১৯শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী: চাই এক স্বপ্নের বাংলাদেশ

  • মুফতি মাহতাব উদ্দীন নোমান

আজ মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে আজকের এই দিনে পশ্চিম পাকিস্তানের পরাধীনতা থেকে আমরা মুক্তি পাই। নিষ্কৃতি পাই পাকিস্তানীদের করা দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচার ও পাশবিক জুলুম থেকে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে, লক্ষ লক্ষ শহীদদের জীবন ও মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায় বলতে হয়, ‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

সত্যিই সেই বীভৎস নিধনযজ্ঞ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সামনে অন্য সব নৃশংসতা ম্লান হয়ে যায়। সেই গণহত্যা ও ধ্বংসলীলার বর্ণনা একজন স্বাভাবিক সুস্থ ব্যক্তির পক্ষে কখনোই সম্ভব না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়লে আমরা নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি বুঝতে পারি যে, আমাদের এই স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল অন্যায়কে প্রতিহত করা, জুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ও দুর্নীতিকে না বলা।

মূলত পাকিস্তানিদের জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে বাংলার শান্তিকামী জনগণ। তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তাদের কাল হাতকে চিরতরে ভেঙে ফেলে। নিজেদের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রু বিসর্জন দিয়ে এক সাগর রক্ত ঢেলে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার মহান বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তীর পরেও কি আমরা এই চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। আমরা কি পেরেছি স্বাধীন বাংলাদেশ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে? জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে? নীতি ও নৈতিকতার উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থেকে দুর্নীতিকে না বলতে?

অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন ও দুর্নীতির ক্ষতির পরিমাণ ও পরিধি এত ব্যাপক যে, এর কালো থাবা থেকে কেউ রেহাই পায় না। এগুলো মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন বিনষ্ট ও ধ্বংস করার অন্যতম প্রধান কারণ। তাছাড়াও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পারিবারিক সুশাসন, সুস্থ-সহনশীল ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি গঠন এবং স্থিতিশীল সামাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে এগুলো প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

এর ফলে মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। পারিবারিক বিশৃঙ্খলা ও সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি হয়। সামাজিক চরম অবক্ষয় দেখা দেয় এবং মানুষ তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আমাদের সমাজের দিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকালেই এর প্রমান মেলে। সমাজে ব্যভিচার-ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, লুটতরাজ, সুদ-ঘুষ, মারামারি-হানাহানি, বেহায়াপনা-অশ্লীলতা, প্রতারণা-ধোকাবাজি ও মাদকের সয়লাব চলছে।

নিরাপত্তাহীনতা এত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আজ সন্তান বাবা-মার কাছে নিরাপদ না। সন্তানের কাছেও বাবা-মা নিরাপদ না। ভাই ভাইয়ের খুনাখুনি, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশানো, ওজনে কম দেওয়া থেকে শুরু করে সমাজে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অপরাধপ্রবণতা তো প্রতিদিনের সংবাদ। শিক্ষাঙ্গন থেকে হাসপাতাল, অফিস থেকে বাজার, কোন স্থানেই দুর্নীতিমুক্ত না।

ঘরে-বাইরে এমনকি ধর্মীয় অঙ্গনেও এর দুর্গন্ধে ভরে গেছে। কেমন যেন আমরা দিনে দিনে অন্যায় ও দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে যাচ্ছি। নিজেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কর্মের অন্যতম অঙ্গ হিসেবে দুর্নীতি ও অন্যায়কে গ্রহণ করে নিচ্ছি। এগুলোর সামনে আমরা এখনো পরাধীন রয়ে গেছি। এভাবে চলতে থাকলে আমরা জাহিলি অন্ধকারের যুগকেও হার মানাবো।

আমাদের ভবিষ্যতকে সুন্দর করতে, অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে আগামী প্রজন্মকে নির্মল নিঃশ্বাস নিতে ও নিরাপদ বাংলাদেশ উপহার দিতে অন্যায় ও দুর্নীতি প্রতিকার করা খুব দরকার। জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো একান্ত প্রয়োজন।

আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবী যত কিছুর প্রয়োজন, সব তিনি কোরআনের মধ্যে অবতীর্ণ করেছেন। এই অন্যায়, অত্যাচার ও দুর্নীতি থেকে বিরত থাকার সঠিক পদ্ধতি তিনি কোরআনে বর্ণনা করে দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেন, ‘যাদেরকে আমি পৃথিবীতে ক্ষমতাবান করলে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, ন্যায়ের আদেশ করে এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করে। আর কর্মসমূহের পরিণাম আল্লাহরই অধীনে।’ (সূরা হাজ্জ, আয়াত ৪১)

আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে মুসলমানদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দেওয়ার পরে তারা কিভাবে দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচার মুক্ত রাষ্ট্র গঠন করবে, এর ফলপ্রসূ রূপরেখা এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আয়াতে চারটি কাজের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

১. নামাজ কায়েম করবে।
. যাকাত আদায় করবে।
. ভালো ও নেক কাজের আদেশ করবে।
৪. মন্দ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে।

ইসলামী ইতিহাস পড়লে আমরা এ বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে জানতে পারি যে, যুগে যুগে যখনই অন্যায়-অবিচার এবং দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখনই আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলকে প্রেরণ করেছেন। তারা এই চারটি কাজ যথাযথভাবে পালন করেছেন। যার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতি দূর হয়ে গেছে।

