পাকিস্তানকে যেভাবে ছিন্নভিন্ন করছে মেরুকরণের রাজনীতি

পাকিস্তানকে যেভাবে ছিন্নভিন্ন করছে মেরুকরণের রাজনীতি

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : এতোটা খারাপ পরিস্থিতি পাকিস্তানে এর আগে আসেনি কখনও। অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে, পুরো সমাজ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, লাখো মানুষ গত বছরের ভয়াবহ বন্যার ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি, সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি ঠেকেছে চুড়ায়, পরিবারের সদস্যদের খাওয়া-পরা যোগাতেই হিমশিম খাচ্ছে অনেকে।

দেশের যখন এই অবস্থা সে সময় পাকিস্তানকে কে চালাবে— এই প্রশ্নে লড়াইয়ে মত্ত দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাজনীতিবিদরা। কিন্তু নানা আলোচনা, এক পক্ষকে অপর পক্ষের হুঁশিয়ারি, এমনকি রাস্তায় মুখোমুখি হবার পরও পাকিস্তান যেন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না; বরং এক বছর আগে যেখানে ছিল, আজও যেন সেখানে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক সংস্থা উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট বিভাগের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বিবিসিকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পাকিস্তানের এটা বলার সুযোগ নেই যে এই রাজনৈতিক সংকট অন্য বিষয় থেকে জনগণের নজর ঘুরিয়ে দিয়েছে, বরং শেষ পর্যন্ত আমাদের অন্য সব বিষয়ের দিকেই নজর দিতে হবে।’

‘আমার মতে, পাকিস্তান এখন এক অভূতপূর্ব সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামনের চেহারা হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা। অন্যান্য সংকটগুলো সেই অস্থিরতার আড়ালেই আছে।’

পাকিস্তানের অর্থনীতি ধুঁকছে। দেশটির বিদেশি রিজার্ভ, যার উপর জ্বালানিসহ বিভিন্ন আমদানি নির্ভরশীল—কয়েক দশকের মধ্যে বর্তমানে সেটি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অর্থনীতির ভারসাম্য ঠিক রাখতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঋণদাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ১১০ কোটি ডলার ঋণের আশায় আছে পাকিস্তান। চলতি বছরের শুরুর দিকে এ আইএমএফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এই ইস্যুতে একাধিক বৈঠকও হয়েছে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধিদের। কিন্তু সেই ঋণ মিলবে কিনা— এখনও অনিশ্চিত।

এদিকে পাকিস্তানে সক্রিয় কট্টর ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একের পর এক হামলা চালিয়েই যাচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা হয় দেশটির আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। দেশটির সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি ২০২৩ সালের প্রথম ৫ মাসে চার শতাধিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে পাকিস্তানজুড়ে।

পাশাপাশি, বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠী নিয়মতিই নানা ভিডিওচিত্র পোস্ট দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হামলায় কতজনকে হত্যা করা হলো এবং কী পরিমাণ অস্ত্র দখল করা হলো— তার বিবরণ তুলে ধরতেই পোস্ট করা হচ্ছে এসব ভিডিওচিত্র।

এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে খাদ্যপণ্যের অসহনীয় মূল্যস্ফীতি। গত বছরের ভয়াবহ বন্যার ধকল যখন কাটিয়ে উঠছে পাকিস্তান কাটিয়ে উঠছে ঠিক সেই সময় দেশটির রাজনীতিতে তীব্র অসহিষ্ণুতা দেশটির রাজনীতিবিদদের নানা প্রশ্নের মধ্যে এনে ফেলছে।

  • কেন এই অচলাবস্থা?

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর এপ্রিলে ইমরান খানকে তার প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে সূত্রপাত ঘটেছে বর্তমান পরিস্থিতির।

‘খান এটি মেনে নেননি এবং এটা পরিষ্কার ছিল যে সরকার ইমরান খানের আন্দোলন ও কর্মসূচীর জেরে সৃষ্ট পরিস্থিতি এড়াতে পারবে না,’ বিবিসিকে বলেন কুগেলম্যান।

পদচ্যুত হওয়ার পর আগাম নির্বাচনের দাবিতে এরপর দেশজুড়ে কর্মসূচি শুরু করেন ইমরান খান এবং একই সময়ে আদালতে বাড়তে থাকে তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা। ইমরানের রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ইনসাফের (পিটিআই) নেতারা জানিয়েছেন—এই মুহূর্তে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও আদালত অবমাননাসহ একশোর উপর মামলা জারি আছে তার উপর।

অবশ্য এসব মামলাকেই নিজের রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার বানিয়েছেন ইমরান খান। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমাবেশে নিজের এসব হয়রানি তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘জংলি আইনে’ এই সরকার চলছে।

