- আশরাফ উদ্দীন রায়হান
২০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার গোধূলি। প্রায় সায়ংকালের রক্তিম বর্ণে ছেয়ে আছে আকাশ। ডিপার্টমেন্ট থেকে বিকালের ক্লাস শেষ করে বেশ ক্লান্তি নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকলাম। রুমে ঢুকেই একজন রুমম্যাটকে ফোন স্ক্রল করা অবস্থায় নির্লিপ্ত ও নির্বিকার দেখে একটু বিমর্ষের মতো মনে হলো। ‘ভাইয়ের হয়নি মনে হয়’—পাশের বেডে বসা আরেক রুমম্যাটের উদ্দেশে তাঁর মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে উচ্চারিত বাক্যটি আমার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হলো সুচালো তীরের মতো! তখনই প্রমাদ গুনলাম—বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অবস্থার সম্মুখীন হলাম!
তারপর আমি বেশ কিছুটা সময় ভাবলেশহীনভাবে কাটিয়ে দিলাম। আপনাকে তখনই সদ্য সাবেক রুমম্যাট বড়ভাইকে ফোন দিতে উদ্যত হয়েও দেওয়া হয়নি—তাঁর মানসিক পীড়নের কথা অনুমান করে। অনন্তর আমাদের ‘৩৫০’ মেসেঞ্জারগ্রুপে তাঁর করা টেক্সট ‘amar hoyni’ আর ‘dua chai’—দেখে আরেক দফা আহত হলাম! ছাঁইচাপা আগুনের মতো যন্ত্রণাক্লিষ্ট আত্মকথনের কী বিস্ময়কর স্বীকারোক্তি—আন্দাজ করে তাঁর সুদৃঢ় মনোবলকে আরেকটিবার ইয়াদ করতে বাধ্য হয়েছিলাম সেদিন।
বৈচিত্র্যে ঠাসা ভাইটির জীবনের নির্দিষ্ট একটি অধ্যায় তথা উচ্চশিক্ষা অর্জনের যৎসামান্য সময় বিলকুল নিকট থেকে আমার অবলোকন করার সুযোগ মিলেছিল বিধায় তাঁর উপর আমার অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপিত হয়েছিল অবলীলায়। এ নাতিদীর্ঘ কলেবরের লেখায় সে সব অন্তরঙ্গ ও হৃদয়োৎসাড়িত ইতিবৃত্ত তোলে ধরা বাহুল্য হয়ে যাবে বলে—আমি যথারীতি তা এড়িয়ে চলে মৌলিকভাবে আমার অভিব্যক্তিটা তোলে ধরতে চাই।
৪২ ও ৪৩ বিসিএসের পরপর দুই-দুটি প্রিলির রেজাল্টে তাঁর যে ফায়সালা এসেছে তা উনার কাছে যেমন দুর্বহ বেদনাবিধুর, ঠিক তেমনিভাবে আমার কাছেও অভাবনীয় তথা কল্পনার অতীত! লোকে বলে ‘কঠোর পরিশ্রম’ এবং ‘সযত্ন পাঠ আর নিমগ্ন সাধনা’—এই দুঃসাধ্য অধ্যবসায় উৎরেই তবে বিসিএসের তালিকায় আত্মদর্শন মিলে। এ কথাটিই আজ দেদারসে প্রচলিত এবং বাস্তবে আমরা দেখছিও তা-ই। এটিকে যদি আমরা ‘সত্যি সত্যি’ ধরেও নিই তাহলেও তাঁকে অপাঙ্ক্তেয় করে রাখার সুযোগ নেই। না, কোনো সুযোগই নেই।
আমি তো দেখেছি যে, তিনি কীভাবে পড়ালেখা করেছেন! আমার তো বিলক্ষণ খেয়াল করার সুযোগ হয়েছে যে, সময়ের সদ্ব্যবহার করে তা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে তিনি কীভাবে ‘বিসিএসের প্রস্তুতিটাকে শাণিত করেছেন, আমি তো ভুলে যাব না যে, তিনি কী আশ্চর্যজনকভাবে দৈনিক ১৮ ঘণ্টা পড়ার অভ্যাসও গড়ে তুলেছিলেন। আমাকে তো মনে রাখতেই হবে যে, কীভাবে তিনি এক ওয়াক্ত নামাজের অযু দিয়ে পরবর্তী তিন ওয়াক্ত নামাজ পড়ার দক্ষতা অর্জন করেছিলেন শুধু সময় বাঁচিয়ে পড়ার জন্য। আমি তো কস্মিনকালেও বিস্মৃত হতে পারব না যে, অন্য সবকিছুর মোকাবেলায় শুধু পড়ালেখাকে ‘পড়ালেখারূপে’ তিনি কীভাবে সহজাত নৈপুণ্যে করায়ত্ত করতে পেরেছিলেন!
