৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

নির্যাতনের কারণে শিশুরাও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে : গবেষণা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : শিশু নির্যাতনের ফলে শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া ছাড়াও রোগ প্রবণতা তাদের সুস্বাস্থ্যের ব্যাপারে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ ১৬ দশমিক ২ শতাংশ, যার মধ্যে ছেলে শিশুর সংখ্যা বেশি। অতিরিক্ত সময় বসে থাকা, স্থূলতা এবং শারীরিক পরিশ্রম না করাকে ঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোভিড মহামারি চলাকালীন ২০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন মাত্রার অনিদ্রায় আক্রান্ত হয়েছিল, যার মধ্যে যথাক্রমে ১৮ শতাংশ, ১৪ শতাংশ এবং ১৬ শতাংশের বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং দুশ্চিন্তা ছিল।

বৃহস্পতিবার (১৭ নভেম্বর) ‘বিশ্ব শিশু দিবস-২০২২’ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের আয়োজনে (বিএসএমএমইউ) ‘শিশু স্বাস্থ্য, বিকাশ ও সুরক্ষা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিভাগটির বিগত পাঁচ বছরে শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সেখানে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা এনজিও কর্মকর্তা ও কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে শিশুস্বাস্থ্য, বিকাশ ও সুরক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রকল্প এবং অ্যাকাডেমিক গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের বিগত পাঁচ বছরের ১৮ বছরের নিচের জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

পাঁচটি থিম অনুযায়ী গবেষণার ফলাফলগুলো উপস্থাপন করা হয়। শিশু অধিকার এবং সুরক্ষা বিষয়ে গবেষণা উপস্থাপন করেন ডা. মারিয়াম সাল, অনলাইনে শিশু নির্যাতন শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন মুহাম্মদ ইব্রাহীম ইবনে তৌহিদ, শৈশবের বিরূপ অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করেন ডা. নীলিমা বর্মন, শিশু নির্যাতন বন্ধে মিডিয়ার ভূমিকা বিষয়ক গবেষণা উপস্থাপন করেন শাবনাম আযীম এবং ‘অসংক্রামক রোগ: শিশু বিকাশের অন্তরায়’ বিষয়ে গবেষণা উপস্থাপন করেন ডা. মো. মারুফ হক খান।

গবেষকরা জানান, বিশ্বজুড়ে শিশু নির্যাতন স্বাস্থ্যের জন্য একটি উদ্বেগজনক ঘটনা এবং শিশু বিকাশের জন্য একটি বড় বাধা হিসেবে স্বীকৃত। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে এবং অন্যান্য সামাজিক নির্দেশকও অগ্রসর হয়েছে। যদিও ১৯৯০ সালে শিশু অধিকার সনদ গৃহীত হওয়ার পর থেকে শিশু নির্যাতন রোধে তেমন কোনও অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি।

ঢাকা শহরের টারশিয়ারী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অটিজমে আক্রান্ত ৪৫ জন শিশুর মায়েদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখা যায়— ৩ থেকে ৯ বছর শিশুর প্রত্যেকেই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মাঝে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ কোনও না কোনও সময়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় ১ হাজার ৪১৬ জন ১১-১৭ বছর বয়সী শিশুর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, (ছেলে/মেয়ে এবং নির্বিশেষে), বাড়িতে, স্কুলে এবং কর্মক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন, ১৭ শতাংশ মানসিক নির্যাতন এবং ৭৮ শতাংশ অবহেলার শিকার হয়। গবেষণায় আরও দেখা যায় যে, কর্মজীবী শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং বস্তি এলাকায় বসবাসকারী শিশুরা অত্যাচারের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সি ৪৬০ জন শিশুর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৩৩ শতাংশ শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তাদের মাঝে কমপক্ষে একটি, দুটি বা তিনটি সাইবার অপরাধের প্রবণতা ছিল। শিশুরা বেশি শিকার হয়— এমন বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের মধ্যে ছিল উৎপীড়ন, উপহাস, গুজব কিংবা অপমান, অসৎ উদ্দেশ্যে বেনামে যোগাযোগ, যৌন-নিপীড়নমূলক বার্তা কিংবা মন্তব্য এবং যৌনতাপূর্ণ ছবি বা ভিডিও।

গবেষকরা জানান, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের নীতির কারণে, ইন্টারনেট ব্যবহারের হার অনেক বেড়েছে। ইন্টারনেট সম্পর্কে কম জ্ঞান এবং সঠিকভবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারার কারণে, অপরাধীরা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিশুদেরকে নির্যাতন করতে সক্ষম হয়।

২০২১ সালে বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের ৪৫৬ জন শিক্ষার্থীর (নবম ও দশম শ্রেণী) ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণা থেকে পাওয়া— ৫৬ শতাংশ কিশোর এবং ৬৪ শতাংশ কিশোরী ইন্টারনেট মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। শহরে শিশুদের মধ্যে ইন্টারনেটে যৌন নিপীড়নের ঘটনা গ্রামীণ শিশুদের চাইতে দেড় গুণেরও বেশি। গবেষণাটিতে পাওয়া যায়, যেসব শিশু ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং চ্যাটরুম ব্যবহার করে তাদের ইন্টারনেট মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

৯ থেকে ১৩ বছর বয়সী ২৪ জন শিশুর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, শিশু নির্যাতন সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি গতানুগতিক এবং কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা, যার মারাত্মক শারীরিক এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া আছে। বিশেষত কমবয়সী শিশু, মেয়ে-শিশু এবং গরীব শিশু তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। পরিবার, খোলা এবং কর্মক্ষেত্রে তারা নিম্নস্তরে এবং নিম্ন অবস্থানে থাকায় তাদের কথায় গুরত্ব দেওয়া হয়না।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু নির্যাতনের ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো প্রায়ই শিশু যৌন নির্যাতনের মারাত্মক ঘটনাগুলো এমনভাবে প্রকাশ করে, যা নৈতিকতা বিবর্জিত। প্রিন্ট মিডিয়া বিষয়ভিত্তিক প্রতিবেদনের চেয়ে এপিসোডিক প্রতিবেদন বেশি প্রকাশ করে শিশুর বিকাশ, সুরক্ষা এবং সুস্থতার সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পাঠকদের অবহিত করার সুযোগটি হাতছাড়া করছে।

প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতা শিশুর ১৮ বছর বয়সের আগে ঘটে যাওয়া আঘাতমূলক এবং পীড়াদায়ক ঘটনা— যা শিশুরও মানসিক, শারীরিক এবং যৌন নির্যাতন, মানসিক এবং শারীরিক অবহেলা, পিতামাতার বিচ্ছেদ, মায়ের প্রতি সহিংসতা, বাড়িতে মাদকের ব্যবহার, পরিবারে মানসিক রোগী থাকা এবং পরিবারের সদস্যদের কারাবাস— এ বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। শৈশবে একটি প্রতিকূল অভিজ্ঞতা, প্রাপ্ত ব্যক্ত অবস্থায় সামগ্রিক শারীরিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে দ্বিগুণ করে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব মায়েরা তিন বা ততোধিক প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, তাদের মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা সম্পন্ন শিশু জন্ম দেয়ার সম্ভাবনা চারগুণ বেশি। অন্য একটি গবেষণায় প্রাপ্ত বয়স্কদের বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার সঙ্গে প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার একটি উল্লেখযোগ্য যোগসূত্র পাওয়া গেছে। আরও দেখা যাচ্ছে যে, বেশি প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। যেসব মহিলা বেশি প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিল, তাদের মধ্যে স্বামীর হাতে সহিংসতার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com