১৩ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১৪ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

পবিত্র কুরআনের রুকু গণনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

পবিত্র কুরআনের রুকু সংখ্যা নিয়ে মতানৈক্য ও রুকু গণনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

  • মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

আল-কুরআন মহান আল্লাহর কালাম। এর প্রতিটি শব্দ ও অক্ষর আল্লাহর পক্ষ থেকে সংরক্ষিত। মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্তের ভিত্তি পবিত্র কুরআন। এ জন্যই প্রতিটি যুগে কুরআন সংরক্ষণের জন্য মুসলিম উম্মাহ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বিভিন্ন ভাবে কুরআনের সেবা করেছেন উলামায়ে উম্মত। কেউ কুরআনের তাজভীদ ও উচ্চারণ নিয়ে কাজ করেছেন, কেউ এর তাফসীর রচনা করেছেন, কেউ এর ভাষা ও অলংকার বিষয়ক তত্ত্ব তুলে ধরেছেন, কেউ কুরআন সংকলনের ইতিহাস লিখেছেন, কুরআনের আয়াত গণনা করেছেন, কেউ কুরআনের শব্দ সংখ্যা এবং অনেকে হরফ সংখ্যাও গণনা করেছেন।

আল কুরআনের সাথে সংশ্লিষ্ট জ্ঞানসমূহকে উলুমুল কুরআন বলা হয়। উলুমুল কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে তাজযিআতুল কুরআন। অর্থাৎ কুরআনের ভাগ। কুরআনকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা হয়েছে যুগে যুগে। পারা, হিজব, মঞ্জিল, রুকু এবং আরও অনেকভাবে কুরআনকে ভাগ করা হয়েছে। এই প্রবন্ধে প্রধানত আলোচনা করা হবে কুরআনের রুকু সংখ্যা নিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে অন্যান্য ভাগ ও প্রকরণের যৎসামান্য ইঙ্গিতও থাকবে।

রুকু অর্থ: সর্বমোট কয়টি রুকু রয়েছে কুরআনে? এ বিষয়টি জানার আগে আমাদের জানতে হবে আলকুরআনে রুকু বলতে কী বোঝায়, এবং এর সূচনা কোত্থেকে? নামাজের রুকু আর কুরআনের রুকু কি এক? এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দুটি মত রয়েছে। সারাখসি রহ. কুরআনের রুকুর অর্থ করেছেন রাকাআত। এক রাকাতে যতটুকু তেলাওয়াত করা হবে তার জন্য পরিমাণ নির্ধারণী সংকেতকে রুকু নাম দেওয়া হয়েছে।

অন্য একটি মত হচ্ছে রুকু অর্থ নামাজের রুকুই। কুরআনের রুকুকে রুকু নাম করণের কারণ হচ্ছে, এই পরিমাণ তেলাওয়াতের পর হাফেজরা রুকুতে চলে যেত। এজন্য নির্দিষ্ট পরিমান কোরআনের আয়াতকে রুকু বলা হয়। আলখাত্তুল উসমানি ফিররসমিল কুরআনী গ্রন্থে সনদ ছাড়া একটি মত উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত উসমান জুমার দিন যে পরিমাণ কুরআন তেলাওয়াত করে রুকুতে যেতেন সেই পরিমাণকে রুকু নাম করণ করা হয়েছে। [পৃ. ৩৪-৩৬]

কুরআনের আয়াত গণনার প্রাচীন কিতাব স্পেনের বিখ্যাত কারি আবু আমর দানির আল বায়ান ফি আদ্দি আয়িল কুরআন। সেখানে কুরআনের বিভিন্ন ভাগ নিয়ে আলোচনা হলেও রুকু ভাগ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। কিন্তু তার সমসাময়িক একজন হানাফী মনীষী শামসুল আইম্মা সারাখসি রহ. রুকু সম্পর্কে আলোচনা করেন। ইমাম সারাখসির আগে অন্য কোনো মনীষীর কিতাবে রুকু সম্পর্কে আলোচনা করতে দেখা যায়নি। সারাখসির মৃত্যু ৪৮৩ হি.। দানির মৃত্যু ৪৪৪ হি.।

ইমাম সারাখসি রুকু সংক্রান্ত তথ্য উদ্ধৃত করেছেন তার পূর্বের একজন মনীষী থেকে। কাজি ইমাম ইমাদুদ্দিন রহ. নামের একজন আলেমের বরাতে তিনি লিখেন, বুখারার মাশায়েখগণ কুরআনকে ৫৪০ টি রুকুতে ভাগ করেন। কাজি ইমাদুদ্দিন সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য রিজালশাস্ত্রের কিতাবে পাওয়া না গেলেও ধারণা করা যায় তিনি চতুর্থ শতকের মনীষী ছিলেন। কাজেই বুখারার মাশায়েখদের রুকুর পদ্ধতির সূচনা আরো আগের।

মুলতানের বিখ্যাত কেরাত শাস্ত্রবিদ রহিম বখশ রহ. (মৃ. ১৪০২ হি.) লিখেন, তিনশ হিজরির শুরুর দিকে অর্থাৎ তৃতীয় হিজরি শতকের শেষ বা চতুর্থ হিজরি শতকের শুরুতে পবিত্র কুরআনের রুকু পদ্ধতির সূচনা হয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহর সমসাময়িক সিন্ধুর বিখ্যাত আলেম হাশিম থাট্টুভি রহ. এর আগে রুকু সংখ্যা নিয়ে কাজ করেছেন। সিন্ধুর থাট্টা অঞ্চলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। আরব সাগরের তীরবর্তী এই শহরে অনেক বড় বড় আলেম জন্মেছেন।

হাশিম থাট্টুভি রচিত অনেক কিতাবের মাঝে রুকু বিষয়ে লিখিত কিতাবটি খুবই গুরুত্ব রাখে। তার পূর্বে এবং পরেও এ বিষয়ে স্বতন্ত্র কিতাব খুব একটা পাওয়া যায় না। হাল জামানায় সিন্ধুর আরেকজন মনীষী মক্কার উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ডক্টর আব্দুল কাইয়ুম সিন্ধি সংক্ষিপ্ত একটি পুস্তিকা লিখেছেন। কিন্তু সেখানে অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ততায় রুকু সংখ্যা বিষয়ে পাঠকের কৌতুহল অবদমিত হওয়ার চেয়ে আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মূলত এই পুরো বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের দীর্ঘ গবেষণা করা আবশ্যক। এই সংক্ষীপ্ত প্রবন্ধে রুকুর সূচনা এবং এর পেছনের রহস্যটা যৎকিঞ্চিত তুলে ধরার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

মা-ওয়ারাউন্নাহার, বুখারা সমরকন্দ ও ভারতবর্ষে এই রুকুর প্রচলন হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তুরস্কেও প্রচলন ছিল। কিন্তু উসমানী খেলাফতের পর সেখানে এই রীতি বিলুপ্ত হয়। হিজায, আন্দালুসিয়া, মিসর, আফ্রিকা ও সিরিয়ায় এর প্রচলন হয়নি কখনওই। বর্তমান দুনিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তান আফগানস্তান ও এসব দেশের আশপাশের অঞ্চলসমূহে মুসহাফগুলোতে রুকু হিসাব করা হয়। প্রত্যেক সুরা ও প্রত্যেক পারার রুকুর সংখ্যা লেখা থাকে এসব দেশের মুসহাফগুলোয়। আরবি আইন হরফ দিয়ে রুকুর চিহ্ন দেওয়া হয়। আইনের উপরে নিচে ও মধ্যখানে তিনটি সংখ্যা থাকে। উপরের সংখ্যাটি সুরার রুকু সংখ্যা, নিচেরটি পারার রুকু সংখ্যা এবং মাঝের সংখ্যাটি প্রত্যেক রুকুর আয়াত সংখ্যা। প্রত্যেক সুরার শুরুতে উল্লেখ থাকে এ সুরায় কতগুলো রুকু আছে। বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের মুসহাফগুলোয় রুকুর সংখ্যা রয়েছে ৫৫৮টি।

রুকু সংখ্যা নিয়ে তিনটি ধারা চালু হয়। ৫৫৮, ৫৪০ ও ৪৮০। বুখারায় প্রথম যখন রুকু নির্ধারণ করা হয় তখন এর সংখ্যা ছিল ৫৪০টি। ইমাম সারাখসি থেকে আমরা যেমনটি উল্লেখ করেছি। কিন্তু পরবর্তীতে উপমহাদেশের মুসহাফগুলোয় ৫৫৮টি রুকুতে ভাগ করা হয়ে আসছে। ৪৮০ সংখ্যাটি তৈরি করেছেন সিন্ধুর হাশিম থাট্টুভি। তিনি সুরা ভিত্তিক রুকু না করে পারা ভিত্তিক রুকু নির্ধারণ করেন। প্রত্যেক পারায় ১৬ টি রুকু, এভাবে তিরিশ পারায় ৪৮০ টি রুকু হয়। তিনি অবশ্য রুকু শব্দটিও পরিবর্তন করে ফেলেন। রুকুর বদলে তিনি মাকরা ও মাকারি নাম প্রস্তাব করেন। তার কিতাবের নাম রাখেন তুহফাতুল কারী বি জামইল মাকারি।

মাকরা শব্দটি কিরআত থেকে উদগত। মাকরা অর্থ পাঠ্যাংশ। একেক রাকাতে যতটুকু অংশ পাঠ করা হবে সেটি একটি মাকরা। এই বিবেচনায় তিনি মাকরা নামকরণ করেন। এভাবে সেসময় সিন্ধুর মুসহাফগুলোতে ৪৮০টি রুকু বা মাকরা নির্ধারিত হয়েছিল। কোনো কোনো কুরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি গবেষক এধরনের মুসহাফ দেখতে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এর কোনো ফটো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। হাশিম থাট্টুভির কিতাবের পাণ্ডুলিপি রয়েছে।

রহিম বখশ রহ. রুকুর সূচনার ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন, বুখারায় একসময় তারাবির নামাজের প্রতি রাকাতে দশ আয়াত পড়ে রুকু করার নিয়ম ছিল। একেক দিন দুশ আয়াত তেলাওয়াত করা হতো। এভাবে তিরিশ দিনে ৬ হাজার আয়াত তেলাওয়াত হতো। কুরআনের আয়াত সংখ্যা কুফি গণনামতে ৬২৩৬ টি। শেষের দিনগুলোয় কিছু বেশি পড়ে কুরআন খতম করা হতো। কিন্তু এই পদ্ধতির এক সমস্যা ছিল এই যে, প্রথম দিকের দুশ আয়াত অনেক দীর্ঘ হতো, শেষের দিকে খুব সংক্ষিপ্ত হয়ে তেলাওয়াত হতো।

এছাড়া বুখারার মাশায়েখগণ দেখলেন দশ আয়াত পড়ে রুকুতে গেলে অনেক সময় একটি বিষয়ের মাঝখানে থেমে যেতে হয়। তাই তারা রুকু নির্ধারণ সূচনা করলেন। অর্থের সাথে সংগতি রেখে রুকু ভাগ করলেন। একেক রাকাতে একেক রুকু তেলাওয়াত করলে ৫৪০ রুকু শেষ হয় সাতাশ রমজান রাতে। সাতাশ তারিখ শবে বরাতের সম্ভাবনাময় রাত, সেই হিসেবে ২৭ রমজানে শেষ হয়- এভাবেই রুকু সংখ্যা নির্ধারণ করেন। ২৭ দিনে বিশ রাকাত করে মোট ৫৪০ রাকাত নামাজ হয়।

ছোট ছোট সুরাগুলোয় তখন কিভাবে রুকু গণনা করা হতো তা জানা যায় না, কিন্তু বর্তমান মুসহাফগুলোয় প্রতিটি ছোট সুরাকে একটি রুকু ধরা হয়েছে। তিরিশতম পারায় মোট সুরা সংখ্যা রয়েছে ৩৭টি। রুকু সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯টি। সুরা নাবা ও নাযিয়াতে দুটি করে রুকু, এছাড়া অন্য সব সুরায় একটি একটি রুকু নির্ধারণ করা হয়েছে।

রহিম বখশের আলখাত্তুল উসমানি ফিররসমিল কুরআনি গ্রন্থ থেকে যে ইতিহাস উল্লেখ করলাম তা থেকে একটি তথ্য পাওয়া যায়, বুখারা সমরকন্দ ও মা- ওয়ারাউন্নাহারের অন্যান্য অঞ্চলে তারাবিহর নামাজে দশ দশ আয়াত পড়ার রীতি ছিল। এই রীতিটি সেখানে কিভাবে তৈরি হলো সে বিষয়ে রহিম বখশ কিছু লেখেননি। ইমাম দানি রহ. এ সম্পর্কে একটি অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন। সেখানে সনদসহ হযরত উসমান, ইবনু মাসউদ, উবাই ইবন কাআব রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সা. দশ দশ আয়াত করে শিক্ষা দিতেন। দশটি আয়াত মুখস্থ করে এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বুঝে পরবর্তী দশ আয়াতের শিক্ষা গ্রহণ করতেন এই সব সাহাবি। [দানি, পৃ. ৩৩]

আবু আব্দির রহমান সুলামী বলেন, আমরা কুরআনের দশ আয়াত শিখে এর মাঝে যে হালাল হারাম রয়েছে তা ভালো করে বুঝে পরবর্তী দশ আয়াত শিখতাম। হযরত সাফওয়ান ইবনুল মুআত্তাল রা. সুত্রে নবীজী সা. থেকেও দশ আয়াত তেলাওয়াতের একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন দানী রহ.। সাফওয়ান রা. বলেন, আমি নবীজী সা.কে এক সফরে দেখেছি, মধ্যরাতে ঘুম থেকে জেগে সুরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত তেলাওয়াত করেছেন। ইবনু আব্বাস থেকেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। [দানী পৃ. ৩৪]

তাউস থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, তোমাদের কেউ কি আছে যে রাতে দশটি আয়াত তেলাওয়াত করবে, আল্লাহ তাকে একশটি নেকি দিবেন। [পৃ. ৩৫] এমন অনেক রেওয়ায়াতে দশ সংখ্যার উল্লেখ রয়েছে। সম্ভবত এসব রেওয়ায়াতের ভিত্তিতেই মাওয়ারাউন্নাহরের হাফেজ সাহেবরা তারাবির নামাজের প্রত্যেক রাকাতে দশ আয়াত তেলাওয়াত করতেন।

