২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

মহাররম ও আশুরা সম্পর্কিত আয়াত এবং হাদিস

  • মুফতি মাহতাব উদ্দীন নোমান

ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। ইসলামী পরিভাষায় আরবি বর্ষপঞ্জি হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলে। কুরআন মজীদে ও হাদীস শরীফে মুহাররম ও আশুরা সম্পর্কে যা এসেছে তা হলো, এটা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ মাস। কুরআনের ভাষায় এটি ‘আরবাআতুন হুরুম’ অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম।

মহররমকে আমরা অনেকে সঠিকভাবে পালন করি, আবার অনেকে সঠিকভাবে করি না। আবার কোথাও কোথাও দেখা যায় অতিরঞ্জিতভাবে পালন করা হয়। এর কারণ হলো কোরআন ও হাদিসের জ্ঞান না থাকা। তাই মুহাররম ও আশুরা সম্পর্কিত পবিত্র কোরআন আয়াত ও হাদিস নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

​মহাররম

‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হইতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারটি; তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, ইহাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং ইহার মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করিও না।’ (সূরা তওবা – আয়াত 36)

বিদায় হজ্জের সময় মিনা প্রান্তরে প্রদত্ত খোতবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মানিত মাসগুলোকে চিহ্নিত করে বলেন: তিনটি মাস হলো ধারাবাহিক যিলকদ, যিলহজ ও মহররম, অপরটি হলো রজব। (বুখারী ৩১৯৭; মুসলিম, হাদিস ১৬৭৯)

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রমজানের পর আল্লাহর মাস মহাররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।’ (মুসলিম, হাদিস ১১৬৩)

​আশুরা

হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, কুরাইশরা জাহেলী যুগেও আশুরার রোজা রাখত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও রোজা রাখতেন। যখন তিনি মদিনায় হিজরত করলেন, তিনি নিজেও রোজা রাখছেন এবং সাহাবীগণকেও রোজা রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। অতঃপর যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন তিনি বললেন, যে চায় আশুরার রোযা রাখতে পারবে আর আর যে চায় রোজা নাও রাখতে পারবে। (বুখারি, হাদিস ২০০২; মুসলিম, হাদিস ১১২৫)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় যাওয়ার পরে ইহুদীদেরকে আশুরার রোজা রাখতে দেখলেন। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এই দিন কেন রোজা রাখো? তারা বললো, এটা মর্যাদাপূর্ণ দিন। এই দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা আ. ও তার জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা আ. এই দিনে রোজা রাখতেন, অতএব আমরা এই দিনে রোজা রাখি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের থেকে আমরাই বেশি মুসার নিকটবর্তী এবং তার অনুসরণের অধিক হকদার। এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (মুসলিম, হাদিস ১১৩০; বুখারি, হাদিস ৩৩৯৭)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমজান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য সময় তা দেখিনি।’ (বুখারি, হাদিস ২০০৬; মুসলিম, হাদিস ১১৩২)

রুবায়্যি বিনত মুয়াওবিয ইবনু আফরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশূরার দিন ভোরে এক ব্যক্তিকে মদিনার পার্শ্ববর্তী আনসারী সাহাবীদের জনপদে এ নির্দেশ দিয়ে পাঠালেন, সে যেন এ ঘোষণা করে দেয় যে, সিয়ামরত অবস্থায় যার ভোর হয়েছে, সে যেন তার সাওম পূর্ণ করে। আর যার ইফতার অবস্থায় ভোর হয়েছে, সে যেন তার দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার থেকে বিরত থাকে। এরপর আমরা এ দিন সাওম পালন করতাম এবং আমাদের ছোট ছোট সন্তানদেরকেও আল্লাহ চাহে তো সাওম পালনে অভ্যস্ত করে তুলতাম। আমরা তাদেরকে মসজিদে নিয়ে যেতাম এবং তাদের জন্য পশমের খেলনা বানিয়ে দিতাম। যখন তারা খাওয়ার জন্য কাঁদত, তখন আমরা তাদেরকে সে খেলনা প্রদান করতাম। এমনি করে ইফতারের সময় হয়ে যেত।

হযরত আবু কাতাদা আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোজার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ (মুসলিম, হাদিস ১১৬২)

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আশূরার দিন রোজা রাখেন এবং লোকদেরকে রোজা রাখার নির্দেশ দেন তখন সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইয়াহূদী এবং নাসারা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব। হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, আগামী বছর আসার পূর্বেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকাল হয়ে যায়। (মুসলিম, হাদিস ১৯১৬)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোজা রাখ। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস২১৫৫; তবে এই হাদীসের সনদের দুর্বলতা রয়েছে)

মোটকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলো হলো তওবা, ইস্তেগফার, নফল রোজা এবং অন্যান্য নেক আমল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: খতীব ও শিক্ষক

আরও পড়ুন: সন্তানের জন্মে পরিবারের দায়িত্বঃ ইসলামী দিকনির্দেশনা

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com