মাদরাসায় বেদ-গীতা-রামায়ণ পড়ানোর প্রস্তাব

মাদরাসায় বেদ-গীতা-রামায়ণ পড়ানোর প্রস্তাব

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ভারতের মাদরাসাগুলোতে এবার শিক্ষার্থীদের বেদ, গীতা ও রামায়ণ পড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাধীন শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ওপেন স্কুলিং (এনআইওএস)।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, দেশটির জাতীয় ওপেন স্কুলিং সংস্থার পক্ষে নতুন এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০০ মাদরাসায় এগুলো পড়ানো শুরু করা হবে। পরবর্তীতে ৫০০ মাদরাসায় তা চালু করা হবে। ওপেন স্কুলিং সংস্থার নতুন প্রস্তাবে ১৫টি নতুন কোর্সের কথা বলা হয়েছে। ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে এই তালিকায় রাখা হতে পারে বেদ, যোগ, রামায়ণ ও মহাভারত। থাকছে সংস্কৃত ভাষাও। এরই সঙ্গে থাকবে কিছু ভোকেশনাল স্কিলও। পড়ানো হবে ভগবত গীতাও।

এনআইওএস সম্প্রতি ‘ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরা’ নামে ১৫টি কোর্স বা শিক্ষাক্রম তৈরি করেছে – যার আওতায় বেদ, ইয়োগা, রামায়ণ, ভাগবত গীতা, সংস্কৃত ভাষা, পাণিনির গাণিতিক সূত্র ইত্যাদি নানা বিষয় রয়েছে। সেই স্টাডি মেটেরিয়াল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে দেশের শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল বলেন, আমাদের বেদ-পুরাণ-উপনিষদ যে সংস্কৃতির শিক্ষা আমাদের দিয়েছে, তা অমূল্য। এই সুফলকে আমরা মাদরাসাগুলোতে, এমন কী দেশের বাইরেও ভারতীয়দের কাছে ছড়িয়ে দিতে চাই। ফলে এনআইওএসের এই পদক্ষেপকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।

কিন্তু এই পদক্ষেপ মাদ্রাদরাগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে শিক্ষাবিদরা অনেকেই রীতিমতো সন্দিহান। দিল্লিতে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক অমরিন্দর আনসারি বলছেন, প্রথমত মাদরাসাগুলো কিন্তু সংগঠিত শিক্ষা খাতের ভেতরে পড়ে না। সেখানে একটা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির দেশে এরকম কিছু চালু করতে গেলে সেটা কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হিসেবেই দেখা হবে। মাদরাসাগুলোর স্বশাসনেরই বা কী হবে? হ্যাঁ, বেদ-গীতা-রামায়ণের বদলে যদি ‘ভারতীয় ধর্ম’ বলে একটা বিষয় চালু করা হত, যেখানে দেশের সব ধর্মের শিক্ষাই থাকবে, সেটা হয়তো মেনে নেওয়া যায়। মাথায় রাখতে হবে, ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থ কিন্তু দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সর্বভারতীয় নেতা সুরেন্দ্র জৈন আবার সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তি দিচ্ছেন, গীতা-রামায়ণ-বেদকে আসলে শুধু হিন্দু ধর্মগ্রন্থ হিসেবে দেখাটাই ভুল। ড: জৈন বলছিলেন, এগুলোকে শুধু হিন্দুদের বলে চিহ্নিত করাটা দুর্ভাগ্যজনক – কারণ এই গ্রন্থগুলো বিশ্বজনীন মানবতার কথা বলে। আমরা মনে করি, এই গ্রন্থগুলো যে মূল্যবোধের শিক্ষা দেয় তা পড়ানোটা ভারতে বসবাসকারী প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

কিন্তু ভারতের মাদরাসাগুলো কি তার ছাত্রদের এই সব ধর্মগ্রন্থ পড়াতে রাজি? পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় নাজবুল হক হাই মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মোহম্মদ আলাউদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, এই সব গ্রন্থে আপত্তিকর কিছু নেই। তিনি বলেন, আমার কথা হলো হিন্দু ধর্মে তো খারাপ কিছু নেই। কেউ যদি সেরকম বলে – তাহলে সেটা তার ভুল ধারণা। অনেকে হয়তো ধর্মের ব্যাখ্যাকে খারাপভাবে ব্যবহার করছে, কিন্তু ধর্মগ্রন্থে খারাপ কিছু আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না।

কিন্তু সেই সঙ্গেই তিনি যোগ করছেন, তারা মাদরাসায় বাধ্যতামূলকভাবে কোনো ধর্মশিক্ষা দেন না – ফলে জোর করে কোনো ধর্মীয় শিক্ষা চাপিয়ে দিতে গিলে ফল ভালো না-ও হতে পারে। মোহম্মদ আলাউদ্দিনের কথায়, মাদরাসায় কিন্তু আমরা শাস্ত্রশিক্ষা দিই না, পড়াশুনো করাই। যেমন আরবি পড়ানো হয় একটা ভাষা হিসেবে, এখানে ধর্মের কোনো ব্যাপার নেই। এমন কী কেউ চাইলে আরবি নিতেও পারে, কেউ আবার না-ও নিতে পারে। এটা ছাত্রদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেই জায়গায় পাঠক্রমে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে এলে সমস্যা হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে। বলা আসলে খুব কঠিন, আর এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকাই ভালো।

এনআইওএস অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছে, মাদরাসার কোনো ছাত্রকেই জোর করে কোনো বিষয় নিতে বাধ্য করা হবে না। ওই সংস্থার কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, উন্মুক্ত শিক্ষা পদ্ধতিতে তাদেরও অধিকার থাকবে তারা বেদ-গীতা-পাণিনির সূত্র পড়বে কি না, সেটা বেছে নেওয়ার।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, বিবিসি বাংলা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *