২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: মুসলিমদের ১০০১ আবিষ্কার | পর্ব- ৪

এই প্রবন্ধে সময়কাল অনুযায়ী বিভিন্ন ইসলামি ব্যক্তিদের আবিষ্কারের তালিকা সহজপাঠ্য করে তুলে ধরা হবে। মূলত এটি ‘১০০১ ইনভেনশনস: মুসলিম হেরিটেজ ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামক জনপ্রিয় গ্রন্থের ভাবানুবাদ।

মুবাশশির হাসান সাকফি

  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

মধ্যযুগকে মাঝে মাঝে কল্পনা কর হয়, দুর্গন্ধপূর্ণ, অন্ধকার, নোংরা এবং অপরিচ্ছন্নভাবে। খোলা নালা, রোগ ব্যধি প্রভৃতির ছবি কল্পনায় ভাসতে থাকে। তবে ১০ম শতকের ইসলামিক জগতের বাথরুম কেবিনেট এবং স্বাস্থবিধির অনুশীলন আমাদের বর্তমানের সকল প্রয়োজনকে মিটিয়ে দিতে পারে।

একজন মুসলিমের বিশ্বাস মূলত পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর নির্ভর করে। ধর্মে তাদেরকে ঘুম থেকে জাগা বা ঘুমানোর আগে, খাওয়ার আগে পরে তাৎক্ষণিকভাবে হাত-মুখ ধোয়ার কথা বলা হয়েছে। দিনে পাঁচবার তাদের নামাজের আগে অজুর কথা বলা আছে। শুক্রবার, পবিত্র দিন, সমন্বিত নামাজের আগে গোসলের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

  • অজুর মেশিন

১৩শ শতকের বিরাট মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আল জাযারি তার বিখ্যাত বই যার নাম ‘অসাধারণ মেকানিক্যাল ডিভাইসসমূহের বিজ্ঞান বিষয়ক বই’! এই বইটি অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করা মানুষের জন্য অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছিল। এতে অনেক মেক্যানিক্যাল যন্ত্রের বর্ণনা আছে। এমনকি অজুর মেশিনের কথাও আছে।

বর্তমানে আমরা যে ট্যাপ আর সিংক ব্যবহার করি তার তুলনায় এগুলো কত শিল্পময় এবং চমৎকার ছিল! এই অজুর মেশিনগুলো ছিল ভ্রাম্যমাণ এবং মেহমানদের সামনে যখন হাজির করা হত তখন দেখতে অনেক থালায় রাখা একটা ময়ূরের মত মনে হত! মেহমান এর মাথায় চাপ দিতেই আটটা ছোটো ধারায় পানি নেমে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করত। এই পদ্ধতিতে পানির অপচয়ও কম হত। কিছু অজুর মেশিন অজু শেষে আপনাকে একটা তোয়ালেও দিয়ে দিত!

  • সাবান আবিষ্কার

মুসলিমরা শুধু জলের ঝাপটা মুখে ছিটিয়েই খান্ত হয়নি। তাদের দরকার ছিল আরও বেশি পরিচ্ছন্নতার। তাই তারা সাবান আবিষ্কার করল। সামান্য জলপাইয়ের তেল (অলিভ অয়েল) এবং আল কালি (লবণ জাতীয় পদার্থ) দিয়ে। এগুলোকে সেদ্ধ করে পাল্প তৈরি করা হত এবং রেখে শুকিয়ে দেওয়া হত। তারপর এই সাবানগুলো হাম্মামখানায় ব্যবহার হত।

(সাধারণত মুসলিমরা ব্যক্তিগত বাথরুমে কিংবা গোপনীয়তা বজায় রেখে খুবই সীমিত জায়গায় সংরক্ষিতভাবে গোসল করত। অন্যদিকে ইউরোপীয়ানরা নারী পুরুষ নির্বিশেষে গণগোসলখানা ব্যবহার করত। এজন্য ইউরোপে প্লেগের মত বড় বড় দুর্যোগ লেগেই থাকত। তাছাড়া রোমানরাই প্রথম গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেট আবিষ্কার করে। পাবলিক টয়লেটগুলোতে নোংরা, অস্বাস্থকর ও উপচে পড়া বর্জ্য অব্যবস্থাপনা তাছাড়া একই বস্তু (স্পঞ্জ) শৌচকার্যে বহুমানুষ কর্তৃক ব্যবহার স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই উদ্বেগজনক ছিল।–অনুবাদক)

১৩শ শতকর দিকের একটা পাণ্ডুলিপি সম্প্রতি উদ্ঘাটিত হয়েছে; যাতে সাবান তৈরির বিস্তারিত প্রণালী বর্ণনা করা আছে। যেমন, কিছু তিলের তেল, এক চিমটি পটাশ, আল কালি এবং কিছুটা চুন নাও। একসাথে মেশাও ও সেদ্ধ করো। রান্না হয়ে গেলে মিশ্রণকে ছাঁচে রাখো এবং শুকাও। কঠিন সাবান তৈরি হয়ে যাবে।

ইউরোপে সাবান এসেছিল ক্রসেডারদের প্রত্যাবর্তনের সময়। তবে তখনও অতটা আকর্ষণীয় ছিল না। ১৮শ শতকের দিকে সাবান শিল্পের প্রসার ঘটল, বিশেষত সিরিয়ায়। রঙিন সুগন্ধী টয়লেট সাবান এমনি চিকিৎসার জন্য সাবানও তৈরি হতে লাগল।

  • কসমেটিকস সামগ্রী

মুসলিমরা শুধু যে ধোয়া মাজা নিয়েই পড়ে ছিল তা না। বরং তখন সৌখিনতারও বিশেষত্ব ফুটে ওঠে তাদের মেজাজে। ফিজিশিয়ানদের সৌন্দর্য বিষয়ক বইগুলো তার প্রমাণ। এরকম একজন মানুষ আল জাহরাবি। কর্ডোভার একজন বিখ্যাত অষুধবিশেষজ্ঞ এবং সার্জারি চিকিৎসক। তার ব্যাপারে চিকিৎসা অধ্যায়ে আরও বেশি আলোচনা করা হবে। তিনি মূলত নবী মুহাম্মদ সা. এর ওই শামায়েলের হাদিস দ্বারা প্রভাবিত হন, যেখানে পরিচ্ছন্নতা, সাজানো পোশাক আশাক, চুল ও দেহের যত্ন ইত্যাদির উল্লেখ পাওয়া যায়।

‘আত তাসরিফ’ নামের এই বইয়ের নবম খণ্ডের পুরোটাই কসমেটিকসের বিষয়ে লেখা। এক হাজার বছর আগে, কসমেটিকস বিদ্যায় লেখা প্রথম মৌলিক মুসলিম গবেষণা ছিল এটা। আল জাহরাবি কসমেটিকসকে অষুধ বিজ্ঞান (মেডিসিন) এর একটা সুনির্দিষ্ট শাখা মনে করে এর শিরোনাম দেন সৌন্দর্যের মেডিসিন।

তিনি চুল, চামড়া, দাঁত ও অন্যান্য অঙ্গের যত্ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের বিবরণ দেন। সবই ইসলামের আওতায় থেকে। মাঢ়ী মজবুত করা, দাঁত পরিষ্কার করা, এবং দন্তচিকিৎসা নিত্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নাকে স্প্রে, মাউথওয়াশ, হাতের ক্রিমের কথা বলেন। এমনকি তিনি বলেন কাপড়কে একটা ধোঁয়াপূর্ণ গর্তে রাখতে যাতে তার পরিধানকারীর জন্য সুন্দর গঠন পায়।

