পাথেয় রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় আলোচিত আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা রুহুল আমিনসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনকে গতকাল বুধবার রাতে সদর উপজেলার উত্তর চরওয়াপদা গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে আজ বৃহস্পতিবার সকালে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন সুবর্ণচরের চরজব্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন।
ওসি আরো জানান, একই রাতে সেনবাগ উপজেলার খাজুরিয়া গ্রাম থেকে আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর নাম বেচু মিয়া। এ নিয়ে এ ঘটনায় মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ধর্ষণের শিকার ওই চল্লিশোর্ধ নারী অভিযোগ করে আসছেন, ভোটের সময় নৌকার সমর্থকদের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এরপর রাতে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনের ‘সাঙ্গপাঙ্গরা’ বাড়িতে গিয়ে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে।
এরপরও চরজব্বার থানা পুলিশ মামলার এজাহার থেকে রুহুল আমিনের নাম বাদ দিয়েছে বলে বুধবার রাতে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুকের কাছে অভিযোগ করেছিলেন ওই নারী।
ডিআইজি গোলাম ফারুক ধর্ষণের ঘটনায় রুহুল আমিনের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাওয়ার পর গভীর রাতে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
জেলার পুলিশ সুপার মো. ইলিয়াছ শরীফ বলেন, রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয় জেলা সদরের একটি হাঁস-মুরগীর খামার থেকে। আর সেনবাগের একটি ইটভাটা থেকে মামলার আসামি বেচুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ নিয়ে মোট পাঁচজনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হল।
সুবর্ণচরের আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন চর জুবলী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য। আর বেচু (২৫) মধ্যম বাগ্যা গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে। এ মামলার এজাহারে বেচুর নাম রয়েছে পাঁচ নম্বরে।
এর আগে বুধবার কুমিল্লার বরুরা উপজেলার মহেষপুরের একটি ইটভাটা থেকে মামলার ১ নম্বর আসামি সোহেল, মঙ্গলবার রাতে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলা থেকে ৩ নম্বর আসামী স্বপনকে (৩৫) গ্রেপ্তার হয়। তার আগে সোমবার গ্রেপ্তার করা হয় মামলার ৬ নম্বর আসামি বাসুকে ।
ভোটের পর রোববার রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মধ্যবাগ্যা গ্রামের ওই নারী (৪০) নিজের বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এ ঘটনার সঙ্গে দলীয় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
মামলার আসামিরা হলো মো. সোহেল (৩৫), হানিফ (৩০), স্বপন (৩৫), চৌধুরী (২৫), বেচু (২৫), বাসু ওরফে কুড়াইল্যা বাসু (৪০), আবুল (৪০), মোশাররফ (৩৫) ও সালাউদ্দিন (৩৫)। এরা সবাই সুবর্ণচরের মধ্যবাইগ্গা গ্রামের বাসিন্দা।
মামলার বাদী উল্লেখ করেন, গত ৩০ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণ শেষে সরকারি দলের সমর্থক মোশারফ, সালাউদ্দিন ও সোহেলসহ ১০-১২ জন তাঁর বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ সময় আসামিরা তাঁকে ও তাঁর মেয়েসহ বাড়ির অন্যদের পিটিয়ে আহত করে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে। পরে তারা তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণ করে এবং পিটিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে। পরের দিন সকালে এলাকাবাসী এসে তাঁদের উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওই নারী।
মামলার এজাহারে মোট নয়জনকে আসামি করা হলেও সেখানে রুহুল আমিনের নাম না থাকায় বুধবার রাতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুকের কাছে হতাশা প্রকাশ করেন ওই নারী। তিনি ও তার স্বামী এখন নোয়াখালী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের দেখতে বুধবার হাসপাতালে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গেও কথা বলেন ডিআইজি গোলাম ফারুক। ডিআইজি পরে সংবাদিকদের বিষয়টি ‘রাজনীতির বাইরে রেখে’ সুষ্ঠু ও যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দেন। পুলিশের এ প্রতিনিধি দলটি ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করে।
ভুক্তভোগী ওই নারী তাকে বলেন, ‘রুহুল আমিনের সাঙ্গপাঙ্গরাই’ তার ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে। “রুহুল আমিন এলাকায় অনেক অপকর্ম করে আসছে। তার অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ। কিন্তু মামলার এজাহার থেকে পুলিশ রুহুল আমিনের নাম বাদ দিয়েছে।” ডিআইজি এ সময় তাকে আশ্বস্ত করেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে সুবর্ণচরে নারীকে গণধর্ষণের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ ঘটনা তদ্ন্ত করছি। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা এ ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত কেউ পার পাবে না।’


