১৮ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১০ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

ফেদায়ে মিল্লাত: নুরানী আলোয় উদ্ভাসিত যিনি

ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ.

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

স্মিত হাস্য, সৌম্য দর্শনের মানুষটিকে প্রথম দেখেছি জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগে। মাথায় লাল রুমাল দিয়ে পাগড়ি বাঁধা। চেহারা থেকে নুরানী আভা ফিটকিয়ে বের হচ্ছে। যেন জ্যোতির্ময় এক পুরুষ। শ্বেতশুভ্র বসন। দেখতে গুরুগম্ভীর। তবে কথা শুরু করলে আর তাঁকে কখনো গম্ভীর মনে হয়নি। সুমিষ্ট কথা। প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপনা। শ্রোতাদের প্রাণ কেড়ে নেয়। হৃদয় ভরে যায় তাঁর বয়ানে। বিশেষ করে হিন্দি-উর্দু মিশ্রিত ভাষায় যখন কথা শুরু করতেন মনের আঙিনায় জমা যেত। হৃদয়ের গহীনে প্রবেশ করত তাঁর মুক্তা ঝরানো কথাগুলো।

তিনি তৎকালিন বিশ্বের ইসলামী রেঁনেসার অগ্রদুত, আওলাদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ.। প্রথম দেখাতেই গভীর শ্রদ্ধা-ভালবাসা জন্মে গেল। জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের দ্বিতল ভবনের মঞ্চে যখন আসন অলংকৃত করলেন, তাঁর লালিমাভার চেহারাতে আকর্ষণ করতে লাগল উপস্থিত শ্রোতাদের। অপলক দৃষ্টি তাঁর প্রতি। সামান্য সময়ের জন্য দৃষ্টি এদিক সেদিক যাচ্ছে না। এমন ভক্তি নিয়ে বসেছে সবাই, এ যেন স্মরণ করে দেয় সাহাবা আজমাঈনদের কথা। যারা পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে এমন ভক্তি-শ্রদ্ধা নিয়ে বসত, যদি তাঁদের মাথার উপরে পাখি বসে থাকত, তবুও তাদের খবর হতনা। ঠিক এমনই এক মজলিস দেখেছি ফেদায়ে মিল্লাতের সেই বয়ানের পর্বে। একদম সুনসান নীরবতা। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। কোন আওয়াজ নেই।

এমনই এক নীরব ও নির্মল পরিবেশে ফেদায়ে মিল্লাতের কন্ঠ ভেসে ওঠেছে। ‌’আইয়্যুহান নাছ’ হে মানবমন্ডলী। এভাবে সাবলিল ভঙ্গিমায় কথা শুরু করেছেন। খুব ধীর-স্থির ভাবে। কোন তাড়াহুড়ো নয়। অত্যন্ত সহজ ভাবে শ্রোতামন্ডলীর সামনে তুলে ধরেছেন। কী আকর্ষণ ছিল। কী সুন্দর তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন তিনি। পিপাসায় কাতর মানুষগুলোর অন্তরে যেন সজিবতা ফিরে পেয়েছে। অপরুপ মাধুর্যতা। নিস্প্রাণ অন্তর সিক্ত হয়েছে। নিকষ-কালো অন্ধকার হৃদয়ে আলোর মিনার স্থাপিত হয়েছে। এক সময়ে সে হৃদয় থেকে বের হয়েছে আলোর মিছিল।

ফেদায়ে মিল্লাতের আগমন যেখানে, সেখানেই হাজারো আলেমের মিলন মেলা। সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর আলেমদেরকে আত্মশুদ্ধির ময়দানে সম্পৃক্ত করণ। ওলামায়ে কেরাম যেন তেন ব্যক্তিকে তো আর আত্মশুদ্ধির রাহবার বানায় না। অনেক ক্ষেত্রে এ ময়দান থেকে পিছু হটে নিজ গতিতে চলতে চায়। তবে ফেদায়ে মিল্লাতের কারামতি বললে ভুল হবে না। যোগ্য যোগ্য আলেমদের আত্মশুদ্ধির ময়দানে নামিয়েছেন। কেউ আর পিছে পড়েনি।

কুতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. এর বড় কারিশমা ছিল এটাই। বাঘা বাঘা আলেমদের বশে এনে আত্মশুদ্ধির ময়দানে দাঁড় করিয়েছিলেন। রাজনীতির ময়দান, ইলমী ময়দান, আর্ত-মানবতার সেবার ময়দান, সবখানে তিনি আত্মার সংশোধন করার মেহনত অব্যহত রেখেছিলেন। যার কারণে মাদানী রহ. এর সংস্পর্শে যারা ছিল। সকলেই হর লাইনে তাঁরা ছিলেন মাহের-অভিজ্ঞ।

তদ্রুপ ফেদায়ে মিল্লাতের সোহবাত প্রাপ্ত মানুষদের জীবন রঙিন হয়েছে। অন্ধকার দূর হয়ে নুরানী আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে সব সময়। বিশ্বব্যাপি তাঁর মিশন অব্যহত ছিল সব সময়। আলেম-উলামাদের মাঝে আত্মশুদ্ধির মেহনত ছড়িয়ে দিতে তাঁর প্রাণান্তর চেষ্টা ছিল সব সময়। বহুমুখি চিন্তা- চেতনার প্রাণপুরুষ ফেদায়ে মিল্লাত। সেই দুই যুগ আগে শুনেছি। তিনি খ্রিষ্টান মিশনারীর মোকাবেলায় মুসলিম মিশন গঠন করার আহবান জানিয়েছেন। ঈসায়ী ইস্কুল এর মোকাবেলায় আলেম-উলামাদের স্কুল প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি নিজে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। সেই সময়ে বিষয়টাকে হাস্যকর মনে হয়েছে। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন ফেদায়ে মিল্লাতের কথাগুলো স্মরণ হয়। বারবার মনে পড়ে সেসব স্মৃতি কথা।

হাল জামানার নানান জটিলতা। ফেতনার দ্বার দিয়ে যখন বিষবাস্প বের হচ্ছে। এক সঙ্গীন মুহুর্ত। সংকটে ভরপুর আমাদের সমাজ,আমাদের পরিবেশ পরিস্হিতি। দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানুষ আরেকজনের প্রতি আস্হা রাখতে পারছে না। স্বগোত্রীয় ভাইদের মাঝে দ্বন্ধ লেগেই আছে সব সময়। পুরো মসলিম বিশ্বের মাঝে যেন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এমন সংকটকালে ফেদায়ে মিল্লাতের কথা বেশী স্মরণ হয়।

মুসলিম বিশ্বের মধ্যমণি ছিলেন তিনি। আপদে-বিপদে তাঁর উপস্থিতি ছিল সব সময়। যেখানেই মুসলিম নির্যাতিত-নিপেড়িত দেখা গেছে, সেখানেই পরম বন্ধু রুপে দাঁড়িয়েছেন তাদের পাশে। তাদের সুষ্ঠ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত পিছপা হননি। মজলুম মানুষের জন্য তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠত। কত দাঙ্গা-হাঙ্গামা তিনি ঠান্ডা করেছেন। তাঁর বিচক্ষণতায় হার মানত সবাই। বিশ্ব বিখ্যাত রাজনীতিবিদগণ তাঁর কর্মকৌশল এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সামনে হার মানত। তাঁর কর্মগুলো অনেকের কাছে উল্টা মনে হয়েছে।প্রাথমিক পর্যায়ে ভুল বুঝেছে। শেষমেষ তাঁর কৌশলগুলো বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর সিদ্ধান্ত বিজয়ী হয়েছে।

‘ছিয়াছাত আপকি হায়’ এটা তো ফেদায়ে মিল্লাতকে লক্ষ্য করে বিজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন। তিনি যে ছিয়াত বুঝেছেন, সেটা এই জামানায় বিরল। আসলে এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। বেমেছাল ছিলেন তিনি। তাঁর কথা আজো বারবার স্মরন হয়।ফেদায়ে মিল্লাত আমাদের হৃদয়ে। মনের গহীনে তিনি গেঁথে আছেন। বিশ্ব মুসলিমের হৃদয় থেকে কোনদিন মুছবে না। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে সমাসিন করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: ফেদায়ে মিল্লাত ও আমার স্বপ্নপুরুষ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com