তিনি সুগন্ধি (আতর বা পারফিউম) এর বর্ণনা দিয়েছেন। এমন পারফিউম স্টকের কথা বলেছেন যা মোড়ানো এবং বিশেষ আকৃতিতে চাপানো এখনকার দিতের রোল-অন ডিওডরেন্ট এর মত। তিনি চুল উপড়ানোর কাঠি (Hair removing stick), হেয়ার ডায়িস (ব্লন্ড চুলকে কালো করে), চুলের পুষ্টিবর্ধক লোশান প্রভৃতির নামও দিয়েছেন। সানটান লোশনের উপকারিতা এবং তাদের উপাদানের বিস্তারিত বর্ণনা সব দিয়েছেন। আশ্চর্য হতে হয়, এই সব কিন্তু এক হাজার বছর আগের কথা!

(অপরদিকে রোমানদের সাবানের ছিল না বলে তারা নিজেদেরকে তেলে চুবিয়ে রাখত এবং গায়ের মরা কোষ স্ট্রিজিল নামে একটা জিনিস দিয়ে তুলে ফেলত। গ্ল্যাডিয়েটরদের এইসব মরা কোষ, ঘাম একটা পাত্রে নিয়ে অ্যাফোরডিসিয়াক (aphrodisiac) নামের ক্রিম হিসেবে বিক্রি করা হত। নারীরা সেই ক্রিম মাখত। -অনুবাদক)

আল কিন্দিও সুগন্ধি নিয়ে বই লিখেছেন; নাম ‘সুগন্ধি ও পাতনের রসায়নের বই’। বর্তমান ইরাকের কুফায় জন্ম নেয়া এই বিজ্ঞানী সবচেয়ে বেশি পরিচিত দার্শনিক হিসেবে। এছাড়াও ফিজিশিয়ান (ঔষুধ বিশেষজ্ঞ), ফার্মেসিস্ট, গণিতবিদ, ভুগোলবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং রসায়নবিদ হিসেবেও তার খ্যাতি আছে। এমনকি তরবারি নির্মাণ, বাদ্যযন্ত্র এমনকি রান্নাবান্নাতেও তার পরিচিতি আছে। তার বইতে সুগন্ধি তেল, মলম, সুগন্ধি পানি এবং মূল্যবান অনেক অষুধের কথা আছে যেগুল তখন অনেক দামি ছিল। পরে সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। তার এই প্রাচীন বইতে ১০৭ টা পদ্ধতি বলা আছে সুগন্ধি বানানোর। যার মধ্যে এলেম্বিক (আরবি শব্দ) পারফিউমও ছিল।

এখনকার যুগের সেলিব্রেটিদের কারণে পারফিউম নির্মাণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এসব সম্ভব হয়েছে মুসলিম রসায়নবিদদের কারণে, তাদের আবিষ্কৃত পাতন পদ্ধতি (distillation) এর সহায়তায়। ফুল ও লতাপাতার নির্যাসকে পাতন করেই এসব পারফিউম বানানো হত। মুসলিমদের এসব আবিষ্কার ইউরোপে বণিক ও ভ্রমণযাত্রীদের মাধ্যমে হয়ত উপহার বা ক্রুসেরডারদের হাত হয়ে প্রসারিত হয়। বিবিসি একটি তথ্যচিত্র What the Ancients Did for Us: The Islamic World এর তথ্যমতে, প্রথমে মুসলিমদের এইসব আবিষ্কার ফ্রান্সের হোতে প্রভেন্সে পৌঁছে; যেখানকার জলবায়ু ও মাটি পারফিউম ইন্ডাস্ট্রির জন্য খুবই উপযোগী ছিল এবং ৭০০ বছর পরে এখানেই এই শিল্পের প্রসার ঘটে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি বিশ্বের কসমেটিকের নাম ‘হেনা’ (আরবি শব্দ হান্না থেকে যার অর্থ মেহেদি)। হাতের ওপর চমৎকার এবং জটিল কারুকার্য করা হয়। ইসলামি জগতে প্রসারের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এইসব কসপেটিক উপকরণ ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: ঘড়ি: মুসলিমদের ১০০১ আবিষ্কার | পর্ব- ৩

