৮ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২৩শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১১ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

পৃথিবী আবার দেখুক থানভী, মাদানী, কাশ্মীরীদের কারিশমা

  • মুহাম্মাদ আইয়ুব

আমার স্পষ্ট মনে আছে, মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান সাহেবের বড় রুমটায় জায়গা না পেয়ে সেদিন আরো সাত আটটা ছেলের মত আমিও বারান্দায় বসলাম। ভিতরে আবুল ফাতাহ ভাইয়ের সঞ্চালনায় নকীব ভাই দাঁড়িয়ে কি যেন পাঠ করছে আর আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনছি। এভাবে একেককরে ভিতরের সবাই যার যার রচনার পণ্য বাজারে উঠালে উপস্থিত সবাই তা থেকে স্বাদ নিলো বাহ বাহ দিয়ে। রচনার বাজার গদ্যে পদ্যে রোজনামচায় হলো সয়লাব। একদিকে মজলিসের মধ্যমনি ফয়জুল্লাহ সাহেব প্রত্যেক পণ্যের গুনগত মান তুলে ধরলেন। আর আবুল ফাতাহ ভাই করলেন তুলোধুনো। মজায় মজায় শেষ হলো আসর। সবশেষ জানতে পারলাম এর নাম ‘সাহিত্য মজলিস’।

একদিন আসরের পর দেখলাম এসো আরবি শিখি,আততামরিনুল কিতাবী, সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ, সুয়ারুম মিন হায়াতিত তাবিয়ীন নিয়ে দলে দলে ছাত্ররা মাওলানা মারুফ সাহেবের রুমে ঢুকছে। কৌতুহল নিয়ে আমিও ঢুকে পড়লাম একদিন সেই দলে। বাহ! কি চমৎকার, আরবি কিভাবে পড়তে হবে, লেখাটা কিভাবে লিখবে সুন্দর হবে-এই সব মূল্যবান বিষয় নিয়ে সুন্দর দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে, আরবি ভাষার হাতেখড়ি চলছে এখানে। কয়েকজন তো রীতিমতো হুজুরের সাথে আরবীতে কথাও বলছে-ওয়াহ ওয়াহ ওয়াহ।

আরেকদিন এশার পরে দেখলাম মুফতি হামিদ সাহেব হুজুরের রুমে ছোটখাটো একটা জটলা। আস্ত মাথাটা ঢুকিয়ে দিলাম দরজা দিয়ে। ও মা! এ দেখি বাংলা ও আরবি ভাষার হস্তলিপি শেখানো হচ্ছে, লেখার ভুল-ভাল ধরিয়ে দিচ্ছেন হুজুর বড় মমতায়। প্রিয় বান্না সাহেবের রুমেও সেই ছাত্রদেরই জটলা লেগে আছে। এখানেও হুজুর শেখাচ্ছেন ছাত্ররা শিখছে মাশাআল্লাহ।

জামিআ ইকরার পাঠ চুকিয়ে রওনা দিলাম দিল্লি। সেখান থেকে মাদারে ইলম দারুল উলূম দেওবন্দ। সুবহানাল্লাহ! এখানেও সেই নির্মল প্রাণোচ্ছল প্রাণবন্ত মজলিস। পালনপুরী সাহেব, শায়খ আরশাদ মাদানী সাহেব, শায়খ আব্দুল হক্ব আজমী সাহেব, বাহরুল উলূম, মুহতামিম সাহেব, শায়খ রিয়াসাত আলী বিজনূরী সাহেব, শায়খ কমরুদ্দিন গোরাখপুরী সাহেব, শায়খ হাবিবুর রহমান আজমী সাহেব, শায়খ হাবিবুর রহমান খায়রাবাদী সাহেব, শায়খ আব্দুল খালেক মাদ্রাজী সাহেব, শায়খ আব্দুল খালেক সাম্ভুলী সাহেব, শায়খ আব্দুল্লাহ মারুফী সাহেব প্রত্যেকের রুমেই বাদ আছর অথবা বাদ এশা ছাত্রদের সেই পরিচিত জটলা।

সাহারানপুর গেলাম, গেলাম জালালাবাদ, থানাভবন সবখানেই সীমিত পরিসরে হলেও উস্তাদ ছাত্রের মধুময় জটলায় চোখ গেল আটকে। মনের অজান্তেই ফিরে যেতাম হাজার বছর আগের ইমাম আজম কিংবা ইমাম মালিকের দরবারে। কখনো হযরত শাফেয়ী অথবা হাম্বলের বেটা ইমাম আহমাদ রহ. এর দরসে। কল্পনার জগতে উড়ে বেড়ালেও কেমন কেমন স্বাদ পেতাম তাদের দরসে বসার।

পাঠক! এবার আসা যাক শিরোনামে। পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে বসলাম গুরুর আসনে। নিয়ম অনুপাতে দরকার ছিল আমার শিষ্যদের নিয়ে সেই মধুময় জটলা পাকানো, কিন্তু আফসোস তা আর হলো না, হতে দিলাম না। গড়তে হবে ক্যারিয়ার. কামাই হবে টাকা। যুগের সাথে পাল্লা দিতে দরকার ফুলুস আর ফুলুস। পরিসর সীমিত, ক্ষেত্র সংকুচিত। কি করা যায়, কি করা যায়? আইডিয়া! অনলাইন।

লন্ডন আমেরিকা কানাডা কোথায় অনলাইনে টিউশনি করিয়ে কাড়ি কাড়ি কামানো যায় সেই ধান্ধায় পড়লাম নেমে। শুরু হলো অনলাইন শিষ্য খোঁজার পালা। অন্যদিকে খদ্দর বাজার থেকে সস্তায় টুপি আতর, তসবীহ, সরিষার তেল, কয়লা মাজন, শান্ডা অনলাইনে সেল দেয়ার শুরু হলো অদম্য প্রতিযোগিতা। শিক্ষকতার থেকে উদ্যোক্তার বাজার হলো জমজমাট। দিনের কাজ তো হলো রাতে? ও মা! এখানেও আমি উসাইন বোল্ট। রাত নামলেই নামে রূপালী স্ক্রিনে হারিয়ে যাওয়ার হিড়িক আগেভাগে কাঁথা মুড়ির প্রতিযোগিতা।

দিন আর রাত হলো একাকার। শিষ্য বান্ধব থেকে হয়ে গেলাম কাঁথা বান্ধব। সোশ্যাল মিডিয়ায় হলো আমার সরব পদচারণা। যখন তখন শুরু হলো লাইভ যুদ্ধ। সিনেমার হাওয়াকে হার মানিয়ে হয়ে গেলাম রিসোর্টে হাওয়া। পিতা বখে গেলে কি আর সন্তান স্বর্গে যায়! ও হয়ে গেল দমকা হাওয়া, কমেন্ট বক্সে এসে জানান দেয় উস্তাদ! শিষ্য ঘুমায় নাই। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে উস্তাদ ছাত্রের মাঝে রানা প্লাজার মত ট্রাজেডি হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি।

কি আশ্চর্য! এই সেদিনই তো মারুফ সাহেব, বান্না সাহেব, ফয়জুল্লাহ আমান সাহেব আর হামিদ সাহেবরা আমাদের নিয়ে বসলেন, চলার পথদেখালেন, নিত্য নতুন কিছু শেখালেন সমাজে চলার পন্থা জানালেন ভেঙেচুরে আমাদের নির্মাণ করলেন। তাহলে আমরা কেন নতুন প্রজন্মকে নির্মাণ করছি না, শিখাচ্ছি না আর দেখাচ্ছি না পথ!?

একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের খাদেম হওয়ার সুবাদে আজকাল যে অভিজ্ঞতা আমার হচ্ছে তা আসলেই শতভাগ ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। দিনে যদি পাঁচবার মাদ্রাসায় পায়চারি করি তাহলে দেখি ছয়বারই শিক্ষকদের হাতে মোবাইল। ছাত্র সবক সাতসবক শোনাচ্ছে আর এদিকে উস্তাদ মোবাইলে দশ সবক পার করে ফেলছে। হে ঈমানদারের জায়গায় ছাত্র বলে যাচ্ছে, হে মুনাফেকের দল! তারপরও কানে যাচ্ছে না পানি।

দুই ছাত্র ঘুসোঘুসি করে রক্তারক্তি অবস্থা, অন্যদিকে ক্লাসে উপস্থিত শিক্ষক মহোদয় চ্যাট করছেন চ্যাট। এভাবে সারা অঙ্গ পঁচে গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে শতদিক ভাবতেই গা শিউরে ওঠছে। দেশ ও জাতীর মহা এই দূর্যোগে করনীয় ঠিক করুক জাতীর কর্ণধাররা। রিসোর্টে রিফ্রেশ না হয়ে দরসে যেয়ে খুঁজুক আত্মিক প্রশান্তি। পৃথিবী আবার দেখুক থানভী, মাদানী, কাশ্মীরীদের কারিশমা।

  • মুহতামিম: জামিয়া আবু বকর সিদ্দীক রা. মাদ্রাসা ও এতিমখানা
    বলাকইড়, গোপালগঞ্জ সদর

 

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com