২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১০ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

বাকিয়্যাতুচ্ছলফ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। তাঁকে বাকিয়্যাতুচ্ছলফ তথা পূর্বসূরীদের অবশিষ্ট ব্যক্তি বললে ভুল হবে না। আসলে তিনিই এখন বাকিয়্যাতুচ্ছলফ। তাঁর জ্ঞান-গরিমা, চিন্তাধারা, রাজনৈতিক কলা-কৌশল, এমনকি তাঁর প্রতিটা পদক্ষেপ যেন পূর্বসূরী মহান ব্যক্তিদের মতো।

তিনি যদিও সরাসরি কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। প্রচলিত এমন রাজনীতির প্রবক্তাও নয়। তবে তিনি যে ধারার রাজনীতি করেন সেটা আসলেই অতুলনীয়। এ জামানার রাজনীতিবিদদের তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়া উচিত। তিনি যেভাবে কদম ফেলে চলেন সেটা বিজ্ঞজনদের ভাবিয়ে তোলে। প্রাথমিক অবস্থায় তাঁর কর্মপদ্ধতি, তাঁর কথা অনেকেরই বুঝে আসে না, কিন্তু মানুষ যখন ধাক্কা খেয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সকলেরই বোধগম্য হয়।

দেখুন! হেফাজতে ইসলামের নেতাগণ দেরীতে হলেও এখন আল্লামা মাসঊদের সুরে কথা বলা শুরু করেছেন। একদম হুবহু তাঁর দর্শনকে আঁকড়ে ধরেছেন। কেউ আর এদিক-সেদিক করতে চাচ্ছেন না। সেদিন হেফাজতের ওলামা-মাশায়েখ সন্মেলনে হেফাজতের নায়েবে আমীর এবং দেওনার পীর সাহেব খ্যাত অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী সাহেব যে বক্তৃতা করেছেন, এটাতো আল্লামা মাসঊদ সাহেবের বক্তব্য। যেটা তিনি যুগ যুগ ধরে বলে আসছেন।

অথচ ওই বক্তৃতার কারণে তাঁকে বহুবার গালমন্দ করা হয়েছে। দালাল বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সরকারের ধামাধরা মনে করা হয়েছে। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের নেতার এমন বক্তব্য দেওয়ার পরে কোনো আওয়াজ ওঠেনি, বরং মুহুমুহু স্লোগানে সাধুবাদ জানানো হয়েছে।

হেফাজতের নেতারা এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বসছেন। নিজেদের দাবী-দাওয়া পেশ করছেন এবং তাদের বৈঠক ফলপ্রসু হয়েছে সেটা প্রমাণও হচ্ছে। তবে আল্লামা মাসঊদ সাহেব জাতির স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেন, বিভিন্ন সময়ে আলেমদের এবং কওমী মাদ্রাসার সুবিধা-অসুবিধার কথা তুলে ধরেন। এটা ছাড়া তো আর কিছু নয়। কিন্তু তারপরেও আল্লামা মাসঊদ সাহেবকে তুলোধূনো করা হয়ে থাকে।

মোটকথা পুরোপুরি আল্লামা মাসঊদ সাহেবের থিউরী বা দর্শন যেন মুজবুত করে ধরেছেন হেফাজতের নেতারা। নিজের সংগঠন বাঁচাতে, আলেম-উলামা এবং কওমী মাদ্রাসার উন্নয়নে এখন আর আক্রমনাত্মক ভাবে এগিয়ে যাচ্ছেনা। বরং সবকিছু সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে, সবার সাথে লিঁয়াজো করে দ্বীন ইসলামের তরক্কী করতে এখন বদ্ধপরিকর।

১৮৫৭ সনে সিপাহী বিপ্লবের পরে আলেমগণ কিন্তু রাজনীতির কৌশল পরিবর্তন করেছিলেন। এমন নয় যে তৎকালিন ওলামায়ে কেরাম রাজনীতি করেননি, বরং রাজনীতির কৌশল বদলে ফেলেন। যখন ব্রিটিশদের হাতে হাজার হাজার আলেম শহীদ হলেন, তখন চিন্তা করলেন এভাবে এগোলে শুধু আলেম-উলামাগণ বেশী শাহাদাত বরণ করবে। তখন তাঁরা দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করলেন।

যেখানে রিজাল তৈরী হবে। ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে আলেম সমাজ। সারা দুনিয়ার মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যাবে দ্বীনের দাওয়াত। এরকম কৌশল নিয়ে তাঁরা সামনে পা ফেলতে লাগলেন। এজন্য দারুল উলুম দেওবন্দ স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার। এখান থেকে রিজাল তৈরী হয়ে তাঁরা বীরদর্পে সামনে এগিয়ে চলেছেন। তালিমের ইদারা ঠিক রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সামনে চলেছেন।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ রিজাল তৈরীর কারিগর। তিনি এ ময়দানে এক তাহরীক গড়ে তুলেছেন। সেই সাথে দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অক্ষত রেখে অত্যন্ত কৌশলে সামনে চলছেন। তিনি আক্রমনাত্মক ভঙ্গিতে না গিয়ে রক্ষানাত্মক ভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন। কওমী মাদ্রাসাগুলোর ফিকির করেছেন আজীবন। কীভাবে এ ইদারাগুলোর কোনো ক্ষতি না হয় সে প্রচেষ্টা ছিল। যে কারণে তাঁর কর্মপদ্ধতিগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে কারো বুঝে আসেনি, পরে কিন্তু সবার কাছে সমাদৃত হয়েছে। তিনি পুরোপুরি আকাবির-আছলাফের অনুগামী। তাঁদের কদমেই পা রেখে চলেছেন।

আল্লামা মাসঊদের কর্মপদ্ধতি এত চমৎকার, যেটা এখন সর্বস্তরের মানুষ বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে বলতে বাধ্য হলেন, ‘আল্লামা মাসঊদ সাহেবের লাখো আলেমের ফতোয়া প্রকাশের পর থেকে এদেশে জঙ্গী-সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেকাংশ কমে গেছে।’ বড় সুন্দর কথা তিনি বলেছেন। অথচ আল্লামা মাসঊদের লাখো আলেমের ফতোয়া প্রকাশের পর অনেকেই হাসি-ঠাট্টা করেছেন। নানান কথা বলেছেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো এমন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন কথা বলার দ্বারা অনেক কিছু আন্দাজ করা যায়। মানে তাঁর সেই লাখো আলেমের স্বাক্ষরিত ফতোয়া বিশ্বব্যাপি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এমনকি আমাদের সরকারের কাছেই সবচেয়ে বেশী গ্রহণীয় হয়েছে।

আমাদের আলেম সমাজের গায়ে কিন্তু জঙ্গী তকমা লাগানোর জন্য একশ্রেণীর সুবিধাবাদীরা ওঁৎ পেতেছিল। ওরা চাচ্ছিল আলেম সমাজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক। কিন্তু আল্লামা মাসঊদ সাহেব যখনই লাখো আলেমের ফতোয়া প্রকাশ করলেন, তখন থেকে সবাই নড়েচড়ে বসা শুরু করল। সকলে হুঁশ ফিরে আসল। আর আলেমদের জঙ্গী বলা যাবে না। এমন সিদ্ধান্তে আসল সবাই।

এজন্য তিনি বাকিয়্যাতুচ্ছলফ। পূর্বসূরী আলেমদের অবশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁর চিন্তাধারা,কর্মকৌশল বেমেছাল। তাঁর কর্মধারাতে মনেপড়ে আকাবির-আছলাফের কথা। সেই কাসেম নানুতবী রহ., শাইখুল হিন্দ রহ., শাইখুল ইসলাম মাদানী রহ.) এর কথা স্মরণ হয়। সুতরাং এই মহান আলেমের দীর্ঘ নেক হায়াত এবং সুস্থতা কামনা করি। আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।

  • লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com