পাশাপাশি বর্তমান সরকারকে আদালতেও এনেছেন তিনি। তার দল পিটিআই জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে দেশটির দুটি প্রাদেশিক সভা ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু সেটা ব্যর্থ হওয়ার পর পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করা হয়। সেই মামলা এখন সুপ্রিম কোর্টে চলমান।

এমন আইনি জটিলতায় বিচার বিভাগও যেন দু’ভাগে বিভক্ত। সরকারের অভিযোগ— কয়েকজন বিচারক ইমরান খানকে সুবিধা দিতে কাজ করছে। আর এমন বিভক্তি এবং তীব্র মতবিরোধে অনেকের শঙ্কা—দেশটির সংবিধান না হুমকিতে পড়ে যায়।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অফ লেজিসলেটিভ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আহমেদ বিলাল বিবিসিকে বলেন, ইমরান খান সরকারকে স্থির হয়ে বসার সুযোগ দিতে রাজি নন। ফলে তাদের সব মনোযোগ এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দিকে।

বিলাল আরও মনে করেন, দেশের এমন অচলাবস্থার সাথে ইমরান খানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেরও যোগ আছে।

‘তিনি কোন আপস করতে রাজি নন। তার এমন একরোখা মনোভাব কোন ফল আনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা এবং দিনশেষে হয়তো তাকেই এটার জন্য ভুগতে হতে পারে,’ বিবিসিকে বলেন আহমেদ বিলাল।

পাকিস্তানের অপর রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেহমাল সরফরাজ বিবিসিকে বলেন, ‘বর্তমান এই রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে দিচ্ছে। বর্তমানে এমন কোনো গোষ্ঠী নেই, যারা (এই সংকট পরিস্থিতিতে) মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে পারে। এস্টাবলিশমেন্ট তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।’

‘এস্টাবলিশমেন্ট’ শব্দটা দিয়ে পাকিস্তানের সেনা ও গোয়েন্দা বিভাগকে বোঝানো হয়ে থাকে। দেশটির সেনাবাহিনী সবসময়ই রাজনীতিতে গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে, কখনো অভূত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে, আবার কখনো পেছন থেকে চাবিকাঠি নেড়েছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে ইমরান খান ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়েই নির্বাচনে জয়লাভ করেন। কিন্তু এখন বিরোধী দলে গিয়ে ইমরান খানই তথাকথিত ‘এস্টাবলিশমেন্টের’ বড় সমালোচক। বিশ্লেষকরাও বলছেন, পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর জনপ্রিয়তা কমেছে।

উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের জেষ্ঠ্য বিশ্লেষক কুগেলম্যান বলেন, ‘এটা পরিষ্কার যে সেনাবাহিনীর সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর বোঝাপড়ায় একটা ঘাটতি তৈরী হয়েছে। আমার অনুমান বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইমরান খানকে আর রাজনীতিতে দেখতে চান না; কিন্তু যারা নিচের দিকে ও মাঝারি পদে আছেন তারা খানের বড় সমর্থক।’

‘খান রাজনীতিতে বিভক্তি এনেছেন, জনগণকে দুভাগ করেছেন এবং এখন তিনি আর্মিতেও মেরুকরণ তৈরী করেছেন, যা থেকে বের হয়ে আসা খুবই কঠিন।’

  • সামনে তাহলে কী?

এ বছর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে। কিন্তু শঙ্কা হচ্ছে—যে কারণে প্রাদেশিক সভার নির্বাচন বিলম্বিত হচ্ছে অর্থাৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং তহবিল সংকট – সেই একই কারণে জাতীয় নির্বাচনও পিছিয়ে যেতে পারে।

আহমেদ বিলালের মতে, যদি এই শঙ্কা সত্যি হয়, সেক্ষেত্রে সেটি হবে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।

‘আমি মনে করি সেটা হবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং সম্ভবত পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্যও এমন ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে যা আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। আমরা কখনো নির্বাচন পিছিয়ে যেতে দেখিনি,’ বিবিসিকে বলেন পাকিস্তানের এই রাজনীতি বিশ্লেষক।

সরকারের সাথে নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসেছে ইমরান খানের পিটিআই। তারা একমত হয়েছে যে জাতীয় ও প্রদেশের নির্বাচন একইসাথে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেই নির্বাচন কখন হবে সে ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।

মেহমাল সরফরাজ অবশ্য মনে করেন, দিনক্ষণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলেও সংকট মিটবে না। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা সীমা অতিক্রম করবে না, কেবলমাত্র তখনই বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি সম্ভব। তা না হলে যদি এখন নির্বাচন হয়ও, সেটি শান্তিপূর্ণ হবে না।’

‘আমাদের রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে যে তারা পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এখানে ব্যক্তিগত শত্রুতার কিছু নেই। এটাই এখন সময় যে সবকিছু ভেঙে পড়ার আগেই আমরা একে অন্যের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সামনের দিকে অগ্রসর হব।’

  • সূত্র : বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *