২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৪ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

বিশ্বের ৫৫ দেশের পথে পথে ইসলাম প্রচারকারী করেছের যিনি!

  • পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম

শায়খ নেয়ামাতুল্লাহ তুর্কি। তিনি তুরস্কের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার। ১৯৩১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। উসমানি সম্রাজ্যের শেষ সুলতান আবদুল হামিদের শাসনামলে অনেক আলেমের কাছে তিনি শিক্ষা অর্জন করেন। অতঃপর দ্বীনের কাজে বিশ্বব্যাপী ঘুরে বেড়ান। ৯০ বছরের জীবনের বেশির ভাগ সময় দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এশিয়া ইউরোপসহ বিশ্বের ৫৫ টি দেশে গিয়েছেন। পথে পথে হেঁটে মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করেছেন।

৩০ জুলাই শুক্রবার তুরস্করে রাজধানী ইস্তাম্বুলে শায়খ নেয়ামাতুল্লাহ তুর্কি ইন্তেকাল করেছেন। দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে নিয়োজিত বিশ্ববিখ্যাত এ শায়খের মৃত্যু মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় পরিতাপের ও শোকের খবর।

দ্বীনের দাওয়াতে শায়খ নেয়ামাতুল্লাহর অবদান : পৃথিবী অর্ধশতাধিক দেশে তিনি ইসলাম দাওয়াতে জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছেন। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দির একজন প্রাজ্ঞ আলেম ও দাঈ। এ ইসলামিক স্কলার ইসলামের প্রচারে বিভিন্ন দেশে অনেক দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি ছিলেন দাওয়াতে দ্বীনের খেদমতকারী শায়খদের জন্য অনন্য এক অনুপ্রেরণা। যেমন ছিল তার দাওয়াতি মিশন-

তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় তুরস্ক, সৌদি আরব ও জাপানে অবস্থান করেন। শুধু সৌদি আরবের মদিনায় ১৫ বছর একটি মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মক্কার জাবালে হেরা প্রান্তরের আন নুর মসজিদের ইমাম হিসেবে ১৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত সুলতান আহমদ মসজিদসহ অনেক মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শায়খ নেয়ামাতুল্লাহ জাপানে ১৫ বছর অবস্থান করেন এবং টোকিওতে ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।

বিশ্বের ৫৫টির বেশি দেশে ঘুরে ঘুরে ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এশিয়া ও ইউরোপের ৫৫ টিরও বেশি দেশে তিনি ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সফর করেছেন। সেখানকার ভাষায় ইসলামের পরিচিতিমূলক ছোট কার্ড ও বই প্রস্তুত করে সব সময় নিজের পকেটে রাখতেন আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে তা বিতরণ করতেন। সব স্থানে সব শ্রেণীর লোকদের মধ্যে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতে তিনি ছিলেন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব।

তিনি নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে বিচিত্র পদ্ধতিতে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতেন। এমনকি মানুষকে মদশালা থেকে ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনতে তিনি থাইল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মদের বারে সফর করেন। এসব দেশের মদশালা থেকে অসংখ্য নেশাগ্রস্ত মানুষকে মসজিদে আঙিনায় নিয়ে আনেন তিনি। মানুষের কাছে সহজভাবে হাসিমাখা মুখে ইসলামের কথা বর্ণনা করা ছিল এ তুর্কি আলেমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১৯৮১ সালে তিনি চীন সরকারের অনুমতিক্রমে দেশটিতে সফর করেন। এ সফরে তিনি ২০ হাজারের বেশি পবিত্র কুরআনের কপি পাঠিয়েছেন এবং বিতরণ করেছেন। প্রচণ্ড শীত প্রধান দেশ সাইবেরিয়াসহ রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মধ্যেও শুধু সাদা জুব্বা পরে ইসলামের দাওয়াতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। শীত-গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমেই তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন।

শায়খ নেয়ামাতুল্লাহর জাপানে ইসলাম প্রচার: জাপানের রাজধানী টোকিওতে শায়খ নেয়ামাতুল্লাহ একটি ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন এবং দ্বীন প্রচারের কাজে দেশটিতে দীর্ঘ ১৫ বছর অবস্থান করেন। জাপান, কোরিয়া ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের হাজার-হাজার লোক তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।

জাপানের ইসলামিক সেন্টারের প্রধান ড. সালেহ সামেরি বর্ণনা করেন, শায়খ নেয়াতুল্লাহ জাপানে ১৪ বছরের বেশি অবস্থান করেন। এ সময় তিনি দেশটির উত্তর-দক্ষিণ প্রান্তর চষে বেরিয়ে অসংখ্য মসজিদ ও মাদরাসা স্থাপন করে গেছেন।

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র দাওয়াত, ইসলামের পরিচিতি ও সুমহান শান্তির বাণী মানুষের কাছে তুলে ধরতে তিনি প্রতিদিন ইসলামের পরিচিতিমূলক ছোট বইয়ের শত শত কপি বিতরণ করতেন। সকাল-সন্ধ্যায় মানুষকে ইসলামিক সেন্টারে এসে ইসলাম সম্পর্কে জানার আহ্বান করতেন। মানুষেরাও তার মুখে ইসলামের আহ্বান শুনতে ইসলামিক সেন্টারে এসে উপস্থিত হতো। চলার পথে, বাজারে, স্কুল-কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলতে-ফিরতে তিনি ইসলামের দিকে মানুষকে ডাকতেন। শায়খ নেয়ামাতুল্লাহ তুর্কির আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করন।

‘রাতেরবেলা টোকিওর কেন্দ্রীয় মসজিদে তিনি মানুষকে নামাজের জন্য ডেকে আনতেন। কারো সঙ্গে কোনো বিরোধ-বৈরি মনোভাব ছিল না তার। সব মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে নিমগ্ন থাকতেন। সবার কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি। সব মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা করতেন তিনি। কারো প্রতি অভিশাপ বা বদদোয়া করতেন না। বরং সবার জন্য কল্যাণের দোয়া করতেন। তিনি দোয়ায় বলতেন-

‘হে আল্লাহ, ইসলামের শত্রুদের হেদায়াত দিন। ইসলামের শত্রুদের বিদ্বেষকে হজরত ওমর, খালিদ, ইকরামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতো পরিবর্তন করে ইসলামের সহযোগী হিসেবে কবুল করুন।’

ভিয়েনায় ইসলাম প্রচার: অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার মদশালায় গিয়েও তিনি মানুষকে সত্য ও সন্দুরের পথ ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মানুষ মদপান ছেড়ে দ্বীনর পথে ফিরে আসেন। মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ের এমনই একটি ঘটনা প্রকাশ পায়-

শায়খ নেয়ামাতুল্লাহ তখন মক্কার আন নুর মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেখানে এক লোক এসে শায়খকে সালাম দিয়ে তাঁর কপালে চুমু দেন। যেন শায়খ তার দীর্ঘদিনের পরিচিত। এরপর লোকটি হেসে বলল, শায়খ, আমি ওই তরুণদের একজন; যাদের আপনি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার একটি মদের বারে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। আপনার কথা শুনে আমি জীবন পরিবর্তনের তাওবা করেছি এবং সব সময় আপনার জন্য দোয়া করেছি।

জার্মানিতে ইসলাম প্রচার: ১৯৭৯ সালে শায়খ নেয়ামতুল্লাহ জার্মানির রাজধানী বার্লিনের একটি মসজিদ যান। সেখানও তিনি ইসলামের প্রচার-প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত করেন। দেশটির মদশালা থেকে অনেককে ফিরিয়ে আনেন ইসলামের পথে। মদশালা থেকে ফেরার একটি ঘটনা ছিল এমন-

তিনি স্থানীয় তুর্কিদের বাকি মুসলিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, আপনি আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। আমরা পুরো সময় আপনার কথা শুনব। কিন্তু বার বার অন্যান্য ‍মুসলিমদের কথা জিজ্ঞাসা করায় বাকিরা মদের বারে আছে বলে জানানো হলো।

শায়খ স্থানীয় একজনকে নিয়ে বারে যান। প্রায় ৪০ জন এর পরিচালনা করে। শায়খ সবাইকে উদ্দেশ্যকরে বললেন, ‘হে মুজাহিদগণ, আসসসালামু আলাইকুম।’ মুজাহিদ বলায় সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। শায়খ বললেন, ‘আপনারা তিন কারণে মুজাহিদ।’

প্রথম কারণ : জার্মানিতে আপনারা ইসলামী নাম ধারণ করে চলাফেরা করেন। যা মানুষকে ইসলামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দ্বিতীয় কারণ : আপনারা নিজ পরিবারের রুজি-রোজগারের জন্য জার্মানিতে এসেছেন। এটাও জিহাদের অংশ। তৃতীয় কারণ : আপনাদের পূর্বপুরুষ উসমানীয়রা মুজাহিদ ছিলেন। আপনারা তাদের উত্তরসূরী।

অতঃপর শায়খ বলেন, আমি মদিনা থেকে আপনাদের জন্য একটি সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বলবে ‘লা ইলাহা ইল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’- সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’এরপর তিনি তাদের ইসলামের পথে ফিরতে উৎসাহিত করে কুরআন ও হাদিসের অনেক কথা বলেন। তখন থেকেই ৪০ জনের সবাই ইসলামি অনুশাসন মেনে জীবন যাপন শুরু করেন।

জার্মানি থেকে ফিরে আসার ৩ বছর পর শায়খ একদিন মদিনার মসজিদে নববিতে বসা ছিলেন। পাগরি মাথায় এক তুর্কি এসে জিজ্ঞাসা করল, শায়খ আপনি আমাকে চেনেন? তিনি বললেন, কেন চিনব না। তুমি হয়ত তুরস্কের বড় কোনো ইমাম বা আলেম হয়ে থাকবে! লোকটি বলল, শায়খ, হাজার বছর গেলেও আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি জার্মানির বার্লিনের মদের বারের শেষ ব্যক্তি।

নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মদশালা থেকে দুজন লোক আমাকে মসজিদে নিয়ে যায়। আপনি আমার মাথা স্পর্শ করে বলেছিলেন, ‘আপনার মূল্য আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। তিনি আপনাকে তাঁর ঘরের জন্য কবুল করেছেন।’ আমি নেশাগ্রস্ত হলেও আপনার কথা বুঝতে পারি। এরপর নিজের জীবন পরিবর্তন করে নিয়মিত নামাজ আদায় শুরু করি। সস্ত্রীক ওমরাহ পালন করে ফের আপনার সান্নিধ্যে এসেছি।

শায়খ নেয়ামাতুল্লাহ তুর্কি এ যুগের সেরা ইসলাম প্রচারকদের একজন ছিলেন। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তার অবদান স্মরণীয়। দ্বীনের প্রচার-প্রসারে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ। আল্লাহ তাআলা শায়খ নেয়ামাতুল্লাহ তুর্কিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com