নবীজি (সা.) এবং সাহাবিরা দাড়ি রং করতেন (খেজাব)। মেয়েরা হাত পা এমনি এখনকার মেয়েদের মত চুলও রং করত। মেহেদি ব্যবহারের প্রচলন বিভিন্ন দেশে ছিল। যেমন, আলজেরিয়া, মরক্কোর যাযাবর গোত্রগুলোর নিয়ম ছিল, মেয়েরা যেন স্বামীর কাছে যাওয়ার সাত রাত আগে হেনা লাগায়।

আধুনিক বিজ্ঞানিগণ মেহেদির বিশেষ গুণাগুণ। যেমন, ব্যাক্টেরিয়ারোধী, ফাংগাসরোধী এবং লালশ্রাবরোধী গুণ পেয়েছেন। এর ব্যবহারে অ্যাথলেটদের পা, ছত্রাকের চর্মসংক্রমণ এবং সাধারণ প্রদাহের নিরাময় সম্ভব। মেহেদির পাতা এবং বীজে ওষধি গুণ আছে পাশাপাশি দেহ ও মাথা ঠাণ্ডা রাখার পদার্থও বিদ্যমান। চুলের উৎকর্ষে ভেষজ উপদানও এতে বিদ্যমান। মোটকথা, মুসলিমরা এখন এবং তখন উভয় সময়ে এমন সব পরিচ্ছন্নতার নীতির ওপর ঠিক থেকেছে যেগুলো একবিংশ শতকের নগরের মানুষও ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় ঠিকঠাক করে যায়।

  • মিসওয়াক

মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে এবং দাঁতের যত্নে মহানবী (সা.) অনেক লম্বা গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক করতে বলেছেন প্রতিবার প্রার্থনার আগে। এটা স্বাস্থের জন্যও ভালো।

সুইডেনের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি, ফার্বা ব্যাসল লিমিটেড মিসওয়াকের (Miswak or Salvadora persica) ওপর একটা এক্সপেরিমেন্ট পরিচালনা করে। তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মিসওয়াকে অনেক ব্যক্টেরিয়া প্রতিরোধী পদার্থ আছে যেগুলো ওইসব জীবাণু ধ্বংস করে যারা মাঢ়ীর সংক্রমণ এবং দাঁতক্ষয়ের জন্য দায়ী। সৌদির রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইনডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা আলাদা গবেষণা মিসওয়াকের প্রদাহরোধী এবং জীবাণুরোধী কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করে। মিসওয়াক না থাকলেও মুসলিমরা তখন দারুচিনি, জয়ফল, এলাচ খেত এবং ধনেপাতা চাবিয়ে পেঁয়াজ-রসুনের দুর্গন্ধ দূর করত।

(অন্যদিকে রোমানরা তখন দাঁত মাজত, কাপড় ধুতো নিজেদের এবং পশুর মুত্র দিয়ে। সরকারিভাবে তখন জনগণের মুত্র সংগ্রহ করে দীর্ঘদিন জমা করে বিক্রি করা হত, মুত্রের সংগ্রাহক ও মুত্রে গন্ধ শোঁকা কর্মীদের সরকারি ভাতা দেওয়া হত। মুত্র কিছুটা ক্ষারধর্মী এবং এমোনিয়া সমৃদ্ধ হওয়ায় পরিষ্কারকও বটে কিন্তু এতে নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য অনেক। মানুষ ও পশুর শরীরে সবচেয়ে বেশি দূষিত পদার্থ থাকে মুত্রে। এর চেয়ে কাঁচা লবণ কিংবা সাগরের পানির ব্যবহারও সুবিধাজনক হত। -অনুবাদক)

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com