৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

প্রতিকূল অবস্থায়ও ঘুরে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : শত প্রতিকূল অবস্থায়ও ঘুরে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশ—এমন ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি পোশাক খাতের ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সপ্তাহের যাত্রা শুরু হয়েছে। গতকাল রবিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) এর অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিনিয়োগ ও সোর্সিংয়ের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিতে বিদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের সেরা ও অনুকূল গন্তব্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সারা দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছি। দেশের বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে। ’ তিনি দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা বিদেশের উচ্চ প্রযুক্তি, জ্ঞান আপনাদের শিল্প খাতে গ্রহণ করুন।’

বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ (বিএই) এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে। আয়োজকরা জানান, দেশের উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, উদ্ভাবন—এসব বিদেশি ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে তুলে ধরাই আয়োজনের লক্ষ্য। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ‘মেড ইন বাংলাদেশ উইক-২০২২’-এর আয়োজক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে, ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে আমরা যুক্ত হচ্ছি। তা ছাড়া আমরা ওয়াটারওয়েজ, এয়ারওয়েজ, রেলসহ সব কিছুতেই উন্নয়ন করে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণই আমাদের সাহসের উৎস। জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হচ্ছে এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুই হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার এখন মাথাপিছু আয়। ক্রয়ক্ষমতাও এ দেশের মানুষের বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের নিজস্ব বাজার তৈরি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, শুধু রপ্তানি করলেই চলবে না, নিজের দেশের ভেতরেও বাজার সৃষ্টি করতে হবে। করোনাকালে তাঁর সরকার যতটা সম্ভব তৃণমূলে অর্থ বরাদ্দ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পদধ্বনি শুনছি আমরা। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযুক্ত করে দক্ষ মানবসম্পদ আমাদের গড়ে তুলতে হবে। সে জন্য সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং উদ্যোক্তাও সৃষ্টি করছে। ’ তিনি বলেন, আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট প্রযুক্তির ব্যবহারের ব্যবস্থা নিতে হবে, সে জন্য আমরা প্রস্তুত, আমরা তৈরি হচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কাপড়ের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং শ্রমবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী পুনরায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের সাড়ে ১৬ কোটির ওপরে মানুষ। তাদের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে হবে। কিন্তু আমরা কারো কাছে ভিক্ষা করে চলতে চাই না। নিজের খাদ্য উৎপাদন নিজে করব। সে জন্য ফসলি জমি রক্ষা করা, যত্রতত্র শিল্প গড়ে না তোলা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার ব্যবস্থাও আমরা নিচ্ছি।’

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অফ ফেমে ‘কেয়ার ফর ফ্যাশন’ থিম নিয়ে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছে। ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত এটি চলবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দুটি কফি টেবিল বইয়ের মোড়কও উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে পোশাক রপ্তানিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চারজন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারককে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশন (আইএএফ) সভাপতি সেম অলটান এবং বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি বক্তৃতা করেন। বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান স্বাগত বক্তব্য দেন। দেশের পোশাক খাতের অগ্রগতি এবং নারীর ক্ষমতায়নবিষয়ক পৃথক দুটি ভিডিওচিত্র অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়। এ উপলক্ষে পোশাক খাতের বিদেশি ৫৫০টি ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিনিধি ঢাকায় এসেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোন মহামারির সময় আমরা রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ তহবিল, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা প্রদান, ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা প্রদান, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের দুস্থ শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমসহ মোট ২৮টি প্যাকেজের আওতায় অতি স্বল্প সুদে ২.৩৭ ট্রিলিয়ন টাকার ঋণ বরাদ্দ করেছি, যা ২০২২ অর্থবছরের মোট জিডিপির ৫.৯৮ শতাংশ। সময়োচিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের ফলে আমরা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সব বাধা সফলভাবে উত্তরণ করতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যাতে অব্যাহত থাকে সে জন্য নগদ সহায়তাসহ অন্যান্য সুবিধা আমরা প্রদান করছি। ২০২১-২২ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে অর্জিত হয়েছে ৪২.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে তৈরি পোশাক থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৩.৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে অর্জিত রপ্তানি আয়ের চেয়ে ১০.৫৫ শতাংশ বেশি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের জিডিপিতে রপ্তানি খাতের অবদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগত অর্থবছরে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য ও সেবাকে দীর্ঘমেয়াদি কর প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে গ্লোবাল ব্র্যান্ডে পরিণত করার লক্ষ্যে রপ্তানির নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি এবং পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ও নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে করহার সাধারণ কারখানার জন্য ১২ শতাংশ এবং গ্রিন কারখানার জন্য ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে আজ বিশ্বসেরা ১০টি পরিবেশবান্ধব কারখানার মধ্যে ৯টিই বাংলাদেশে অবস্থিত।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বিজিএমইএ ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু পোশাক খাত থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অর্থ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্য শেয়ার হবে ১৪ শতাংশ। বর্তমান শেয়ারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com