরে। চীন, ইরাক, সিরিয়া, আরো কত মদীনাতুল ইলম, তার যৌবন হারিয়ে গেছে। সেখানে কলাল্লাহ- কলার রাসূলের ধ্বনি শোনা যায় না।
আজ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান,নেপাল, বার্মার মানুষ গুলোর ইসলামী তাহযীব -তামাদ্দুন টিকে আছে, দেওবন্দের অবদানে। এক মশাল যে জ্বলছে, যার আলো ছড়িয়েছে বিশ্বময়। এমন জ্যোতি প্রজ্জ্বলিত হয়েছে যার দীপ্ত শিখায় জয় করছে মানুষের হৃদয়।

কিছু অকৃজ্ঞ আজো ভুল করে। দারুল উলুম কে থোড়াই কেয়ার করে। উলামায়ে দেওবন্দ নিয়ে অমূলক কথা বলে। ওরা কি জানে? আসলেই তারা জানেনা। কোন ইতিহাস তারা পড়েনি। কোন জ্ঞান তাদের নেই।

মডারেট ইসলামের দাবীদার এবং তার অনুসারীগণ, দারুল উলুম দেওবন্দের অবদানকে অস্বীকার করে। নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করতে চায়। বড় মুজাহিদ সাজে। মনে রাখতে হবে, ঐ মডারেট ইসলামের দাবীদারের বয়স তখন কত? জন্ম কোন সনে? সে তো সেদিনের মানুষ। আর তার কিসের অবদান? তিনি তো বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। ইসলামকে কাঁট- ছাট করে উপস্থাপন করেছেন। আর তারই জন্ম হত না মুসলিম পরিবারে। যদি উলামায়ে দেওবন্দের এই ত্যাগ – কোরবানী না থাকত।

আমাদের এই উপমহাদেশে আমরা মুসলিম, আমরা সুন্নতে নববীর অনুসারী, সব কিছু দেওবন্দের ই অবদান। আপনারা একটু খোঁজ নিন, এই বাংলাদেশে যত মাদ্রাসা আছে, চাই সেটা কওমী নেসাবের হোক,বা আলিয়া হোক, সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে জিজ্ঞেস করুন, হয়ত সে সরাসরি দেওবন্দের সন্তান, নয়ত তার উস্তাদ, নয়ত তার দাদা উস্তাদ দেওবন্দের সন্তান।

মোটকথা, দারুল উলুম দেওবন্দের অবদান এদেশের পরতে পরতে। মাটি- মানুষের সাথে মিশে আছে। এই উপমহাদেশ এমনকি বিশ্বের মানুষের ঈমান-ইসলামের পাহাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

শুধু মাদরাসার দেওয়াল কেন্দ্রীক নয়। আর কিতাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। একদিকে ইলমে হাদীসের সিলসিলা জারি রেখেছে, অন্য দিকে খানকায়ে ইসলাহে নফসের মিশন চালু করেছে, আবার গর্জে উঠেছে বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে।

এজন্য দেওবন্দের সন্তানগণ এমনই।একমুখি নয়। চার দেয়ালের মধ্যে তাদের বিচরণ নয়। মাদ্রাসার দ্বীনি ইলম চর্চার সাথে সাথে আত্মশুদ্ধির মেহনত, দাওয়াতের মিশন নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিশ্বময়। আবার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, খোদাদ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম।

দারুল উলুমের প্রতিটি সন্তান তাই তো দুর্বার। গতি তাদের সীমাহীন। অদম্য -সাহসী সৈনিক তারা। দেওবন্দের ইতিহাস- ঐতিহ্য -অবদান কিতাব গুলো নাড়া-চাড়া করলে স্পষ্ট হবে। বুঝে আসবে সব কিছু।

বর্তমানেও দ্যুতি ছড়াচ্ছেন দেওবন্দের সন্তানেরা। পাক- ভারত উপমহাদেশ থেকে বিশ্বের সব জায়গায় সর্বাগ্রে দেওবন্দীদের মিশন। বাতিলের সাথে আপোসহীন। ময়দানে খালেদ বিন ওয়ালীদের মত দুরন্ত গতিতে ছুটেই চলেছে।

যেথায় যাবেন,সেখানেই দেওবন্দের সুর্য সন্তানেরা। কোন ময়দান চান? সব ময়দানে এগিয়ে। হৃদয় জয় করছে মানুষের। দৃষ্টি দিচ্ছে পথ ভোলা মানুষকে। সত্যি আমার গর্ব। আমার চেতনার বাতিঘর দারুল উলূম দেওবন্দ। আল্লাহ তুমি কেয়ামত পর্যন্ত এই ইদারার খেদমত চালু রাখ। আমিন ছুম্মা আমিন।
লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *