নেপালে জেন-জি আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ

নেপালে জেন-জি আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দুই দিনের তীব্র আন্দোলন ও ব্যাপক সহিংসতার মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউডেলও পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দেশটিতে জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ক্রমে তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও সরকারি অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শুরু হয়। খবর : ইন্ডিয়া টুডে, আলজাজিরা, দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট ও হিমালয়ান টাইমস-এর।

গত সোমবার থেকে নেপালে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রথমে বিক্ষোভকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। কিন্তু খুব দ্রুত আন্দোলন রাস্তায় নেমে আসে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ অন্তত সাতটি শহরে তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন এবং সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালান।

বিক্ষোভকারীরা নেপালি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, বিভিন্ন মন্ত্রী ও রাজনীতিকের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেন ও ভাঙচুর চালান। রাজধানী কাঠমান্ডুতে অন্তত ১৭ জন এবং ইতাহারিতে দুইজন নিহত হন। আহত হয়েছেন চার শতাধিক বিক্ষোভকারী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

অলি সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করে, যার ফলে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। পরিস্থিতি দ্রুতই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ কারণে কাঠমান্ডু, ললিতপুর ও ভাক্তপুর জেলায় কারফিউ জারি করা হয়, তবে বিক্ষোভকারীরা তা উপেক্ষা করে আবার রাস্তায় নেমে আসে।

প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ : বিক্ষোভের তীব্রতার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউডেলও পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগের পর অলি দেশের বাইরে প্রস্থান করতে পারেন বলে জানা গেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে সেনাবাহিনী তাকে নিরাপদে দেশ ত্যাগে সহায়তা করছে। বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনের মধ্যেই অলির বাসভবনে আগুন দেয়া হয়। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন জোটের শরিক নেপালি কংগ্রেস পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও কয়েকজন মন্ত্রীর বাড়িতেও হামলা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সেনারা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মন্ত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেন।

পার্লামেন্টে আগুন ও গণমাধ্যমে হামলা : প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর শত শত বিক্ষোভকারী পার্লামেন্ট ভবনে প্রবেশ করে প্রধান ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সাথে কাঠমান্ডু ও কান্তিপুরের বিভিন্ন গণমাধ্যম অফিসেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এই পরিস্থিতির কারণে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং শহরে ধোঁয়া ও অগ্নিসংযোগের কারণে ফ্লাইট স্থগিত রাখা হয়েছে।

আলোচনায় বালেন্দ্র শাহ : অলির পদত্যাগের পর দেশজুড়ে তরুণ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ। তাকে সমাজে তরুণ নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বালেন্দ্র শাহর জন্ম ১৯৯০ সালের ২৭ এপ্রিল। পেশায় তিনি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার, র‌্যাপার, কবি ও রাজনীতিক। ২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র হওয়ার পর তিনি সাহসী পদক্ষেপ নেন; যেমন শহরের ময়লা-আবর্জনা সঙ্কট সমাধান, নদী দখলমুক্তকরণ, অবৈধ স্থাপনা ভাঙার উদ্যোগ এবং সিটি কাউন্সিলের সভা সরাসরি সম্প্রচার।

জেন-জি আন্দোলনের সময় তিনি তরুণদের পাশে থেকে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। পদত্যাগের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের সংযত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ হয়ে গেছে, এখন সংযত হওয়ার সময়। দেশের সম্পদ নষ্ট হওয়া মানে আমাদেরই ক্ষতি। নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হলো নেপালের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠন করা।’

শিক্ষার্থী ও তরুণদের ভূমিকা : বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তারা সহিংসতা প্রশমনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। জেন-জি প্রজন্মের খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দেশ এখন আমাদের নেতৃত্বে এসেছে। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা যাবে না। ধৈর্য ও সংযম নিয়ে আমরা সামনে এগোব।’

চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেছেন। নতুন রাজনৈতিক সমাধানের জন্য একটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বে নাগরিক সরকার গঠন এবং নতুন নির্বাচনের আয়োজন প্রয়োজন। এই পথেই আমরা নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব।’

নিরাপত্তা ও সেনা উদ্যোগ : বিক্ষোভের তীব্রতার কারণে দেশের সেনা, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। সাধারণ জনগণকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেল বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। আমরা সব নাগরিককে শান্ত থাকার এবং আরো প্রাণহানি ও সম্পদের ধ্বংস এড়ানোর আহ্বান জানাই। সব পক্ষকে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান বেছে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।’

সেনাপ্রধান ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করার পরও শান্তি বজায় রাখা নাগরিকদের দায়িত্ব। পাশাপাশি তারা নিরাপদে দেশে চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।

বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট : নেপালের সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং দুর্নীতির অভিযোগে বিক্ষোভকারীদের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ও হতাশা জেন-জি আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিক্ষোভের মূল কারণগুলো হলো- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বার্তা অ্যাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা। সরকারের দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব। অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অব্যবস্থা।

বিক্ষোভকারীরা প্রধানত জেন-জি প্রজন্মের তরুণ। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে উঠে এসেছে এবং নতুন নেতৃত্বের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বালেন্দ্র শাহকে কেন্দ্র করেছেন। এ দিকে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইন্সও নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে। সেনা ও পুলিশ পার্লামেন্ট, মন্ত্রীর বাসভবন ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।

উল্লেখ্য, নেপালে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ফলে নতুন নেতৃত্ব ও অন্তর্বর্তী সরকারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে উঠে আসা তরুণ নেতা বালেন্দ্র শাহ নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সরকার, সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীরা শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।

নেপালের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। নতুন নেতৃত্ব, সংলাপ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা আগামী কয়েক সপ্তাহে স্পষ্ট হবে।

Related Articles