আমার জানা নেই যে, উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যাবলি নিয়ে যে প্রার্থী বিসিএস-যাত্রায় প্রস্তত থাকে, সে দুই-দুইবার কীভাবে অকৃতকার্য হয়। তবে একটা উপলব্ধি হয়তো একেবারে ফেলে দেওয়া যাবে না ‘বিসিএসে শুধু চেষ্টা-সাধনা করেই সফল হওয়া যায় না; বরং এর জন্য তকদিরের আনুকূল্যও জরুরি বিষয়।’ অর্থাৎ, চেষ্টা-মেহনত আর ভাগ্যের সমন্বয় ঘটলেই তবে বিসিএসে টেকা যায়। এর একটির কামাইয়েই যত বিপত্তি! তাই এ দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও বলতে চাই যে, তিনি চেষ্টা-মেহনতের কোনো বিচ্যুতি রাখেননি; বরং ‘তকদিরের ফায়সালাই’ তাঁর জন্য অবধারিত হয়ে আছে।
আর এই কথিত ‘বিসিএস ক্যাডার’ বনে যাওয়াই যে জগতে একমাত্র সাফল্যের হাতিয়ার—ব্যাপারটা তো আদৌ এমন নয়। তবে এ কথা আমি অবশ্যই স্বীকার করি যে, ‘একজন বিসিএস ক্যাডার’ যে ইজ্জত, শান, স্ট্যাটাস ও ডিগনিটি নিয়ে লাইফ লিড করেন, তিনি নিঃসন্দেহে সে রকম ‘একজন বিসিএস ক্যাডার’ হওয়ার জন্য সুযোগ্যই ছিলেন না কেবল; যথোপযুক্তও ছিলেন। আর মুসলমান হিসেবে তো আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাআলা যাকে সম্মান ও ইজ্জত দিতে চান তাকে কেউ অপদস্থ ও বেইজ্জতি করতে পারে না।
পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা যার অকল্যাণ ও অমর্যাদা করতে চান, তাঁকে রুখবার সাধ্যও কারো নাই। যে তাঁর সিনায় আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত স্বয়ং তাঁর নিজের কুদরতী কণ্ঠে তিলাওয়াত করা ত্রিশ পারা কুরআন আমানত রেখেছেন, সেই তিনি তাঁকে নিশ্চয় যথাযোগ্য আসনে সমাসীন করবেনই, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা‘আলা যেহেতু তিনি ‘বিসিএস ক্যাডার হবেন’—এটি এখন অব্দি তাঁর ভাগ্যে নির্ধারিত করেননি, তাই এটি নিয়ে আফসোস-অনুশোচনার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকা বোধ হয় না-মুনাসিবই হবে।
আসলে তাঁকে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানানোর মতো কোনো কিছুই আমার সাধ্যায়ত্তে নেই। তবে এতটুকু তো আমি বলতেই পারি যে, অদ্যাবধি পড়ালেখার যে দুর্দান্ত গতি তিনি বজায় রাখতে সচেষ্ট হচ্ছেন তা যদি আর কিছুটা সময় ধরে রাখতে প্রয়াসী হন, তাহলে তিনি এমন কিছু পাবেন, যা ভাবনার অতীত, ইনশাআল্লাহ। তিনি ভুলে যাননি নিশ্চয় যে—
فَتَرۡضٰی رَبُّکَ یُعۡطِیۡکَ لَسَوۡفَ وَ
[অচিরেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে (এমন কিছু) দান করবেন, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে; সূরা আদ-দ্বুহা, আয়াত নং : ০৫]
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী


