৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৮শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

ভারতের প্রতি কঠোর বার্তা দেয়ার দাবি চরমোনাই পীর সাহেবের

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : কুমিল্লার ঘটনা নিয়ে প্রতিবেশী দেশের একশ্রেণীর মিডিয়া, সরকারী দলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সুশীল সমাজ যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সব ধরণের নীতি-নৈতিকতা ছাড়িয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলাতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দিতে হবে।

আজ শনিবার (২৩ অক্টোবর) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম এসব কথা বলেন।

বক্তব্যের শুরুতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রয়াত আলেমদের স্মরণ করে মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম বলেন, “আজকে ব্যথিত হৃদয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে, তা আমাদের প্রত্যাশা ছিলো না।“

“সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ঘটনা আপনারা সবাই জানেন। হাজার বছর ধরে হিন্দু-মুসলিমরা এই ভূখণ্ডে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। একই রাস্তায়, একই মহল্লায় মসজিদ আর মন্দির বছরের পর বছর অবস্থান করছে। মানুষ যার যার ধর্ম পালন করছে। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো বিবাদ হলেও এই বছরের মতো ব্যাপক বিবাদ স্মরণকালে ঘটে নাই। কুমিল্লার একটি মন্দিরে পবিত্র কুরআন পাওয়াকে কেন্দ্র করে এবং ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর স্ট্যাটাসকে ইস্যু করে দেশের বিভিন্ন জেলায় যে সব অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে, আমরা এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দ্রুত বিচার চাই।

সাম্প্রতিক ঘটনায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-

১) এ ধরণের ঘটনা বাংলাদেশের সাধারণ চরিত্র না। বাঙ্গালীর হাজার বছরের ইতিহাস এবং মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা এ ধরণের ঘটনাকে সমর্থন করে না। এটা ইতিহাস বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা।

২) ঘটনার সূত্রপাত থেকে পরবর্তী প্রত্যেকটি ঘটনায় প্রশাসনের ব্যর্থতার ছাপ অতি স্পষ্ট। ৫০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে এ ধরণের ব্যর্থতা কল্পনাতীত। আমরা মনে করি, জন প্রশাসনে অতিমাত্রায় রাজনীতি প্রবেশের কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের প্রশাসন ব্যবস্থায় এক ধরণের অদক্ষতা তৈরি হয়েছে। যার খেসারত এসব ঘটনা।

৩) কুমিল্লার ঘটনার পরে জনরোষ তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সেই রোষে মানুষ বিক্ষোভ করবে তাও স্বাভাবিক। বেসামরিক বাহিনীগুলোকে এই ধরণের গণবিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত করার কথা। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছি, ৫০ বছরের স্বাধীন একটি দেশের বেসামরিক বাহিনী গণবিক্ষোভ দমনে গুলি করার মতো চরম সিদ্ধান্ত সহজেই নিয়ে নিচ্ছে। যার প্রতিফলন নিকট অতিতে ভোলায়, হাটহাজরীতে ও বি-বাড়িয়ায় দেখা গেছে। চাঁদপুরেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী একই রকমভাবে চরমপন্থা অবলম্বন করে বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে অন্তত পাঁচজনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর অল্পতেই এমন চরমপন্থা গ্রহণ করার প্রবণতা জন স্বাধীনতা, নাগরিক বোধ ও সভ্যতার জন্য ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে।

৪) কুমিল্লার ঘটনা নিয়ে প্রতিবেশী দেশের একশ্রেণীর মিডিয়া, সরকারী দলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সুশীল সমাজ যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সব ধরণের নীতি-নৈতিকতা ছাড়িয়ে গেছে। তাদের এই ধরণের আগবাড়ানো প্রতিক্রিয়ালশীলতায় এই ঘটনার অন্তরালে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নোংরা কৌশলের আভাস পাওয়া যায়।

৫) কুমিল্লার ঘটনার পরে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মিডিয়া, রাজনৈতিক সংগঠন ও সুশীল সমাজ যেভাবে ঘটনাকে কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, তা হতাশাজনক। দেশের ইতিহাস, বাঙ্গালীর চরিত্র ও ধর্মপ্রবণতা নিয়ে তাদের এমনতর ভুল ব্যাখ্যা হয়তো মূর্খতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।“

পীর সাহেব বলেন, “কুমিল্লার ঘটনার যে ব্যাপ্তি তা নজীরবিহিন। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায়শই কুচক্রিমহল সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে অবমাননা করে এক ধরণের উত্তেজনা তৈরি করে ঘোলা পানিতে স্বার্থ হাসিল করতে চায়। আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, কুচক্রী মহলের এমন সুযোগ দেশের ক্ষমতাসীনরাই তৈরি করে দিয়েছে। কারণ-

১) এই ধরণের ঘটনার কখনোই সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হয় না। প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অনেক কথা হয়, আশ্বাসবাণী শোনানো হয় কিন্তু বিচার হয় না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই অপশক্তিগুলোকে বারংবার ধর্ম অবমাননা করে উত্তেজনা তৈরির কৌশল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে।

২) বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননা করার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন আইন নাই। ফলে যে ধর্মের অবমাননা করা হয় সেই ধর্মের অনুসারীরা এক ধরণের অসহায় বোধ করে। সেই অসহায় বোধ থেকেই তারা তৎক্ষণাৎ বিক্ষোভ দেখানো এবং ক্ষেত্র বিশেষে সহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শনে উৎসাহিত হয়।

৩) ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা ও মন্ত্রীরা প্রায় নিয়মিত বিরতিতে ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে থাকেন। সাম্প্রতিক একজন অপরিণামদর্শী প্রতিমন্ত্রীর বালখিল্যতা জাতি দেখেছে। অপরিপক্ক সেই প্রতিমন্ত্রী যেভাবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে মন্তব্য করেছেন, তাতে জন-ক্ষোভ আরো বেড়েছে।

৪) দেশে যখন একদলীয় শাসন চলে, সরকার যখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে কোণঠাসা করে রাখে তখন অনিয়ন্ত্রিত বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়া একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। কুমিল্লা ও দেশব্যাপী তারই বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে।

৫) রাষ্ট্রের সরকার যখন স্বৈরাচারী ও শক্তি নির্ভর হয় তখন যেকোনো সামাজিক সমস্যার সমাধানে জনতার মাঝেও শক্তি নির্ভর পন্থার প্রাবল্য দেখা দেয়। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও তাই দেখা গেছে।“

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে সরকারের দায় ব্যাখ্যা করার পর ইসলামি আন্দোলনের আমীর বলেন, “এই বাস্তবতায় আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব করতে চাই-

১) কুমিল্লার ঘটনা ও তৎপরবর্তী ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি করতে হবে। এখানে কুমিল্লায় কোরআন অবমাননা, বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও মূর্তি ভাঙ্গা, রংপুরে আগুন দেয়া এবং চাঁদপুরে বিক্ষোভে গুলি করে হত্যা করার বিষয়টি পুঙ্খানু-পুঙ্খানু তদন্ত করতে হবে  এবং সেই কমিটির তদন্ত রিপোর্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জনসন্মুখে প্রকাশ করে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

২) ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন করতে হবে। সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। তাহলে কোন ধরণের ধর্ম অবমাননার ঘটনা ঘটলে জনতা আর সহিংস হয়ে উঠবে না।

৩) রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদের অতি বাচাল প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। মানুষের আবেগ-অনুভূতির জায়গায় আঘাত করে মন্তব্য করার প্রবণতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তারই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে অতি বাচাল তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রীসভা থেকে বহিষ্কার করতে হবে।

৪) দেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরাতে বিরোধী দলগুলোর ওপরে দমন-পীড়ন বন্ধ করতে হবে। আটক রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

৫) শাসন ব্যবস্থায় জনতার মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে এবং সহনশীল, বহুদলীয়, মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।

৬) বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করে এবং তাদের নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে বাহিনীগুলোকে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।

৭) গণবিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে গুলি করার মতো চরমপন্থা অবলম্বন করার প্রবণতা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।

৮) ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও সংখ্যালঘুদের ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ী সরকারীভাবে নির্মাণ করে দিতে হবে এবং চাঁদপুরে পুলিশের গুলিতে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবারসহ ক্ষতিগ্রস্ত সকল ব্যক্তি ও পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৯) দেশের একশ্রেণীর মিডিয়া, রাজনৈতিক সংগঠন ও তথাকথিত সুশীল সমাজ এই ধরণের ঘটনায় যেভাবে ধর্মকে কেন্দ্র করে একচোখা বয়ান দাড় করায়, তা বন্ধ করতে হবে। বাঙ্গালী জাতির ইতিহাস ও মনস্তত্ত্ব বিরোধী তাদের এই ধরণের বয়ান নির্মাণের পেছনে কোন দুরভিসন্ধি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।

১০) প্রতিবেশী দেশকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলাতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দিতে হবে।“

সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, “ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি জন সম্পৃক্ত শান্তিকামী সংগঠন। আমরা আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর সমাধান করতে চাই। পেশি শক্তি নির্ভর হঠকারি রাজনীতি আমরা করি না। আমরা জনগণের মতামতের ভিত্তিতে একটি সুখি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করতে চাই।

সেই অনুভূতি থেকেই চলতি বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হলো। আমরা আশা করবো, দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন। যদি তারা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন এবং দেশের পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপের দিকে যেতেই থাকে, তাহলে জন মানুষের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল সংগঠন হিসেবে ইসলামী আন্দোলন চুপ করে বসে থাকবে না ইনশাআল্লাহ।“

সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিষয়টি প্রাধান্য পেলেও মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ইসি সার্চ কমিটি ও ইসলামি আন্দোলনের নেতাকর্মীদের হয়রানি প্রসঙ্গে বিভিন্ন মন্তব্য ও দাবিদাওয়া পেশ করেছেন।

ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী ও মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ সহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com