১৬ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৩রা শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরি

মননের মধু ও একটি সুস্থির দৈব আলাপ

মননের মধু ও একটি সুস্থির দৈব আলাপ

আদিল মাহমুদ ❑ একটা ঘোর অথবা চরম প্রেম উপলব্ধির মধ্য দিয়ে মোস্তফা মহসীনের কাব্যগ্রন্থ বই ‘মননের মধু’ পড়ে শেষ করলাম। যদি বলি দীর্ঘকাল, এক যুগেরও অধিক সময় সমস্ত আয়োজন, স্তুতি, আলোচনা ও কবিখ্যাতিকে মিথ্যে করে তিনি কবিতাকে যাপন করে গেছেন শুধু, তাহলে কোনোভাবেই মিথ্যে হবে না বোধকরি। এই কাব্যগ্রন্থে জলের মতো সহজ ও বিপুল সুন্দরের অনুভবে তিনি গড়ে তোলেছেন কবিতার ইমারত। শুরুতে চলুন মোস্তফা মহসীনের ছোট একটি কবিতা পড়ি—

‘তোমার চিত্তের কাছে আমার চিত্তের
হৃদবিলাসী ফেরা
মননের নাগরদোলাতে চড়ে উড়ে
রাজাদের রাজা!
গল্প যত ভরহীন
বাক্য তত সুপ্ত সম্ভাবনা।
প্রণয়ের দীর্ঘ দিঘিতেই
জল হলো আদুরে ভঙ্গিমা
গতকাল আমাদের যুগল জীবন এসেছিল—
যাদুবাস্তবতা।’
[ছোঁয়া/ ২০ পৃষ্টা]

মোস্তফা মহসীন তাঁর কাব্যগ্রন্থে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, দ্রোহ-প্রেম ও সমাজচিত্র কথা বলেছেন অবলীলায়। কবিতার মাধ্যমে তিনি কখনো আমাকে আচ্ছন্ন করছেন নিদারুণ মানবিকতায়, কখনো কাতর করেছেন দ্রোহে ও দেশাত্ববোধে, আবার কখনো প্রেমের মায়ায়। তাঁর প্রেমের কবিতা মানেই মনের মধ্যে উথাল-পাতাল ঢেউ, আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, কল্পনার ফানুস উড়িয়ে প্রেয়সীর ঠোঁটে চুমু খাওয়া কিংবা মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকা কয়েক ঘন্টা। কবির এক একটি প্রেমের কবিতা এক একটি আকাঙ্ক্ষার নাম, যে আকাঙ্ক্ষা গোগ্রাসে গিলে খায় একের পর এক অমীয় কবিতার পাতা। কবির ভাবনার জগতে আপনাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু কবিতার কবিতাংশ উল্লেখ করছি—

১. ভালোবাসার নারীরাও আঘাত করেছে আঁতলে ভেবে/ প্রেমহীনা অন্য সেই মেয়ে/ আমাকে নামায় গলাজলে! [দণ্ডিত পুরুষ]
২. জ্যোতির্ময় লীলাময়, প্রভু ও পরম/ বলি; হাকালুকি হাওর কি তোমার-আমার/ ইচ্ছাজলে সুগঠিত-/ শীতল আশ্রম? [হাওরের দাগ]
৩. তবু অনুমান বলছে, আসন্ন শীতে/ বিনামূল্যে পেয়ে যেতে পারি/ অরুণ+অবনী? [রহস্যতালুক]
৪. নীলিমার স্তন থেকে/ সুখ হাতড়িয়ে চোখ ফেরাতে না ফেরাতেই ডাকে যাপিত জীবন/ ঝিমমারা নিরঞ্জন! [উড়ুউড়ুচর্চা-দুই]
৫. আড়ষ্ট সময়ে নেই কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা;/ এক পা মাটি ছুঁতে না ছুঁতেই উপরে ওঠে অন্য পা। [ত্রাতা]
৬. জ্ঞান ও বোধের সড়কে আমিও তোমাকে ছুঁই; শুনি ভোরের স্বপ্ন ভেঙেচুরে প্রার্থনায় বসা দু’পারের মানুষের মৌনবাণী : ভাষার পবিত্র শক্তি একদিন বদলে দেবে সীমান্তের জ্যামিতি। [প্রিয় কলকাতা]
৭. ও ধুলোর ফুৎকার; তুমি/ বিশ্বকে জানিয়ে দাও দ্বিগবিজয়ের ভাষা! [ধুলোসংহিতা]
৮. ওরে জলবাতাসের ভবঘুরে/ মাথানত হয় তবে হোক; আত্মস্থ ঝর্ণার সমাধিতে/ বলো- প্রেম ও কামের জন্য আর অযুত বছর বিকাবো না! [চোরাস্রোতে যাপন]
৯. উড়ো আসা অন্ধ সময়ের বিজ্ঞাপন/ আকাশও ধুয়োলীন/ বলো, কি করে দেখবো/ তোমারই শ্রীমুখ মনীষা? [শুভ অমাবস্যা]
১০. এ বর্ষায় তুমি মজেছ আকাশপটে/ তাকাতে পারি না যে পাপড়ি মেলে/ চোখের দ্যুতি হঠাৎ কমে যায়! [মেঘজাল]

৪৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে আছে ৪০টির বেশি কবিতা। কবিতাগুলোতে ভাববোধের চরম শিখরে থেকেই অনুপম সব পঙক্তির আয়োজন করেছেন মোস্তফা মহসীন। প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোম্যান্টিক সৌন্দর্য, সবকিছু নিয়েই তিনি কবিতা লিখেছেন। তার রচনায় এমন কিছু পঙক্তি আছে, এমন ধরনের উচ্চারণ আছে, যা আমরা সচরাচর একজন কৃতী কবির সার্থক কবিতায় প্রযুক্ত হতে দেখি।

‘মননের মধু’ পড়ে মনে হয়েছে ‘মোস্তফা মহসীন’ তাঁর কবিতা মুন্সিয়ানা ভাব দেখাতে অভ্যস্ত। রহস্যলোক, গভীরতর বোধ, প্রকাশবৈচিত্র্য ও শব্দের দারুণ ব্যঞ্জনায় তাঁর কবিতা যেকোন পাঠকের মন জয় করবে। সমৃদ্ধ চিত্রকল্প, ব্যতিক্রমী শব্দপ্রয়োগ, পরোক্ষভাষণ, অপ্রচল উপমা এবং কূটাভাসদীপ্তি আধুনিক কবিতার একেকটি বড় সম্পদ। এই বিষয়গুলো স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি তাঁর কবিতায়। কয়েকটি দৃষ্টান্ত—

ক. ধূসর থেক সরিয়ে এনেছি সাদা কাগজের সসীমতা। রোদের বিরুদ্ধে বৃষ্টির বিরুদ্ধে মাতোয়ারা মিছিলে এখন কেবলই অদ্বিতীয় সহযাত্রী কালোর ভেতরের সাদা সাদা পরাবাস্তবতার ফেনা। [অক্ষরে রাখি সমূহ সসীমতা]
খ. আপাতত তুমি রসকষহীন সফল; তবু বেলা শেলের বেলাতে, স্বচ্ছ হাতে কেন যে চাও আপনার মতো অবিকল? [গভীরে : অর্থের বিভঙ্গ]
গ. আকাশবিস্তৃত প্রশান্তিতে শরীরের জড়তা ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলে তুমি/ নিসর্গ কাঁপায় এফএম রেডিও তরঙ্গ থেকে আসা বার্নিশ টিলার গীত/ ধোঁয়া ধোঁয়া ভাবনাসমূহ চক্রাকারে বয়ে নিয়ে যায় বহুগামী মিথ। [বালিশিরা]
ঘ. সুন্দরীতমার ভিড়ে কোট গাউনের স্বপ্নবাজি/ সূর্য চুনমনে দিন/ সাথে লুকোচরি/ আমাকে টেনেই নিলো/ সিএমএস কোর্টের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। [মাধ্যাকর্ষণ শক্তি]
ঙ. ঢাকা!/ এ পথের মায়া ঢালে ফোঁটা ফোঁটা করুণার ধারা/ ব্যথার পাহাড়ে তুমিও কি/ রোদ বৃষ্টির ধার না ধেরেই, ছোটা পূর্ব দিগন্তের পাগলা ঘোড়া? [মনপাহাড়ের প্রজাপতি]

মোটকথা! কবি মোস্তফা মহসীনের ভিন্ন আঙ্গিকের বিচিত্র ভাবনার ‘মননের মধু’ কাব্যগ্রন্থটি আমার অসাধারণ মনে হয়েছে। ভাষা প্রকাশে তাঁর সাহসিকতা, ভাবনার মৌলিকত্ব এই দশকে তাঁর অবস্থান মূল্যায়নে যথেষ্ট এগিয়ে নিয়ে যাবে এই বইটা। কবির শুদ্ধ স্বর কতটুকু শুদ্ধতা নিয়ে সামনে এগিয়ে যায় তা দেখার প্রতীক্ষায় রইলাম আমি। কবির জন্য পাঠক হিসেবে রইলো একরাশ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com