স্মরণ । ড. আহমদ আবুল কালাম
বিনয়ী ও রসিক ছিলেন শেখ আব্দুল্লাহ
আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ (আল্লাহর রহমত তার উপর বর্ষিত হোক) মানুষ হিসেবে অসাধারণ বন্ধুবৎসল, সহজ-সরল-বিনয়ী ও রসিক ছিলেন। আল্লাহ তাকে মাফ করুন ও জান্নাত নসিব করুন, আমিন।
তিনি প্রচলিত ধারার প্রোটোকল মানতেন না। যেকোনো নাগরিক যেকোনো সময় ফোন করে তার সাথে কথা বলতে পারতেন। অর্থাৎ তার প্রতিমন্ত্রী পদ লাভ করার পরে। অনেকেই বলেছেন, এ পদ তাকে অহংকারী ও গণমানুষ-বিচ্ছিন্ন না করে বরং গণমুখী ও বিনয়ী করে তুলেছিল।
কেউ তাকে মোবাইল করার পরে তিনি ব্যস্ত থাকলে বলতেন, পরে করুন। বিশেষ ব্যস্ত না থাকলে আপামর জনসাধারণের সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলতেন। তার পরস্পর কথোপকথনের ধরন ছিল এমন যে, অপরিচিত ফোন-কারী ব্যক্তিও যেন তাঁর দীর্ঘদিনের একান্ত একান্ত একান্তভাবে পরিচিত।
তার প্রতিমন্ত্রী মেয়াদকালের প্রথম দিকে চাঁদ দেখা নিয়ে বিতর্ক হলে এ বিষয়ে ‘সময় টেলিভিশন’ একটি লাইভ প্রোগ্রামের আয়োজন করে।
উক্ত প্রোগ্রামে আমি ছিলাম একজন আলোচক অতিথি।
আলোচনায় চেষ্টা করেছি মাননীয় প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সাহেবকে অপবাদ, অভিযোগ, মিথ্যা আরোপ ও সমালোচনা থেকে উদ্ধার করতে।
হয়তো তিনি তা সরাসরি দেখছেন অথবা পরে দেখছেন অথবা কেউ তাকে ইতিবাচকভাবে অবহিত করছেন। অনুষ্ঠান করার কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি আমাকে ফোন করে অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। প্রায় আধা ঘন্টা আমার সাথে কথা বলেন এবং আমাকে নানাভাবে উৎসাহিত করেন।
এই করোনা দুর্যোগ শুরু হওয়ার পরে ডিবিসি নিউজের রাজকাহনে আমি তার সাথে একই প্রোগ্রামে ছিলাম। আমি ও প্রসেসর ডাক্তার মো. আব্দুল্লাহ (বিসিএমইউ ) সরাসরি স্টুডিও থেকে এবং তিনি তার নিজ বাসা থেকে অংশগ্রহণ করেন।
সেখানেও তিনি আমার, প্রফেসর আব্দুল্লাহর ও আমাদের সকলের অনেক প্রশংসা করেন, আমাদেরকে অনেক অনেক সম্মানিত করে তোলেন। তিনি কথাবার্তায় অন্যকে যথেষ্ট সম্মান দিতে জানতেন সহজভাবে।
আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন আমিন।
বেশকিছু লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি তাকে সহযোগিতা করেছি। তিনি মুখ থেকে বলেছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, অথবা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এভাবে লেখাটা তৈরি করতে হবে, আমি চেষ্টা করেছি তাকে অধ্যায়ন করে তার মনোভাব তার মত করে লেখনীর ভেতরে উপস্থাপন করতে।(কারণ লেখাটি তো তার লেখা হিসেবে তার নামে উপস্থাপিত হবে) কোন কোন লেখার ক্ষেত্রে তিনি মন্তব্য করেছেন
“আমার মনের কথাগুলো ভাই আপনি কিভাবে তুলে ধরলেন? বলুনতো!”
এক্ষেত্রে তিনি এমনভাবে সেই লেখালেখির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন যে, আমি ভীষণভাবে মুগ্ধ হয়েছি এবং তার মহানুভবতায় যথেষ্ট আনন্দবোধ করেছি। এ কারণে, প্রতিমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে ও পরে যখনই তিনি এজাতীয় কাজে ডাকতেন, আমি সহজেই তার ডাকে সাড়া দিতাম।
আল্লাহ তাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন, আমীন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, যেদিন তিনি প্রতিমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ করতে বঙ্গভবনে যাবেন, সেদিন আমি তাকে ফোন করলাম। তিনি ফোন ধরলেন। ধন্যবাদ ও মনের আনন্দ প্রকাশ করলাম মনের খুশিতেই। কত বড় উদার তিনি যে, তিনি সহজভাবে বললেন, শপথের পরে যখন বাসায় আসি, আপনি চলে আসবেন। আমি ও আরো অনেকে ফুল নিয়ে বাসায় গিয়েছিলাম এবং এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যে, প্রাইভেট কার থেকে হাত ধরে তাকে নামিয়ে ছিলাম তার বাসার নিচতলায়। তখন থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যারা যারা সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন, তাদের ফুল দেয়া ও ঝাঁপিয়ে পড়া সংক্রান্ত উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছিলাম আমি ও আরো কেউ কেউ। নতুন প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের অনেক কষ্ট হলেও তা তিনি সহ্য করছিলেন অকাতরে। দীর্ঘ সময় বনানীর তার বাসার নিচের তলায় এভাবে পরিচিত-অপরিচিত গণমানুষের অভিনন্দন গ্রহণ করতে করতে তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়লে আমরা তাকে নিয়ে তার বাসায় চলে যাই এবং আমিসহ অনেকেই তাকে পরামর্শ প্রদান করি ও করেন যে, তিনি যেন কিছুটা বিশ্রাম গ্রহণ করেন। কিন্তু সেগুলো সব তিনি উপেক্ষা করে গভীর রাত পর্যন্ত গণমানুষের ভালোবাসাগুলো দুর্বল শরীরে, অসুস্থ প্রাণে কিন্তু আনন্দচিত্তে গ্রহণ করেন।
তিনি অনেকেরই দাবি, আশা আকাঙ্ক্ষা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি, পারাটা অত সহজ নয়। কিন্তু তিনি কথাবার্তায়, আচার-আচরণে তেমন কোনো দুর্ব্যবহার কারো সাথে করেননি, যেটা তার পদের নিচের উপরের অনেকেই করে থাকেন।
আল্লাহ তাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন আমীন।
লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


