৭ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২২শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১০ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

মওদুদীবাদীরা এত আশকারা পেয়েছে কোথায়?

ছবি: প্রতীকী

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

আমাদের কিছু ভুলত্রুটি আছে। আমরা নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুঠারাঘাত করেছি। মওদুদীবাদী—জামায়াতীদের এমন আশকারা দেওয়া হয়েছে, যার কারণে ওরা আমাদের ছারেতাজ মুরুব্বী, আমাদের আকাবির-আছলাফদের বিরুদ্ধে এখন কলম ধরছে। অথচ এই মওদুদীবাদ গোমরাহ, পথভ্রষ্ট, প্রত্যাখ্যাত। এই বাতিল ফেরকা কীভাবে দেওবন্দী আলেমদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে?

১৯৯৬/৯৭ সালের পর থেকে আমাদের কিছু ব্যক্তিবর্গ এই গোমরাহ মওদুদীবাদী—জামায়াতীদের সাথে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলেন। ক্ষমতায়ন ও ক্ষমতার মোহ তাদেরকে কাবু করে ফেলে। এক জোট হয়ে একে-অপরের জন্য জনতার দ্বারে দ্বারে ভোট চেয়ে ‘হক’ আর ‘বাতিল’ তারা একাকার করে ফেলেন।

যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এর দুশমন, যারা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের শানে বেয়াদবি করেছে, তাদের সাথে রাজনৈতিক সখ্য গড়ে তোলা বড্ড বেমানান ছিল। অথচ এর আগে কখনো দেওবন্দী ওলামায়ে কেরাম কোনো ফেরাকে বাতেলার সাথে প্রীতি গড়ে তোলেননি। সেই রাজনৈতিক ঐক্য বিনাশ করে দেয় আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে। হারিয়ে ফেলি আমরা আমাদের স্বকীয়তা।

কত বড় ক্ষতি হয়েছিল সেই রাজনৈতিক সমাঝোতায় —সেটা কি ভেবে দেখেছি কখনো?  মওদুদীবাদী-জামায়াতীদের সাথে রাজনৈতিক সমাঝোতায় যে ক্ষতি হয়েছে এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ-

১. মওদুদীবাদী—জামায়াতীরা এই সুযোগে দেওবন্দী আলেমদের কাতারে অনুপ্রবেশ ঘটায়। মওদুদী আর দেওবন্দী একাকার হয়ে পড়ে। অথচ দেওবন্দীরাই এই মওদুদীবাদীদের বিরুদ্ধে ফতওয়া দিয়েছিলেন।

২. দেওবন্দী মাদরাসাতে তাদের আনাগোনা শুরু হয়। মওদুদীবাদী—জামায়াতীরা এর আগে কখনো স্ব-পরিচয়ে দেওবন্দী মাদরাসায় প্রবেশ করতে পারেনি। কিন্তু রাজনৈতিক ঐক্যের কারণে অবাধে কওমী মাদরাসাতে আনাগোনা করতে থাকে।

৩. এক সাথে মিছিল-মিটিং, এক সঙ্গে ওঠাবসা। গলায় গলায় চলা। আর সেই সুযোগে ওরা অপপ্রচার চালায়, “জামায়াতী আর দেওবন্দী এখন সব এক, আর কোন ফতওয়াবাজি হবেনা।” এধরনের নানা কুটকৌশল চালাতে থাকে।  যার কারণে সরলপ্রাণ বহু আলেম এবং সাধারণ মানুষ তাদের দলভুক্ত হয়ে যায়।

৪. রাজনৈতিক ঐক্যের কারণে দেশের বহু স্থানে মওদুদীর ভুলভ্রান্তি, মওদুদীবাদীদের অসারতা সম্পর্কে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। মুসলিম জনসাধারণকে ভ্রান্ততা থেকে সতর্ক করার যে মহান গুরুদায়িত্ব এই উম্মতের ওলামায়ে কেরামের কাঁধে ছিল, এক দলের আলেমের সমঝোতায় এই মহান দায়িত্ব পালন থেকে আলেমরা সরে আসেন।

৫. যে সকল আলেমগণ এক সময় মওদুদীবাদীদের অসারতা এবং মওদুদীর ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে দরাজকন্ঠে মানুষকে সতর্ক করতো, সামান্য রাজনৈতিক সমাঝোতায় সব যেন তারা ভুলে গেল। তারা মুখে কুলুপ এঁটে দিলেন।

৬. দেশের বিভিন্ন স্থানে মওদুদীবাদীদের স্বরুপ উদঘাটন মাহফিল হত। সেগুলো বন্ধ হয়ে গেল।

৭. বিভিন্ন মাদরাসায় মওদুদী মতবাদের উপর বিস্তর গবেষণা, তাদের ভুলভ্রান্তি  সম্পর্কে জানা এবং ব্যাপক পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

