২৬শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জিলকদ, ১৪৪৩ হিজরি

মাদানী খান্দানের নসব সন্ধানে

  • আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ হাসান

আওলাদে রাসূল হযরত মাওলানা সায়্যিদ মাহমুদ মাদানী দা.বা. এক ঝটিকা সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রতি বছর বাংলাদেশে মাদানী খান্দানের কোন না কোন সম্মানিত সদস্যের শুভাগমন ঘটে। তাঁদের প্রতি এদেশের মানুষের অগাধ ভালোবাসা ও পরম শ্রদ্ধাভক্তি দেখে অবহেলিত একটি জনগোষ্ঠীর অন্তরপ্রদাহ বেড়ে যায়। তারা এই খান্দানটির ‘সাইয়্যিদ’ হওয়াকে মেনে নিতে পারে না। এই বংশের ঐতিহাসিক সূত্র নিয়ে নানান মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালায়।

যাই হোক, গতকাল সকালে আমার কাছে এক ‘ফেসবুকে মুগ্ধ’ উঠতি বয়সী তরুণ জানতে চাইল, হযরত মাহমুদ মাদানী যে নবীজীর বংশধর, এর প্রমাণ কী?

আমি তার প্রশ্ন শুনে থ হয়ে গেলাম। কট্টর মাদানী বিরোধী মওদূদী ও তার জামাত-শিবির যেখানে শাইখুল ইসলাম সাইয়্যিদ মাদানী রহ.-এর বংশ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে সাহস করেনি, সেখানে এই দুধের শিশুরা কী করে এসব চিন্তা মাথায় আনে! সবই ফেসবুকের কল্যাণ। তার কথার উত্তর না দিয়ে আমি উলটো জানতে চাইলাম, বিষয়টা কী? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?

তখন সে আমাকে একটা স্ক্রিনশট পাঠালো। যেখানে সময়ের কুখ্যাত মিথ্যাবিদ, মিথ্যা ছড়ানোর অভিযোগে যে কিনা ফেসবুক মহলে কাজ্জাবী খেতাব অব্দি পেয়েছে, সেই ‘নাফাহম’ ফাহীম সিদ্দীকী (কাজ্জাবী) এর ওয়ালের একটা লেখা।

এমনিতে ব্যক্তিগতভাবে তার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। এক মাদরাসায় ‘হাযা-হাযিহি’-এর মশক করায় বাচ্চাদের। এছাড়া তার একমাত্র যোগ্যতা হলো, কপি-পেস্ট করতে পারা।

সেই তরুণের দেখানো স্ক্রিনশটের সূত্রে পোস্টে গিয়ে দেখি তার টাইমলাইনে প্রায় তিন বছর আগের একটি লেখা। এবং আমার ধারণাকে সত্য করে দিয়ে সেই লেখাটি ছিলো তার মহান যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ— ‘কপি-পেস্ট’।

সে এটা অজ্ঞাত এক নামধারী ‘কাসেমী’ থেকে কপি করেছে। এটা দেখে আমার যতসামান্য আগ্রহও দূর হয়ে গেলো।

কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, না! কিছু বলার দরকার আছে। কারণ আমি এই পেশাদার মিথ্যাজীবীর চরিত্র ও বংশীয় নোংরামির ইতিহাস সম্পর্কে জানলেও অনেকে তো জানে না। টঙ্গীর ঘটনার মতো তার এই প্রপাগাণ্ডাও হুজুরশ্রেণী গোগ্রাসে গিলবে এবং সাইয়্যিদ পরিবার সম্পর্কে কুধারণা করে নিজের জীবন বরবাদ করবে।

কপি করা সেই লেখায় এই পেশাদার মিথ্যাজীবী মূলত দু’টি পয়েন্ট এনেছে। প্রথমটি হলো,

কারও ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে তাকে আওলাদে রাসূল বলা যাবে না

আচ্ছা, নিশ্চিত বলতে এখানে সে কী বুঝাতে চাচ্ছে? অকাট্য (ক্বতঈ) জ্ঞান থাকতে হবে? কুরআনুল কারীম বা হাদীসে মুতাওয়াতির-এর মতো নিশ্চিত হতে হবে?

যদি এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তো মালিবাগ এলাকায় ‘পুঙ্গির ভাই’ খেতাবে একনামে পরিচিত (কারণ কথায় কথায় ‘পুঙ্গির ভাই’ গালি দেয়া এই লোকটির মুদ্রাদোষ ছিলো৷ হ্যাঁ পাঠক, গালি দেয়াও একজন লোকের মুদ্রাদোষ হতে পারে! আর একজন গালিবাজের ঘরে কেমন পুত্র জন্ম নেবে তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।) ইয়াহইয়া জাহাঙ্গীর একজন ‘হালালযাদা’ কিনা তা প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে পড়বে।

মূলত এই প্রশ্নটি করাই অবান্তর। প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (ফিদাহু আবি ওয়া উম্মী) হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশধর ছিলেন। কিন্তু নবীজীর ঊর্ধ্বতন পুরুষ আদনান-এর পর থেকে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম অব্দি নসব নিয়ে সমস্ত সিরাত বিশেষজ্ঞগণ সংশয়ের কথা বলেছেন। তা সত্ত্বেও আদনান থেকে নিয়ে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত নসব বর্ণনা করা হয়। নবীজীর নসবনামা নিয়ে তাহলে এসব অকালপক্ব কপি-পেস্টজীবি কাজ্জাবীরা কী বলবে?

