২৭শে মার্চ, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ , ১৩ই চৈত্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৪ঠা রমজান, ১৪৪৪ হিজরি

ধর্মান্তকরণ নয় মানবসেবাই হোক মূল নিয়ামক

প্রতীকী ছবি

মুহাম্মাদুল্লাহ ইয়াহ্ইয়া : কুতুপালং, শাহপরীদ্বীপ এ নামগুলো আগে শুনে না থাকলেও এখন আমাদের কাছে সেগুলো বেশ পরিচিত। কেবল দেশের মানুষের কাছেই নয়, বরং অনেক বিদেশি, বিশ্বের নানান মিডিয়া ও সংস্থার কাছে এ স্থানগুলো এখন বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিদেশী অনেক অতিথি ও সংস্থা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আসছেন। পর্যবেক্ষণ করছেন। এর কারণটাও কমবেশ সকলের জানা।

মূলত শান্তি ও সাম্যের মিথ্যা স্লোগানদাতা বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্রবৌদ্ধরা সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াও এবং জাতিগত নিধন শুরু করে গত ২৫ আগস্ট ২০১৭ থেকে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী অশান্তির প্রতিমূর্তি অন সান সূচিও তাতে ছিল নীরব সমর্থন, বরং পরোক্ষ নির্দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে এম. এস. এফ নামক সাম্যবাদী ডাক্তারদের একটি সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে জানা যায়, প্রথম মাসেই ৬৭০০ রোহিঙ্গা মুসলিমকে জ্বালিয়ে এবং নির্মম সব উপায়ে হত্যা করা হয়। বাস্তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশী বলে আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন মহল।

২৫ আগস্ট ব্যাপক আকারে গণহত্যা আর জাতিগত নিধন শুরু করলেও এর সুচনা ছিল বহু আগ থেকে। মূলত বৃটিশ শাসন থেকে মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করার পর সেনা শাসনের শুরুলগ্ন থেকেই এ জুলুম ও মানবাধিকারবিরোধী জঘন্য আচরণ চলতে থাকে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে আসছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা। মিয়ানমারের সেনাশাসিত সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে নাগরিক বিভিন্ন সুবিধা এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করে আসছিল। সর্বশেষ ২৫ আগস্ট পরিকল্পিত একটি হামলার নাটক সাজিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নির্মমতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং উগ্র-সাম্প্রদায়িক বৌদ্ধরা। শুরু হয় নির্লজ্জ হত্যাযজ্ঞ। মানবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বরবরতার চরম মাত্রা প্রদর্শন করে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। এর ফলে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়। এর মধ্যে ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণ করে। মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সেনাবাহিনী এবং উগ্র বৌদ্ধরা এখনো হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছে। এখনো যারা পালিয়ে আসছেন তাদের বিবরণ তেমনই।

মানবতার স্বাভাবিক চাহিদা থেকেই বিশ্বের নানান দেশ, সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গ আক্রান্ত এ সকল রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা এগিয়ে আসেন। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের সামনে এক উজ্জ্বল মডেল হয়ে আছে। এ ছাড়াও তুরস্ক, সৌদি আরবসহ অসংখ্য মুসলিম দেশ সাথে সাথে ইউনেস্কো, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ তাদের সহযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মগুরু ২৬৬ তম পোপ ফ্রান্সিস মিয়ানমারের রাজধানী ‘নেপিদ’তে হাজির হন। এরপর তিনি বাংলাদেশে আগমন করনে। রোহিঙ্গাদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এ জন্য তিনি বিশ্ববাসীর প্রশংসাও কুড়িয়েছেন বেশ। এভাবে বিশ্ববাসী এগিয়ে এলে রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধান করা সহজ হবে। পাশাপাশি চরম মানবতাবিরোধী অপরাধের জঘণ্য আসামী মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্তা নেয়ার প্রক্রিয়াটি আলোর মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়।

তবে আমরা এখানে অন্য একটি বিষয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাই। ইতিহাসের চরম বাস্তবতার কারণে এ বিষয়টি সামনে আনতে হচ্ছে। আমরা বলতে চাই যে, রোহিঙ্গাদের প্রতি এ সমবেদনা প্রদর্শনের পিছনে কেবল মানবতার সেবা করার ব্যাপারটিই ক্রিয়াশীল হোক, ভিন্ন খারাপ কোন উদ্দেশ্য যেন এর পিছে কাজ না করে। উদ্দেশ্য হোক মানবসেবা: ধর্মব্যবসা নয়। মানবিক বিপর্যয়ের শিকার এ সকল রোহিঙ্গাতের মতার্দশ ও ধর্মীয়চেতনাকে সওদা করার কোন দুরভিসন্ধি যেন এর পিছে কাজ না করে।
এ বিষয়টি সামনে আনার পিছে এ সম্প্রদায়টির চাতুরতাপূর্ণ ও ন্যাক্কারজনক যে ইতিহাস আমাদের সামনে রয়েছে তা হল, ১৯৯৯ সালের ৭ নভেম্বর রোজ রবিবার ভারত সফর করেছিলেন খ্রিষ্টান জগতের তৎকালীন পোপ দ্বিতীয় জন পল। নয়াদিল্লির নেহরু স্টেডিয়ামে ৭০ হাজার লোকের এক প্রার্থনা সভায় তিনি সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এশিয়ায় চার্চের ভবিষ্যৎ নীতির মূলভিত্তি হবে ধর্মান্তর।’ আমাদের দেশে বহু সংখ্যক খৃষ্টানমিশনারী সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। মিশনারীদের অনুদাননির্ভর অসংখ্য এনজিও ধর্মান্তর কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। – (সূত্র : ত্রিত্ববাদ ও হযরত ঈসা আ. : সংকলন- মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী রহ. সম্পাদনা- মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ দা. বা., প্রকাশকাল- জানুয়ারী ঃ ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ / শাওয়াল ঃ ১৪২০ হিজরী)

ইতিপূর্বে বৃটিশ সরকারের ছল-চাতুরীপূর্ণ সুদীর্ঘ জালেম শাসন আর ধর্মান্তরকরণের নির্লজ্জ অপচেষ্টার ইতিহাসও রয়েছে আমাদের সামনে। তৎকালে তারা যেখানে ব্যবসাকে ব্যানার হিসাবে ব্যবহার করেছিল এবং এক পর্যায়ে সারা উপমহাদেশের সাবভৌমত্ব হরণ করে নিয়েছিল, সেখানে বর্তমানে তাদের ব্যানার হল ‘সেবা’। এভাবে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আদর্শ ও স্বাধীনতার উপর আঘাত; সর্বপরি দেশের সার্বভৌমত্ব হরণ করা এ জাতিটির পুরনো ঐতিহ্য। ঘৃণ্য বদভ্যাস। বর্তমানেও দরিদ্র শ্রেণির অসহায় মানুষকে নানান অপকৌশলে বিকৃত ও মনগড়া ধর্মের প্রতি আকর্ষণের পায়তারা করছে। কাজেই সকলের এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা বাঞ্ছনীয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যেন এভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং সর্বোপরি দেশবাসীর বিশ্বাস ও সংস্কৃতির জন্য এরা হুমকি হয়ে উঠতে না পারে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে এবং বর্তমানে রোািহঙ্গা বসতির এলাকাগুলোতেও। সরকারের পাশাপাশি মূলত এ ব্যাপারটি দেখার কর্তব্য বর্তায় দায়ীদের উপর। বিশেষত যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। যেন অভাব আর বিপর্যয়কে পুঁজি করে মুসলমানদের ঈমান ও আমলকে বরবাদ করার কোন সুযোগ এরা না পায়। আল্লাহ তাআলা তাদের কাজে সহায় হোন। পরিশেষে আমরা আবারো বলতে চাই, রোহিঙ্গাসহ সব বিপর্যস্ত মানবতার সহযোগিতার উদ্দেশ্য হোক মানবসেবা; ধর্মব্যবসা নয়।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com