বর্তমান সময়ে হাফেজ সাহেবরা রুকু হিসেবে নয় বরং পৃষ্ঠা হিসেবে তারাবিতে তেলাওয়াত করেন। প্রতিদিন একপারা/দেড়পারা। এখনও অধিকাংশ মসজিদে সাতাশ তারিখেই খতমের রেওয়াজ রয়েছে। কুরআনকে তিরিশ পারায় ভাগ করার কথা রাসূলের যুগে না থাকলেও হাদীসে এর ইশারা রয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. আমাকে বললেন, হে আমর, একথা কি সত্য, তুমি সারা রাত জেগে নামাজ পড়, সারা দিন রোজা রাখ? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, কথা সত্য। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তাহলে এমন করো না। রোজা রাখবে এবং রোজাহীনও থাকবে। রাতে নামাজ পড়বে আবার কিছু অংশ ঘুমাবেও। মাসে তিনটি রোজা রাখাই তোমার জন্য যথেষ্ট। আর মাসে একবার কুরআন খতম করবে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি তো এর চেয়ে বেশি পারি। রাসূল সা. বললেন, তাহলে বিশ দিনে এক খতম করো। আব্দুল্লাহ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি এর চেয়ে বেশি পারি। রাসূল সা. বললেন, তাহলে তুমি দশ দিনে কুরআন খতম করো। আমি বললাম, আমি এর চেয়েও বেশি পড়তে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি সাত দিনে কুরআন খতম করো, এর চেয়ে বেশি পড়ার প্রয়োজন নেই। রাসূল সা. আরো বললেন, তুমি দীর্ঘ জীবন লাভ করতে পারো। অর্থাৎ এখন যৌবনে অনেক আমল করা সম্ভব হলেও বার্ধক্যে এই পরিমাণ তেলাওয়াত করা কষ্ট হবে। আমলের নিয়ম হচ্ছে, একবার কোনো আমলের রুটিন করে নিলে সারা জীবন সেভাবে আমলের চেষ্টা করতে হয়।

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর বলেন, রাসূল সা. যা বলেছিলেন, তা-ই হলো, আমী এখন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি। এখন সাতদিনে কুরআন খতম করতে কষ্ট হয়। হায়, আমি যদি রাসূল সা.-এর কথা মেনে নিতাম, নিজের উপর এমন কঠোরতা চাপিয়ে না নিতাম। [বুখারী, মুসলিম।] বুখারী মুসলিম সহ অন্য অনেক হাদীসের কিতাবেই এ ঘটনায় রাসূল সা.-এর এ বাণীও বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমার শরীরের হক রয়েছে, তোমার চোখের হক রয়েছে, তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে, তোমার অতিথি ও সাক্ষাতপ্রার্থিদেরও হক রয়েছে।’ তো এই দীর্ঘ হাদীসে পাঠক দেখতে পাচ্ছেন, রাসূল সা. প্রথমে এক মাসে কুরআন খতমের নির্দেশনা দিয়েছেন। এক মাসে তিরিশ দিন। তিরিশ দিন প্রত্যেক দিন সমান একপারা ভাগ করে নেওয়ার নির্দেশনা এ হাদীস থেকেই পরবর্তী মুসলিমরা লাভ করেছে।

  • প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তেলাওয়াত

প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি অংশ তেলাওয়াতের নিয়ম নবীজীর সিরাত থেকেই দেখতে পাওয়া যায়। সংক্ষিপ্ততার উদ্দেশ্যে আমরা এখানে কেবল দুটি বর্ণনা তুলে ধরছি।

১. মুহাম্মাদ ইবনু আব্বাদ ইবন জাফর থেকে বর্ণিত, একটি প্রতিনিধি দল মক্কা মুকররমায় রাসূল সা.-এর নিকট আসল। তারা রাসূল সা.কে তাদের প্রয়োজনে কথা বলার জন্য সময় দিতে অনুরোধ করল। রাসূল সা. তাদেরকে বললেন, আজ রাতে আমার কুরআনের নির্ধারিত অংশ পড়া হয়নি। (জুযই মিনাল কুরআন) [আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং ৫৯৮৩]