সপ্তম শতাব্দীতে সারা বিশ্ব যখন জাহিলিয়াতের নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত, পাশবিকতায় যখন সাড়াবিশ্ব আচ্ছন্ন, তখন ইসলামের নবী মোহাম্মদ (সা.) আরব উপদ্বীপের পথভ্রষ্ট মরুচারী বেদুঈন সমাজে নীতিনৈতিকতা ও সততার যে রাষ্ট্র কায়েম করেন, তার উদাহরণ মেলা ভার। সেই সোনার রাষ্ট্রের কোথাও দুর্বৃত্ত ও দুরাচারের এতটুকুও অবিশিষ্ট ছিল না। কোথাও ছিল না শোষণ নির্যাতনের লেশমাত্র। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিল অলঙ্ঘনীয়। মানুষ ছিল মানুষের জন্য।

এত বড় পরিবর্তনের রুপরেখা আমরা হযরত জাফর বিন আবু তালেব (রা.) থেকে শুনি। আম্মাজান উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেন করেন। ইসলামের শুরু জামানায় মক্কাবাসীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মুসলমানগণ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তৎকালীন আবিসিনিয়ার বাদশা নাজ্জাশী তাদের নিকট ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জানতে চান। তখন জাফর বিন আবু তালেব সামনে অগ্রসর হন এবং বাদশাকে উদ্দেশ্য করে বলেন-

‘মহামান্য বাদশাহ! আমরা ছিলাম একটি মূর্খ জাতি। মূর্তির উপাসনা করতাম, মৃত জন্তু ভক্ষণ করতাম, অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, এবং প্রতিবেশীর সাথে অসদ্ব্যবহার করতাম। আমাদের সবলরা দুর্বলদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করত। আমরা ছিলাম এমনি এক অবস্থায়। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা আমাদের নিকট একজন রাসূল পাঠালেন। আমরা তাঁর বংশ, সততা, আমানতদারী, পবিত্রতা ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্‌বান জানালেন, যেন আমরা তার একত্বে বিশ্বাস করি, তাঁর ইবাদত করি এবং আমরা ও আমাদের পূর্ব পুরুষরা যেসব গাছ, পাথর ও মূর্তির পূজা করতাম তা পরিত্যাগ করি।

তিনি আমাদের নির্দেশ দিলেন সত্য বলার, গচ্ছিত সম্পদ যথাযথ প্রত্যর্পণের, আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখার, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার, হারাম কাজ ও অবৈধ রক্তপাত থেকে বিরত থাকার। তাছাড়া অশ্লীল কাজ, মিথ্যা বলা, ইয়াতিমের সম্পদ ভক্ষণ ও নিষ্কলূষ চরিত্রের নারীর প্রতি অপবাদ দেয়া থেকে নিষেধ করলেন। তিনি আমাদের আরও আদেশ করেছেন এক আল্লাহর ইবাদত করার, তাঁর সাথে অন্য কিছু শরীক না করার, নামায কায়েম করার, যাকাত দানের এবং রোযা রাখার। আমরা তাঁকে সত্যবাদী জেনে তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি এবং আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণ করেছি।

সুতরাং যা তিনি আমাদের জন্য হালাল ও হারাম ঘোষণা করেছেন, আমরা তা হালাল ও হারাম বলে বিশ্বাস করেছি। এ কারণে আমাদের জাতি আমাদের শত্রু হয়ে গেল। তারা আমাদেরকে শাস্তি দিল, নির্যাতন করল এবং আমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত থেকে ফিরিয়ে মূর্তিপূজা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করল। সকল ঘৃণ্য বস্তুকে হালাল মনে করার জন্য তারা আমাদের ওপর বল প্রয়োগ করতে লাগলো। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১৭৪০/সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৩৩৬)

জাফর বিন আবু তালেবের এই বক্তব্যের মধ্যে আমরা কোরআনে বর্ণিত চারটি বিষয়কে স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই। সুতরাং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন এই চারটি বিষয় বাস্তবায়নে তৎকালীন জাহিলি জামানার সকল অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন ও দুর্নীতিকে দূর করেছেন, আমরাও যদি এই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করি, তাহলে আমাদের সমাজ থেকেও সেগুলো দূর হয়ে যাবে। প্রতিষ্ঠিত হবে এক স্বপ্নের বাংলাদেশ, যা পুরো বিশ্বের জন্য আইডল ও অনুকরণীয় হবে।

নবী যুগের পরবর্তী যুগ ছিল খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ। তারাও সঠিকভাবে এই চারটি বিষয় বাস্তবায়ন করার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শুধু আরব জাহানে নয় বরং সারা পৃথিবীর এক বিরাট অংশের ক্ষমতা প্রদান করেছেন। মাত্র ১২ বছরের মধ্যে তদানীন্তন পৃথিবীর দুই পরাশক্তি তথা পারস্য ও রোমের সম্রাজ্যকে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মুখে ভূলুণ্ঠিত করেছেন।

সুতরাং কোনো দেশ ও জাতিকে অন্যায়-অত্যাচার ও দুর্নীতিমুক্ত রাখে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিতে মানুষের ইসলামী মূল্যবোধের স্ফুরণ ঘটাতে হবে। ইসলাম নীতি-নৈতিকতার ধর্ম। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। নবী-রাসুলরা নীতিনৈতিকতার যে শিক্ষা দিয়েছেন, ঘরে ঘরে তার প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এই বিষয়গুলো বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন।

লেখক: খতীব ও শিক্ষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com