৮. মওদুদী আর দেওবন্দী সব যেন একাকার। কেউ আর তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেনা। একদম চুপ হয়ে গেলেন দেওবন্দী আলেমগণ। মনে হতে লাগল, মওদুদী সাহেব কোন ভুল করেনি। নবীন ওলামা এবং ত্বলাবাগণ সেই রকম মেজাজে-ভুল চিন্তায় পয়দা হতে লাগলেন।

৯. মওদুদীর বই, ভ্রান্ত ও মনগড়া তাফসীর অবাধে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রবেশ করতে লাগল।

অথচ এই রাজনৈতিক ঐক্যের পূর্বে আমরা কীভাবে মানুষ হয়েছি সেটা কী মনে আছে? মওদুদী মতবাদের উপরে ব্যাপক গবেষণা করতে হতো প্রত্যেকটি কওমী মাদরাসায়। এদেশে এমন কোনো মাদরাসা ছিলনা, যেখানে মওদুদী সাহেবের ভুলভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতো না। বড় বড় মাদরাসার আলেমগণ তো সেসব ব্যাপারে বিস্তর আলোচনা করেছেন। এমনকি ছোট ছোট হেফজ বিভাগের উস্তাদগণও সেসব বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। তাছাড়া দেওবন্দী আলেমদের মধ্যে যারা লেখালেখি করেন, তারাও বিভিন্ন লিখনীতে মওদুদীবাদের  অসারতা এবং মওদুদীর ভুলভ্রান্তি তুলে ধরেছেন। বহু ওলামায়ে কেরাম প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং পুস্তক রচনা করেছেন। বক্তৃতার মাঝে মওদুদীর গোমরাহী তুলে ধরতেন। কিন্তু যখনই তাদের সাথে রাজনৈতিক সমাঝোতা হয়েছে, তখন সবকিছু বন্ধ হয়ে গেল।

ছাত্রজীবনে আমরা ‘মওদুদীর স্বরূপ উদঘাটন’ মাহফিলে শরীক হয়েছি। বহু জায়গায় সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে গিয়েছি। অনেক দালিলিক বক্তব্য শোনার তাওফিক হয়েছে। এমনকি এসব বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করার সুযোগও মিলেছে। কিন্তু বর্তমানে এর কিছুই যেন আমাদের দেওবন্দী মাদ্রাসাতে নেই। রাজনৈতিক সখ্য এবং প্রীতি আমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে। কিছু ফায়দা হাসিল করতে গিয়ে বড় সর্বনাশ হয়েছে।

দেওবন্দী মাদরাসার ছাত্ররা মোটাদাগে এখনও মওদুদী মতবাদকে গোমরাহ মনে করে। তবে বর্তমানের জ্ঞানটা অন্ধের মত। কিন্তু আগেকার ছাত্ররা পড়াশুনার মাধ্যমে এবং দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে মওদুদীকে গোমরাহ মনে করেছে। মওদুদীবাদী-জামায়াতীদেরকে পথভ্রষ্ট গোষ্ঠী হিসাবে চিনেছে।

রাজনৈতিক সমাঝোতায় মওদুদীবাদী-জামায়াতীদের বড় পাওনা ছিল এটা। দেওবন্দী আলেমদের মুখ বন্ধ করা। ভবিষ্যতে তারা যেন মওদুদীর ভুলভ্রান্তি নিয়ে কথা বলতে না পারে। আর এতে তারা সফল ছিল। দক্ষিণ বঙ্গের প্রসিদ্ধ একজন দেওবন্দী আলেম, যিনি একসময় এমপি ছিলেন, মওদুদীবাদীদের সাথে ঐক্য গড়ার আগে তাঁর এলাকাতে মওদুদীর গোমরাহ মতবাদের বিরুদ্ধে বহু সমাবেশ করেছিলেন। এমনকি ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়েও তাঁর সেসব প্রোগ্রাম হতো। কিন্তু যখনই ওদের সাথে মিলন ঘটেছে। এরপর আর তাদের অসারতা নিয়ে কথা বলেননি।

রাজনৈতিক কারণে দেওবন্দী আলেমগণ মওদুদী সাহেবের বিরোধীতা করেননি, বরং মওদুদী সাহেবের বিরোধীতা করা হয়েছে তার ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাসের কারনে।

