১৭ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

ফরজ নামাজ না পড়ার শাস্তি

  • মুফতি আব্দুল মুহাইমিন

আমরা অনেক সময় নিজেদের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত নামাজ আদায় করি না, বা ছেড়ে দেই। ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দেয়া শিরকের পর সবচেয়ে বড় গোনাহ। আর বড় গোনাহ আল্লাহ তওবা ছাড়া মাফ করেন না। সুতরাং আমরা যারা নিজেদের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত নামাজ আদায় করি না আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা। তারা নামায নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে। কিন্তু উহারা নহে-যাহারা তওবা করিয়াছে, ঈমান আনিয়াছে ও সৎকর্ম করিয়াছে। উহারা তো জান্নাতে প্রবেশ করিবে। উহাদের প্রতি কোন জুলুম করা হইবে না।’ (সূরা মারইয়াম: ৫৯-৬০)

এখনে আল্লাহর পুরস্কারপ্রাপ্ত বান্দাদের বর্ণনার পর ঐ সমস্ত মন্দলোকদের বর্ণনা করা হচ্ছে, যারা এর বিপরীত আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে ও বিমুখতা অবলম্বন করে এবং নামাজ বিনষ্ট করে। আর নামাজ বিনষ্ট করার অর্থ হচ্ছে একেবারে নামাজ না পড়া; যা মূলত কুফরী। অথবা নামাজের সময় বিনষ্ট করা; যার অর্থ সঠিক সময়ে নামাজ আদায় না করা, যখন ইচ্ছা পড়া বা বিনা ওযরে দুই বা ততোধিক নামাজকে একত্রে পড়া, অথবা কখনো দুই, কখনো চার, কখনো এক, কখনো পাঁচ অক্তের নামাজ পড়া।

এসব কিছু নামাজ বিনষ্ট করার অর্থে শামিল। এরকম ব্যক্তি অত্যন্ত পাপী, কিয়ামতের দিন তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হাদীসে নামাজ বর্জনকারীর প্রতি কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসূল সা. বলেছেন, ‘বান্দা ও কুফরির মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ বর্জন করা।’ (তিরমিজি)

হাদীসটির মর্ম এই যে, নামাজ ইসলাম ধর্মের এমন প্রতীক এবং ঈমানের সাথে এর এমন গভীর সম্পর্ক যে, এটা ছেড়ে দেওয়ার পর মানুষ যেন কুফরীর সীমানায় পৌঁছে যায়। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘যে কেউ ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দেয় আল্লাহ পাক তার হতে তাঁর জিম্মাদায়িত্ব উঠিয়ে নেন।’ (বুখারি)

অর্থাৎ যে নামাজ ছেড়ে দিলো সে যেন আল্লাহর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করল। দুনিয়ার ব্যস্ততা যাদেরকে নামাজ থেকে গাফেল করে দেয়, তাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।’ (আল মুনাফিকূন: ৯)

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন মাল এবং সন্তান-সন্ততির ভালোবাসা তোমাদের উপর যেন এমনভাবে প্রভাব বিস্তার না করে ফেলে যে, তোমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত যাবতীয় বিধি-বিধান ও ফরজ কার্যাবলী থেকে উদাসীন হয়ে যাও এবং তাঁরই নির্ধারিত হালাল ও হারামের সীমালংঘনের ব্যাপারেও একেবারে বেপরোয়া হয়ে যাও।

মুনাফিকদের আলোচনার পরে পরেই এই সতর্কতার উদ্দেশ্য হলো, এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে, এটা হলো মুনাফিকদের চরিত্র যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ঈমানদারদের চরিত্র এর বিপরীত। আর তা হলো, তাঁরা সব সময় আল্লাহকে স্মরণে রাখেন। অর্থাৎ তাঁর যাবতীয় বিধি-বিধান ও অত্যাবশ্যকীয় কার্যাবলীর প্রতি যত্ন নেন এবং হালাল-হারামের মধ্যে যে পার্থক্য তা খেয়াল করেন। নবী সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির এক ওয়াক্ত নামাজ ছুটে গেল, তার থেকে যেন তার পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ সবকিছুই কেড়ে নেওয়া হলো।’ (ইবনে হিব্বান)

সাধারণত পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদের পেছনে ব্যস্ত থাকার কারণে নামাজ ছুটে যায়। তাই নবী সা. এভাবে বলেন। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির কাছে তার পরিবার-পরিজন, ধনসম্পদ যেমন মূল্যবান ঠিক তেমনিভাবে নামাজ তার থেকেও অধিক মূল্যবান। জান্নাতিরা নামাজ তরকারীদেরকে জাহান্নামে দেখে জিজ্ঞাসা করবে, ‘তোমাদেরকে কিসে জাহান্নামে নিক্ষেপ করিয়াছে? উহারা বলিবে, আমরা মুসুল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না।আমরা অভাবগ্রস্তকে আহার্য দান করিতাম না।’ (সূরা আল মুদ্দাসসির :৪২-৪৪)

জান্নাতিরা জাহান্নামীদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে দেখে তাদেরকে বলবে, কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তারা উত্তরে বলবে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করিনি এবং তাঁর সৃষ্টজীবের সাথে সদ্ব্যবহার করিনি। বেনামাজি কিয়ামতের দিন চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘স্মরণ করো সেই চরম সংকটের দিনের কথা, যেদিন তাদেরকে আহ্বান করা হবে সিজদা করার জন্য, কিন্তু তারা করতে সক্ষম হবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত, হীনতা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে। অথচ যখন তারা নিরাপদ ছিল তখন তো তাদেরকে আহ্বান করা হয়েছিল।’ (সূরা কালাম: ৪২, ৪৩)

সহীহ বুখারীতে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী সা. কে বলতে শুনেছেন, ‘আমাদের প্রতিপালক তার পদনালী খুলে দিবেন। তখন প্রত্যেক মুমিন নর ও নারী সিজদায় পতিত হবে। হ্যাঁ, তবে দুনিয়ায় যারা লোক দেখানোর জন্যে সিজদা করতো সেও সিজদা করতে চাইবে। কিন্তু তার কোমর তক্তার মত হয়ে যাবে। অর্থাৎ সে সিজদা করতে পারবে না।’

তাই অভিভাবকদের জন্য উচিত হলো যে, শিশুদের ১০ বছর বয়স থেকেই নামাজের গুরুত্ব দেওয়া। এই বয়সে নামাজ ছেড়ে দিলে মা-বাবাকে তাকে শাস্তি দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে নামাজের আদেশ করো। আর ১০ হলে নামাজ ছাড়ার জন্য শাস্তি প্রদান করো।’

শরয়ী আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা এবং ইসলামী সরকারপ্রধান নামাজ বর্জনের জন্য শাস্তি প্রয়োগ করতে পারেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মতে, কোনো ব্যক্তি অলসতাবশত ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দিলে তাকে আটক করা হবে।

আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে প্রতিদিন পূর্ণ শর্ত ও রুকনসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক: খতিব ও শিক্ষক

আরও পড়ুন: যেদিন অবিশ্বাসী ও অপরাধীরা আফসোস করবে

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com