২.. হযরত আউস ইবনু হুযাইফা (মৃ. ৫৯ হি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা তায়েফের ছাকিফ গোত্রের প্রতিনিধি দলের সাথে রাসূল সা.-এর নিকট আসলাম। রাসূল সা. আমাদের গোত্র বানু মালেকের লোকদেরকে একটি খিমায় থাকতে দিলেন। প্রত্যেক রাতে ইশার নামাজের পর তিনি আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন। দাড়িয়ে দাড়িয়ে তিনি আমাদের সাথে কথা বলতেন। একদিন আসতে অনেক দেরি করলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আজ রাতে আমাদের কাছে আসতে যে আপনি দেরি করলেন? রাসূল সা. বললেন, হ্যাঁ, আমার কুরআনের নির্ধারিত অংশ পড়া সম্পন্ন হয়নি, তাই আমি নির্ধারিত অংশ তেলাওয়াত সম্পন্ন না করে বের হওয়া পছন্দ করিনি। আউস বলেন, আমি রাসূলের সাহাবিদের কাছে জানতে চাইলাম, আপনারা কিভাবে কুরআনকে ভাগ করেন? তারা আমাকে জানালেন, তিন, পাঁচ, সাত, নয়, এগার, তের ও মুফাসসাল অংশ। [ইবনু মাজাহ, অনুচ্ছেদ: কত দিনে কুরআন খতম করা হবে? হাদীস নং ১৩৪৫]

  • এই হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, রাসূল সা.-এর যুগে কুরআনকে সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছিল।

১. প্রথম তিন সুরা, অর্থাৎ সুরা বাকারা, আলে ইমরান, নিসা।
২. সুরা মায়েদা থেকে তাওবা, পাঁচ সুরা।
৩. সুরা ইউনুস থেকে নাহল, সাত সুরা।
৪. সুরা বানী ইসরাইল থেকে ফুরকান, নয় সুরা।
৫. সুরা শুআরা থেকে ইয়াসিন, এগার সুরা।
৬. সুরা সাফফাত থেকে হুজুরাত, তের সুরা।
৭. সুরা ক্বাফ থেকে শেষ পর্যন্ত, মুফাসসালাত।

সাহাবিদের যুগে এই সাত মঞ্জিল ছিল। অবশ্য মঞ্জিল নামটি পরবর্তীদের ব্যবহার। তখন হিজব, জুয, বিরদ বা এর সমার্থক অন্য শব্দ বলা হতো। সাত দিনে কুরআন খতম করতেন অধিকাংশ সাহাবি। হাদীসে পারার সমার্থক আরবি শব্দ জুয ও হিযব শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান পারার অর্থে সেই জুয বা হিযব শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। পারা ফার্সি শব্দ, এর অর্থ টুকরো, অংশ, খণ্ড।

রাসূল সা. ও সাহাবীদের প্রতিদিন তেলাওয়াতের একটি রুটিন থাকত। সেটিকে জুয, বিরদ ও হিযব শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হতো। পরবর্তীতে সাহাবাদের যুগের শেষ দিকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের (মৃত্যু ৯৫ হি.) তত্ত্বাবধানে তিরিশ পারা নির্ধারণ হয়। এ ছাড়া আরও অনেক ভাগের কথা ইতিহাসে রয়েছে। বক্ষমাণ নিবন্ধের শেষ দিকে এ বিষয়ে কিছুটা ইঙ্গিত করা হবে ইনশাআল্লাহ।

বর্তমান আরবের মুসহাফগুলোতে তিরিশ পারার সাথে ৬০ হিযবের ভাগও রয়েছে। যুগের চাহিদা অনুসারে এমন বহু ভাগ পবিত্র কুরআনের সুরা ও পারার মাধ্যমে হয়েছে। রুকুর ধারা এই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। মাওয়ারাউন্নাহারে তারাবির নামাজে পড়ার সুবিধার্থে এর সূচনা হলেও এটি এ অঞ্চলের মুসহাফগুলোর স্থায়ী নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো প্রকাশনীর মুসহাফই এই রুকুর নিয়ম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। অবশ্য আজকাল কিছু কিছু প্রকাশনী আরবের নিয়মে কুরআন প্রকাশের চেষ্টা করছেন। তারা হয়ত বর্তমান সময়ে রুকুকে গুরুত্বহীন মনে করছেন।

রুকুর গুরুত্ব এখনও রয়েছে। আলেম উলামা সাধারণ মানুষকে কুরআনের তাফসীর করার সময় অনেক ক্ষেত্রে একেক মজলিসে একেক রুকুর তরজমা তাফসীর করেন। এতে পরিমাণ নির্ধারণে সাহায্য হয়। কারণ সাধারণত এই রুকুগুলি সুসংগত। কোথাও কোথাও অসংগতি আছে। যেমন সুরা ওয়াকিআর প্রথম রুকু শেষ করা হয়েছে ৩৮ নং আয়াতে। যেখানে আসহাবুল ইয়ামীন অর্থাৎ জান্নাতি ডান দিকের লোকদের কথা আলোচিত হয়েছে। আসহাবুল ইয়ামীনের পর আসহাবুশশিমাল শুরু হয়েছে ৪১ নং আয়াত থেকে। সেই হিসেবে ৩৯ ও ৪০ নং আয়াত প্রথম রুকুর অন্তর্ভুক্ত হলে সুন্দর হতো। চল্লিশ নং আয়াতে প্রথম রুকু শেষ করা নিঃসন্দেহে অধিক যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু এমন অসংগতি খুব কম স্থানেই পরিলক্ষিত হয়।

অনেকে না বুঝেই উপমহাদেশের রুকু পদ্ধতির সমালোচনা করেন। অনারবীয় মূর্খতা বলে বিদ্রুপ করেন। অথচ আলকুরআনুল কারীমকে বিভিন্নভাবে ভাগ করার প্রচলন রাসূল সা.-এর যুগ থেকেই শুরু হয়েছে। অনারবদের মত রুকু পদ্ধতি না হলেও আরবেও নানান ভাগের চল আছে শুরু থেকেই। বর্তমান আরবের মুসহাফে হিযব পদ্ধতি আছে। তিরিশ পারায় ষাট হিজব। উপমহাদেশে হিযব নেই, কিন্তু রুবু, নিসফ ও ছালাছাতু আরবা’ তথা অর্ধেক পারা, এক চতুর্থাংশ ও তিন চতুর্থাংশ-এর হিসেব বিদ্যমান।

নিম্নে আমরা রাসূল সা.-এর যুগের কুরআনের সুরা সমূহের আরেকটি প্রকরণের উল্লেখ করব। এই ভাগগুলো এখনও রয়েছে। যদিও এর জন্য মুসহাফসমূহে কোনো সংকেত বা চিহ্ন দেওয়া হয় না। কিন্তু এই ভাগটি সর্বজনবিদিত।

ফিকহের কিতাবে এই ভাগটির প্রয়োজন হয়। নামাজের সুন্নাত কেরাত নির্ধারণে আলোচনা হয় এই ভাগের কথা। ১১৪ সুরাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। এই প্রকরণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই করেছেন। চার ভাগের প্রতিটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে রেওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করা যাক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, (১)‘আমাকে তাওরাতের বদলে দেওয়া হয়েছে সাতটি সুরা। (২)যাবুরের স্থলে দেওয়া হয়েছে মিইন (শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সুরা সমূহ)। (৩)ইঞ্জিলের স্থলে আমাকে দেওয়া হয়েছে মাসানি। আর (৪)মুফাসসালাত সুরাসমূহ দিয়ে আমাকে আরও অধিক মহিমান্বিত করা হয়েছে। [তাবারানি]

  • এই চারটির প্রত্যেকটির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো-

১. তিওয়াল: অর্থাৎ দীর্ঘতম সুরাসমূহ। সুরা ফাতিহার পর মোট আটটি সুরাকে তিওয়াল বলা হয়। কুরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ সুরাসমূহ হচ্ছে সুরা বাকারা থেকে সুরা তাওবা পর্যন্ত সর্বমোট আটটি সুরা। এটিকে সাত সুরাও বলা হয়। মূলত সুরা আনফাল ও সুরা তাওবাকে এক ধরে সাত সুরা, তা না হলে মৌলিকভাবে শুরুর আটটি সুরাকে তিওয়াল বলা হয়। বাকারা, আলে ইমরান, নিসা, মায়েদা, আনআম, আরাফ, আনফাল ও তাওবা।

২. মিইন: সুরা তাওবার পরবর্তী এগারটি সুরাকে মিইন বলে। মিইন শব্দটি মিআতুন থেকে উদ্গত। এর অর্থ শত আয়াত বিশিষ্ট সুরা। যেসব সুরায় শতাধিক আয়াত রয়েছে সেগুলোকে মিইন বলা হয়। সুরা আম্বিয়ার পর সুরা হুজুরাত পর্যন্ত সূরাসমূহের মাঝে যেসব সুরায় শতাধিক আয়াত রয়েছে সেগুলো মিইন-এর অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে।

৩. মাসানি: এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বারংবার পঠিত। সুরা জুমারের ২৩ নং আয়াতে পূর্ণ কুরআনকেই মাসানি নাম দেওয়া হয়েছে; যেহেতু কুরআন বারবার পঠিত হয়। আবার সুরা হিজরের ৮৭ নং আয়াতে সুরা ফাতিহাকে মাসানি নাম দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, আপনাকে আমি দিয়েছি বারবার পঠিত সাতটি আয়াত। সুরা ফাতিহাকে মাসানি নাম দেওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, সুরা ফাতিহা পবিত্র কুরআনের সুরা সমূহের মাঝে সর্বাধিক পঠিত। মিইনের পর থেকে নিয়ে মুফাসসালাত পর্যন্ত সুরাগুলোকে তাবারানির বর্ণনায় বিশেষভাবে মাসানি নামকরণ করা হয়েছে। কারণ এই সুরাগুলো তিওয়াল ও মিইন-এর তুলনায় অধিক পঠিত হয়। এগুলো দীর্ঘ সুরাসমূহের তুলনায় খুব দ্রুত পড়ে শেষ করা যায় এবং বারবার সহজেই তেলাওয়াত করা যায়।

৪. মুফাসসালাত: সুরা হুজুরাত বা সুরা ক্বাফ থেকে নিয়ে কুরআনের শেষ পর্যন্ত (৬৫ বা ৬৬ টি সুরা) সূরাসমূহকে মুফাসসালাত বলা হয়। ছোট ছোট সুরা হওয়ার কারণে একটু পর পর বিসমিল্লাহ দিয়ে একটি সুরা থেকে অন্য সুরাকে পৃথক করা হয় বলে এসব সুরার নামকরণ হয়েছে মুফাসসালাত। মুফাসসালাত শব্দটি ফাসিলা থেকে উদ্গত। ফাসিলা অর্থ ব্যবধান বা পৃথক করণ।

মুফাসসালাত সুরাসমূহকে আবার তিনভাগে ভাগ করা হয়। এসব ভাগ নিয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে বারোটি মত রয়েছে। এসব মতামতের জন্য হাফেজ সুয়ুতি রহ.-এর আলইতকান দেখা যেতে পারে। আমরা এখানে প্রতিটি ভাগের সংজ্ঞায় সবচেয়ে প্রসিদ্ধ অভিমতটি তুলে ধরছি-

১. তিওয়ালে মুফাসসাল: সুরা কাফ থেকে নিয়ে সুরা বুরুজ পর্যন্ত।
২. আওসাতে মুফাসসাল: সুরা ত্বারেক থেকে নিয়ে সুরা যিলযাল পর্যন্ত।
৩. কিসারে মুফাসসাল: সুরা যিলযাল থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত।

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কী ধরনের সুরা পড়া সুন্নাত?

এ বিষয়ে চার ইমাম একমত যে, ফজর ও যোহর নামাজে তিওয়ালে মুফাসসাল, আসর ও ইশায় আওসাতে মুফাসসাল এবং মাগরিব নামাজে কিসারে মুফাসসাল পড়া সুন্নাত। অবশ্য যোহর নামাজে আওসাতে মুফাসসাল এবং আসর নামাজে কিসারে মুফাসসাল সুন্নাত হবার বিষয়েও একটি মত রয়েছে।

তবে তিওয়াল, আওসাত ও কিসারে মুফাসসাল থেকে পড়ার অর্থ এ নয় যে, কেবল শেষের সুরাগুলো পড়তে হবে, শুরুর দিক থেকে তেলাওয়াত করলে সুন্নাত আদায় হবে না। বরং যেখান থেকেই পড়ুক শেষের দিকের সুরা সমূহের পরিমাণে পড়া সুন্নাত। অর্থাৎ পুরো কুরআন থেকে ফজর নামাজে তিওয়ালে মুফাসসাল পরিমাণ, আসর ও ইশার নামাজে আওসাতে মুফাসসাল পরিমাণ এবং মাগরিব নামাজে কিসারে মুফাসসাল পরিমাণ তেলাওয়াত করা সুন্নাত। শেষের পাঁচ পারা বাদে বাকি পঁচিশ পারা কুরআন পরিত্যাগ করা আদৌ উদ্দেশ্য নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদা পবিত্র কুরআনের সব স্থান থেকেই নামাজে তেলাওয়াত করতেন।

  • কুরআনের আয়াত ও সুরাসমূহের নানান ভাগ

১. প্রিয় নবীর হাদীসে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন আমরা উল্লেখ করেছি।

২.সাহাবিরা সাত মঞ্জিলে ভাগ করে সাত দিনে কুরআন খতম করতেন। সাহাবী আউস ইবনু হুযায়ফা রা. থেকে যেমনটি বর্ণিত হয়েছে।

৩. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ পূর্ণ কুরআনের অক্ষর ও শব্দ গণনা করে অর্ধেক কুরআন চিহনিত করেন। এভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। সুরা কাহাফের ১৯ নং আয়াতের ওয়ালইয়াতালাততাফ শব্দটি কুরআনের মাঝখানের শব্দ বলে নির্ধারিত হয়। ইয়ার পর তা প্রথমার্ধের শেষ, আর তার পর লা শেষার্ধের শুরু হিসেবে নির্ধারিত হয়।

