ফেরত যাচ্ছে ৪ হাজার কোটি টাকা

ফেরত যাচ্ছে ৪ হাজার কোটি টাকা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম: দেশের উন্নয়নে সরকারের অন্যতম মেগা প্রকল্প মেট্রো রেলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খরচ করতে না পারায় বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক টাকা ফেরত নেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মেট্রো রেলের চার প্রকল্পে আট হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে তিন হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা ফেরত যাচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এডিপিতে মেট্রো রেলের চার প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া অর্থের মধ্যে চার মাসে খরচ হয়েছে মাত্র ৭০১ কোটি টাকা।

প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে না পারায় সংশোধন হচ্ছে এডিপি। বরাদ্দ কমে দাঁড়াচ্ছে চার হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ কমছে তিন হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা।

জানা গেছে, মেট্রো রেল লাইন-৬ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ তিন হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে চার মাসে প্রকল্পটির আওতায় খরচ হয়েছে মাত্র ৫৫৮ কোটি টাকা। পরিকল্পনা মতো কাজ করতে না পারায় প্রকল্পটির বরাদ্দ কমছে ৬০০ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে দুই হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের এক হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা আর বৈদেশিক ঋণ এক হাজার ৪৮০ কোটি টাকা।

মূল এডিপিতে প্রকল্পটিতে বৈদেশিক অর্থায়নে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, গত অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পটির আওতায় মোট খরচ হয়েছে ২৩ হাজার ৯৮ কোটি টাকা বা ৬৯.৩১ শতাংশ। ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৮.০৮ শতাংশ। প্রকল্পটির মোট অনুমোদিত ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। মেট্রো রেল লাইন-১ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ তিন হাজার ৯১১ কোটি টাকা।

এর মধ্যে চার মাসে খরচ হয়েছে মাত্র ৪০ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ কমছে তিন হাজার ৫৯ কোটি টাকা। আরএডিপিতে মেট্রো রেল লাইন-১ প্রকল্প বরাদ্দ পাচ্ছে ৮৫২ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে শুধু বৈদেশিক ঋণ কমছে দুই হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে অক্টোবর পর্যন্ত মোট খরচ হয়েছে এক হাজার ৮২১ কোটি টাকা বা ৩.৪৭ শতাংশ। প্রকল্পটির মোট অনুমোদিত ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।

সংশোধিত এডিপিতে মেট্রো রেল লাইন-৫ (উত্তর) মূল প্রকল্প বরাদ্দ পাচ্ছে ৬৭০ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৮৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২১০ কোটি টাকা বরাদ্দ কমছে। এ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে মোট খরচ হয়েছে এক হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা বা ৪.৫৯ শতাংশ। প্রকল্পটির মোট অনুমোদিত ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা।

মেট্রো রেল লাইন-৫ (দক্ষিণ) কারিগরি সহায়তা প্রকল্প আরএডিপিতে বরাদ্দ পাচ্ছে ৯০ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ১৫৮ কোটি টাকা। বরাদ্দ কমছে ৬৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে মোট খরচ হয়েছে ২৬৭ কোটি টাকা বা ৬৫.০৪ শতাংশ। প্রকল্পটির মোট অনুমোদিত ব্যয় ৪১১ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এসব প্রকল্প বৈদেশিক ঋণের। প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসত। ফলে সরকারের ডলার সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হতো। পাশাপাশি প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন হলে জনগণও এর সুফল ভোগ করতে পারত। জনগণকে উন্নয়ন কাজের জন্য যে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, সেটাও দ্রুত লাঘব হতো।

কর্মকর্তারা বলেন, মেট্রো রেলের মতো এই বড় প্রকল্পগুলোকে বরাদ্দ দিতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ছোট প্রকল্প চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পায়নি। ফলে ছোট প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বেশি সময় লাগছে। জনগণও উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর বিশেষ সুবিধায় মেগাপ্রকল্পগুলো বরাদ্দ নিয়ে এখন খরচ করতে পারছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির এক প্রকৌশলী বলেন, ‘বড় প্রকল্পগুলোতে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে তারা খরচ করতে পারে না। আর আমরা বরাদ্দ চেয়েও পাই না। তিন বছরের প্রকল্প সাত বছরে গড়ালেও ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে। এত কম বরাদ্দ পেলে ১৫ বছরেও কাজ শেষ হবে না।

তিনি বলেন, দেখা যায়, বড় প্রকল্পগুলো টাকা খরচ করতে না পারলে তখন বরাদ্দ বাড়ানো হয়। পূর্বপরিকল্পনা না থাকলে কি শেষ সময়ে কাজ শেষ করা যায়? অর্থবছর শেষ হওয়ার দু-তিন মাস আগে বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন এত টাকা কিভাবে খরচ করব বলেন?’

বরাদ্দকৃত টাকা খরচ করতে না পারার বিষয়ে মেট্রো রেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এন সিদ্দিককে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও সাড়া মেলেনি।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে এডিপিতে যখন বরাদ্দের জন্য পরিকল্পনা করা হয়, তখন মনে হয় না বৈজ্ঞানিকভাবে করা হয়। এটা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবস্থাপনার দূরদর্শিতা বা দক্ষতার অভাব। এ কারণে প্রতিবছর একই ঘটনা ঘটছে। প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো সচেতন হওয়া দরকার।

তিনি বলেন, টাকা খরচ করতে না পারায় দেশীয় প্রকল্পগুলোতে হয়তো সরকারের টাকা এখন বেঁচে যাচ্ছে। কিন্তু পরে এই প্রকল্পেরই আবার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পগুলোতে টাকা ছাড় চলমান থাকলে ডলার সংকট কিছুটা কাটানো যেত, কিন্তু সরকারের এ বিষয়ে আলাদা কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *