২৮শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৬শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

বাঙালির চেতনায় বসন্তবরণ

প্রকৃতি । সিনথিয়া সুমি

বাঙালির চেতনায় বসন্তবরণ

কবির ভাষায়- ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত’। কিন্তু আজ ফুল ফুটেছে আর জানান দিয়েছে বসন্ত ঋতু আমাদের মাঝে হাজির। প্রকৃতি আজ দক্ষিণা দুয়ার খুলে দিয়েছে আর সে দুয়ারে বইছে ফাগুনের হাওয়া। বসন্তের আগমনে কোকিল গাইছে গান। ভ্রমরও করছে খেলা। গাছে গাছে পলাশ আর শিমুলের মেলা। প্রাচীন আমল থেকেই বাংলার এই অঞ্চলে বসন্ত উৎসব পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয়। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে। মৃদু মৃদু বাতাস শীতের রুক্ষতা দূর করে মনকে উদাস করে দিচ্ছে। বছর ঘুরে আবারও ফাল্গুনের দেখা। ষড় ঋতুর বাংলায় বসন্তের রাজত্ব একেবারে প্রকৃত সিদ্ধ। ঋতুরাজ বসন্তের বর্ণনা কোনো রংতুলির আঁচড়ে শেষ হয় না। কোনো কবি-সাহিত্যিক বসন্তের রূপের বর্ণনায় নিজেকে তৃপ্ত করতে পারেন না। তবুও বসন্ত বন্দনায় প্রকৃতিপ্রেমীদের চেষ্টার যেন অন্ত থাকে না। ফাগুনের আগুনে, মন রাঙিয়ে বাঙালি তার দীপ্ত চেতনায় উজ্জীবিত হবে। বঙ্গাব্দ অনুসারে বছরের শেষ দুটি মাস ফাল্গুন-চৈত্র বসন্তকাল। বসন্ত ঋতুকে ষড়ঋতুর রাজা বা ঋতুরাজ বলা হয়।

পহেলা ফাল্গুন বা বসন্ত উৎসব কেবল উৎসবে মেতে ওঠার সময় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্য, বাঙালিসত্তা। সে ঐতিহ্যের ইতিহাসকে ধরে রাখতে পারলেই বসন্ত উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্ম ছড়িয়ে দিতে পারবে বাঙালি চেতনাকে। বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্ত রঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির উপরও রং ছড়ায়। ১৯৫২ সালের আট ফাল্গুন বা একুশের পলাশরাঙা দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের এ উৎসব এখন গোটা বাঙালির কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। বাংলায় বসন্ত উৎসব এখন প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও এর শুরুর একটা ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে, যা অনেকের অজানা। ইতিহাস বলে, মোগল সম্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বসন্ত উৎসব। তখন অবশ্য ঋতুর নাম এবং উৎসবের ধরনটা এখনকার মতো ছিল না। তখনকার আর এখনকার ফাল্গুনের এই উৎসব একদম ভিন্ন। গ্রামে গ্রামে যে আয়োজন হতো তাতে আতিসাজ্যের কোনো সুযোগ ছিল না। আর এখন, সব আয়োজনে খাবার থেকে বিনোদন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের লোকদেখানো। মমতা মাখানো মা খালাদের পিঠা পুলি পরিবেশনা যেখানে গ্রামের সব বয়সী শিশুদের অবাধ নিমন্ত্রণ সেই উৎসব এখন বইয়ের পাতাতেও পাওয়া যাবে না। কালের বিবর্তনে আমরা আধুনিক হয়েছি ঠিকই কিন্তু আমাদের বাঙালি সত্বা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

ফাগুনের হাত ধরেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির আজ এতো বর্ণিল সাজ। বসন্তের এই আগমনে প্রকৃতির সাথে তরুণ হৃদয়েও লেগেছে দোলা। সব কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে, বিভেদ ভুলে, নতুন কিছুর প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে বসন্তের উপস্থিতি। শীতকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়েই বসন্ত বরণে চলবে ধুম আয়োজন। শীত চলে যাবে রিক্ত হস্তে, আর বসন্ত আসবে ফুলের ডালা সাজিয়ে। বাসন্তী ফুলের পরশ আর সৌরভে কেটে যাবে শীতের জরা-জীর্ণতা। গাছের ঝরা ঝরা পাতা শেষে এখন আবার নতুন পাতায় পল্লবে সেজেছে গাছগুলো। বসন্তকে সামনে রেখে গ্রাম বাংলায় ভালোবাসার মানুষেরা মন রাঙাবে বাসন্তি রঙ্গেই। শীতের শেষে ঋতুচক্রের এই মাস বাঙালির জীবনে প্রকৃতির রূপ বদলে যায়।

গাছে গাছে ফুল ফুটবার এই দিনটিকে চিরাচরিতভাবে পহেলা ফাল্গুন হিসেবে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ঝরে পরা শুকনা পাতার মর্মর ধ্বনির দিন শেষ হয়ে আসে। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতই বাঙালির মনেও দোলা লাগায়। একই সাথে বাসন্তি রং এর শাড়ি ও পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে আনন্দে মেতে ওঠার আবাহন বাংলার তরুণ-তরুণীরা। বিভিন্ন স্থানে নর-নারীর বাসন্তী সাজ-সেজে মনে করিয়ে দিবে, ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত। বাসন্তী শাড়ি পরে খোঁপায় গাদা ফুল গুঁজে নারীরা হাজির হয়ে বসন্ত বরণ উৎসব উদযাপন করতে। পলাশ, শিমুল গাছে লাগে আগুন রঙের খেলা। প্রকৃতিতে চলে মধুর বসন্তে সাজ সাজ রব, বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। মিলনের এ ঋতু বাসন্তী রঙে সাজায় মনকে, মানুষকে করে আনমনা। বসন্ত হচ্ছে অনুভব আর আবেগের ঋতু। আগুন রাঙা এই ফাগুন শুধু প্রকৃতিকেই উচ্ছ্বাস আর আবেগের রঙে রাঙায় না, এ আবেগ ছড়িয়ে পড়ে তরুণ প্রাণে। প্রাণের টানে হোক বা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই হোক—এই ঋতু মনকে করে উতলা আর বাঁধনহারা।

বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তের উপরও রং ছড়ায়। এই বসন্তে বাঙালির দ্রোহ প্রেম আর দেশপ্রেমের অনন্য নজির রয়েছে। কেননা আমাদের ভাষা- স্বাধীনতা সংগ্রাম এই বসন্তে শুরু হয়েছিল। তাই এই বসন্তে বাঙালি হৃদয় কিছুতেই ঘরে থাকে না। যেমনি থাকেনি- বায়ান্ন ও একাত্তরে। যেকোনো সংকটে বাঙালিকে জেগে উঠতে এই বসন্ত সাহস যুগিয়েছে। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে বিশ্ব দরবারে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে সামনে এগিয়ে যাবে এই মর্মে আমাদের কাজ করতে হবে এ হোক আমাদের শপথ।

লেখক : শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com