৪. হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের তত্ত্বাবধানে, কতিপয় ঐতিহাসিকের মতে হাজ্জাজ নিজে তিরিশ পারায় ভাগ করেন। অবশ্য এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের আরও মতামত রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে এই ভাগটিই সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ। লিবিয়া থেকে প্রকাশিত কুরআনে তিরিশ পারার বদলে ষাট হিজবে ভাগ করা হয়েছে। আরও দুএক দেশে এমন ব্যতিক্রম থাকতে পারে, তা না হলে অধিকাংশ অঞ্চলেই তিরিশ পারায় মুসহাফকে ভাগ করা হয়েছে। কুরআনের অনুকরণে হাদীসের কিছু কিতাবেরও এভাবে তিরিশ পারা করা হয়েছে বহু আগে থেকে।

৫. হাজ্জাজের সময়েই ৬০ হিজবে ভাগ হয়।

৬. কেউ কেউ কুরআনকে ১৫০ ভাগে ভাগ করেন।

৭. কেউ কেউ ৩৬০ ভাগ করেছেন। বছরে ৩৬০ দিন, সেই হিসেবে। এক বছরে মুখস্থ করার সুবিধার্থে এভাবে ভাগ করা হয়। একেকটি হিজবকে ছয় ভাগে বিভক্ত করে ৬০*৬= ৩৬০ ভাগ হয়।
খলীফা মানসুর বসরার বিখ্যাত মুতাযিলা আলিম আমর ইবনু উবায়েদকে বলেছিলেন, আমি কুরআনুল কারীম মুখস্থ করতে চাই। প্রতিদিন কতটুকু মুখস্থ করতে তুমি আমাকে পরামর্শ দিবে? আমর বললেন, আল্লাহ তাওফিক দিলে আপনি এক বছরে হিফজ করতে পারবেন। খলীফা মানসুর বললেন, আমি মুসহাফে প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত অংশ ভাগ করে নিতে চাই। আমর বললেন, আমি আপনার জন্য তাহলে তিন শ ষাট ভাগ করে দিচ্ছি। এভাবে এক পারাকে বারো ভাগে ভাগ করেন। ৩০*১২=৩৬০

আবুল আইনা খাল্লাদ বসরি রহ. (মৃ. ২৮৩) বলেন, খলীফা মানসুর এভাবেই কুরআনুল কারীম হিফজ করেন এবং তার ছেলে মাহদিকে এই নিয়মেই হিফজ করান। আমি (আবুল আইনা) নিজেও এ নিয়মে কুরআন হিফজ করেছি এবং আমার পরিবারের অনেককে এ নিয়মে হিফজ করিয়েছি। এটি অনেক বরকতময় ভাগ। [জামালুল কুররা ১/১৬৩]

এই ৩৬০ ভাগের পূর্ণ বিবরণ জামালুল কুররায় দেওয়া হয়েছে। এর প্রথম ভাগ সুরা বাকারার শুরু থেকে পঞ্চদশ আয়াত এবং শেষ ভাগ নির্ধারণ করা হয়েছে সুরা ইলাফ থেকে নাস। [আলামুদ্দিন সাখাবী (মৃ. ৬৪৩ হি.) রচিত জামালুল কুররা ওয়া কামালুল ইকরা চতুর্থ অধ্যায় দ্রষ্টব্য]

৮. কেউ কেউ ৬২০ ভাগেও ভাগ করেছেন। যুরকানি বলেন, প্রত্যেক দশ আয়াতের পর আরবি আইনের মাথা দেওয়া থাকতো। ছয় হাজার আয়াতের প্রত্যেক দশ আয়াত পর পর এমন চিহন দিলে ৬২৪ ভাগ হয়। [মানাহিলুল ইরফান, ১/২৮৩]

৯. যুরকানি রহ. বলেন, কেউ কেউ প্রত্যেক পাঁচ আয়াত শেষে আরবি খামস লিখত। এভাবে প্রায় ১২৫০ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। [মানাহিল]

১০. দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ, বারো, চৌদ্দ, পনের, ষোল, চব্বিশ ভাগে কুরআনের মুসহাফকে ভাগ করেছেন অনেকে। জামালুল কুররা গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। [জামালুল কুররা ১/ ১৩০-১৩৮ পৃ. দ্রষ্টব্য]

১১. রমজানে সাতাশ দিনে শেষ করার জন্য সাতাশ পারায়ও ভাগ করেছেন কেউ কেউ। সাতাশতম ভাগ শুরু হয়েছে সুরা দাহর থেকে। দাহর থেকে নাস পর্যন্ত। [দেখুন জামালুল কুররা ১/১৩৯]

১২. এছাড়া আরও বিভিন্নভাবেই ভাগ করা হয়েছে। তবে সেসব ভাগ এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

রুকুর ক্ষেত্রে আমরা শুরুতেই উল্লেখ করেছি, তিন ধরনের রুকু পদ্ধতি আবিস্কৃত হলেও এখন কেবল ৫৫৮ রুকুর পদ্ধতিই অনুসৃত হচ্ছে।

[ বৃহৎ কলেবরে প্রকাশিতব্য রচনা হতে পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। ]

লেখক : শিক্ষক, খতিব, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com