নিজস্ব প্রতিবেদক ● চট্টগ্রামের স্টেশন রোডে মোটেল সৈকতে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে সোমবার আলোচনাসভার আয়োজন করেছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সেখানে উপস্থিত পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা মাদক চোরাচালানের জন্য তাদের দায়ী করা হচ্ছে ভেবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আলোচনাসভায় জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. মুছা বলেন, পত্রিকায় দেখি কোটি কোটি ইয়াবা উদ্ধার হচ্ছে। সব কি সড়কপথে আসছে? নৌযান, রেলপথ, বিলাসবহুল গাড়িতেও আসছে। তাহলে সব দায় পরিবহন শ্রমিকের কেন? বড় বড় সিন্ডিকেটের নাম আমরা সবাই জানি। কিন্তু মৃত্যুভয়ে কেউ প্রকাশ করি না। দয়া করে আমাদের দায়ী করে অন্য কাউকে আড়াল করবেন না। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মো. রহুল আমীন।
সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিন। সভায় জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ফজলুর রহমান বলেন, বাসের বাম্পার, ইঞ্জিন, সিলিন্ডার পাইপ দিয়ে কৌশলে সড়কপথে ইয়াবা পাচার হচ্ছে। ট্রেনেও ইয়াবা পাচার হচ্ছে। এমনকি সুস্থ মানুষকে অসুস্থ বানিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ফেনসিডিল-ইয়াবা পাচার হচ্ছে। পরিবহন শ্রমিকদের অনেকেই এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। বক্তব্য দিতে গিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বিভাগীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের উপদেষ্টা মৃণাল চৌধুরী। তিনি বলেন, পরিবহন শ্রমিকরা ফুলের মত নিষ্পাপ নয়। আমাদের দোষ দুইটা। একটা হচ্ছে মাদক সেবন, আরেকটা মাদক পরিবহন। সেবনের পরিমাণ শ্রমিকরা অনেক কমিয়ে এনেছে। কিন্তু পরিবহনের দায় কি শুধু শ্রমিকের? প্রত্যেক পাড়া-মহল্লা, বাস স্ট্যান্ডে ১০-১২ জন করে তরুণ-যুবকদের গ্রুপ আছে যারা ইয়াবা-ফেনসিডিল বিক্রি করছে। তাদের উপরে একজন গডফাদার আছে। এর উপরে আছে রাজনৈতিক নেতার সিন্ডিকেট। কেবল পরিবহনকে দায়ী করলে হবে না। পরিবহন সেক্টর একটা দোযখ। আমরা এই দোযখের দারোয়ানগিরি করি। আগে জানতাম মাদরাসার ছাত্ররা জঙ্গি হচ্ছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছাত্ররাও জঙ্গি হচ্ছে। আগে বাস-ট্রাকের ড্রাইভাররা মদ খেত। এখন ধনী ঘরের শিক্ষিত মানুষের সন্তানরাও ইয়াবা খাচ্ছে। ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান বলেন, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধের জন্য শুধু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কেন ডাকলেন? সদিচ্ছা থাকলে যত ওসি আছে তাদের ডাকুন।
কোথায় মাদকের দোকান আছে, কারা মাদক বিক্রি- সেবন করে সব ওসিরা জানেন। তাদের যদি নির্দেশ দেওয়া হয় এক মিনিটে মাদক বন্ধ হয়ে যাবে। এসব কথা কেউ বলেন না। কারণ প্রশাসনের বিরুদ্ধে বললে ওসিদের হয়রানির শিকার হতে হবে। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের বিভাগীয় সভাপতি হাজী মো. রহুল আমিন বলেন, এখন কথা বলা যায় না। সব জায়গায় শুধু বলে আমি যুবলীগ আর ছাত্রলীগ। একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ বলেন, যাত্রীরা তো ভদ্রলোক। তাদের লাগেজ চেক করার ক্ষমতা আমার নেই। লাগেজের ভেতর যদি ইয়াবা থাকে, তাহলে আমাকে দায়ী করা হবে কেন? বক্তব্য রাখতে গিয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার এস এম মোস্তাইন হোসেন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম এমরান ভূঁইয়া বলেন, আপনাদের (পরিবহিন মালিক-শ্রমিক) আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি। আপনাদের আনা হয়েছে আমাদের সহযোগিতা করার জন্য। সড়কপথে যে মাদক পাচার হয় তার চেয়ে ৫০ গুণ বেশি পাচার হয় নৌপথে।
আপনাদের ২-১ জন হয়তো পাচারে জড়িত থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য সবাইকে আমরা দায়ী করছি না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (নিরোধ শাখা) কেএম তারিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ভুল বুঝবেন না। আমরা মসজিদের ইমাম, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা করি। তা-ই বলে তারা কি দোষী? আপনাদের সঙ্গে সভা করছি মানে আপনারা দোষী না। মাদকবিরোধী আন্দোলনে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পাশে থাকার আহ্বান জানান বিভাগীয় কমিশনার।