আসলে মওদুদীবাদীদের সাথে কোন সমাঝোতা হয় না। এটা সম্ভবও না। কেননা ‘হক’ ও ‘বাতিল’ এক জায়গায় মিলিত হতে পারেনা। মওদুদী সাহেব ছিলেন একজন গবেষক-লেখক। তিনি কোন আলেম ছিলেন না। বলা যেতে পারে, তিনি ছিলেন একজন স্বঘোষিত মাওলানা। প্যাশ্চাত্য বস্তুবাদের ব্যাপক হামলা থেকে ইসলামকে হেফাজত করার নামে তার ক্ষুরধার লিখনী বেপরোয়া ভাবে চলতে থাকে। তার সেই লিখনীগুলো এমন বেপরোয়া ছিল, সেটা ইসলামের মৌল প্রাসাদের উপরে আক্রমণ করে বসে। কোরআন—হাদীস—ইজমা—কিয়াস  সকল বিষয়ে  তার কলম লাগামহীন ভাবে চলেছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, হযরত সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এবং আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের শানে তার বেয়াদবি ছিল সর্বোচ্চ শিখরে।  যেটা কোনো মুমিন-মুসলমান বরদাশত করতে পারেনা।

এসব বিষয় প্রকাশ পাওয়ার পর মওদুদী সাহেবকে কোন আলেম সমর্থন করেননি। তার আকিদা-বিশ্বাস কেউ গ্রহণ করেনি। বরং তার ভুলভ্রান্তিগুলো জাতির সামনে তুল ধরেছে। জাতিকে মওদুদীর গোমরাহী থেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। এখানে স্মরণ রাখা দরকার, কোন হিংসা বিদ্বেষ নয়, তার প্রতি কোন আলেমের ব্যক্তিগত দুশমনি ছিলনা। বরং এক সময় তো দেওবন্দী বহু আলেম তার সাথে ছিলেন। কিন্তু মওদুদী সাহেবের ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাসের কারণে সেসব আলেমগণ সবাই মুখ ফিরিয়ে নেন। শুধু তাই নয়, তাঁর গোমরাহীর ব্যাপারে এরাই কিতাব রচনা করে গেছেন।

মওদুদী সাহেব ১৯৪৭ সনে দেশ বিভাগের আগে দ্বিজাতিতত্তে বিশ্বাসী ছিলেন। শুধু তিনি একা নন, আমাদের দেওবন্দী হালকার বহু মুরুব্বী দ্বিজাতিতত্তের প্রবক্তা হয়ে কাজ করেছেন। যেমন মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.), মাওলানা শিব্বির আহমাদ উসমানী (রহ.) তাঁরা পুরোপুরি দ্বিজাতিতত্তের কান্ডারী ছিলেন। রাজনৈতিক বিষয়ে একই মতের অধিকারী হলেও এঁরাই কিন্তু মওদুদীর গোমরাহী সম্পর্কে কিতাব লিখে গেছেন। জনসাধারণকে মওদুদী সম্পর্কে সতর্ক করেছে। তাহলে বোঝা যায়, রাজনৈতিক কারণে দেওবন্দী আলেমগণ মওদুদী সাহেবের বিরোধীতা করেননি, বরং মওদুদী সাহেবের বিরোধীতা করা হয়েছে তার ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাসের কারনে।

এজন্য মওদুদী মতবাদ প্রত্যাখ্যাত। ওলামায়ে হকের ঐক্যমতেই মওদুদী সাহেব এবং তাঁর কলাকৌশল সবকিছু গোমরাহ। সুতরাং এই ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসীদের সাথে সমাঝোতা বা প্রীতি হতে পারেনা। একদল আলেম সাময়িক সমঝোতা করেছেন, সেটার কারণে এই ভ্রান্ত মতবাদ দুধে ধোয়া হয়নি। বরং ওরা গোমারাহ তো গোমরাহই।

ভ্রান্ত মওদুদী মতবাদ থেকে আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে আমাদেরকে আগের মতো সোচ্চার হতে হবে। যেমন সোচ্চার ছিলেন আল্লামা কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ (রহ.), আল্লামা শামসুদ্দিন কাসেমী (রহ.), মুফতি নুরুল্লাহ  (রহ.)। এসকল মনীষীদের মত সৎ সাহসী হতে হবে। মওদুদীবাদী-জামায়াতীদের ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আগের মতো প্রতিটি দেওবন্দী মাদরাসাতে মওদুদী মতবাদের উপরে  বিস্তর গবেষনা করা প্রয়োজন। যাতে নবীন প্রজন্ম সতর্ক হতে পারে।

ওদেরকে আর আশকারা দেওয়া যাবেনা। কোনো ধরনের ঐক্য আর নয়। সামান্য রাজনৈতিক সমাঝোতায় যে ক্ষতি হয়েছে আমাদের, সেটা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সেই দুর্বলতায় এখন আমাদের মুরুব্বীদের বিরুদ্ধে কলম ধরছে এরা। এজন্য সজাগ হওয়া চাই। আর যেন অমন ঘটনা না ঘটে। আল্লাহতায়ালা আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।

  • লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com