আলোচ্য লেখার দ্বিতীয় পয়েন্টটি হলো,

হযরত মাদানী রহ. আওলাদে রাসূল কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি

শাইখুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. হযরত ইমাম হুসাইন রা. এর বংশধর। এটির সূত্র পরম্পরা বিদ্যমান আছে। যদিও তালিকায় মাত্র দুজন মানুষের নাম নিয়ে সন্দেহ আছে। বংশলতিকার ১৯ ও ২০ নং ঊর্ধ্বতন পুরুষের নাম নিয়ে সন্দেহ। শুধু এই কারণে একটি ঐতিহাসিক নসব-বংশপরম্পরা বাতিল হওয়া তো দূরের কথা, প্রশ্নবিদ্ধও হতে পারে না।

তাছাড়াও এই পরম্পরা অবিচ্ছিন্ন হওয়ার বহু কারায়েন ও আলামত বিদ্যমান আছে। নকশে হায়াত ও হযরত সাইয়্যিদ মাদানী রহ.-এর অন্যান্য জীবনীগ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা বিদ্যমান।

নকশে হায়াতের অনুবাদক আমাদের উস্তাদ মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান কাসেমী সাহেবের সঙ্গে আমি [সম্পাদক] কথা বলেছি এই বিষয়ে, তিনি বলেন, “এক পৃষ্ঠা পরেই ১৮তম ঊর্ধ্বপুরুষ সায়্যিদ নুরুল হকের পরের নসবনামাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেটা উল্লেখ না করে কেবল আংশিক অনুবাদ (তা-ও ভুল) তুলে ধরা কত বড় খেয়ানত তা পাঠক বুঝতে পারবেন।”

তারচেয়েও বড় কথা, কেবল সনদ দিয়েই সব কিছুর বিচার করা যায় না, বিচার করা হয় না। আমালে মুতাওয়ারিসও একটি বড় দলিল। যেটা হাদীস শাস্ত্রের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি।

আজকের এসব দুধের শিশুদের আস্ফালন দেখে মনে পড়ছে, শাইখুল ইসলাম সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর ঊর্ধ্বতন দাদা হযরত ইমাম হুসাইন ও হযরত ইমাম হাসান রা.-এর একটি ঘটনা। নবী দৌহিত্র এই মহান দুই ‘রায়হানুল জান্নাহ’ এর নসব নিয়েও শয়তান ও শয়তানিয়্যাতের পূজারীরা অনেক মন্দ কথা বলতো। হযরত হাসান রা. সম্পর্কে খারিজী ও উগ্রপন্থিরা তার জীবদ্দশায়ই বলতো, সে আওলাদে রাসূল কী করে হয়? বংশ সাব্যস্ত হয় ছেলের দিক থেকে। মেয়ের দিক থেকে কোনো নসব সাব্যস্ত হয় না।

একবার হযরত হাসান রা. এর সামনেই ‘জনৈক ইবনু ইয়াহইয়া জাহাঙ্গীর’ বলেছিলো, তুমি তো খচ্চরের মতো। খচ্চরকে যদি বলা হয় তোমার বাবা কে? সে এড়িয়ে গিয়ে বলে আমার মা হচ্ছে ঘোড়া। অর্থাৎ খচ্চরের বাবা গাধার পরিচয় না দিয়ে মা ঘোড়ার পরিচয় দেয় নিজেদের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য।

কী বেদনাদায়ক! কার সামনে দাঁড়িয়ে কতবড় ধৃষ্টতা! ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। এসব বেয়াদবদের জন্য হেদায়েতের দুআ করবো নাকি হালাকের বদদুআ করবো বুঝে উঠতে পারি না।

আলোচ্য লেখায় তৃতীয় আরও একটি জালিয়াতি করা হয়েছে। বলা হয়েছে,

হযরত মাদানী রহ. নিজের নামের শুরুতে ‘নঙ্গে আসলাফ’ লিখতেন। নিজেকে ‘আওলাদে রাসূল’ বলতে নিষেধ করতেন

মানে কতটুকু উন্মাদ আর মূর্খ হলে হযরতের এই বিনয়কে তারা দুর্বলতা মনে করতে পারে? ‘নঙ্গে আসলাফ’ কি বংশ? বংশপরম্পরার আলোচনায় ‘নঙ্গে আসলাফ’ আসে কোথা থেকে?

আর ঠিক কোথায় হযরত সাইয়্যিদ মাদানী রহ. তাঁকে ‘আওলাদে রাসূল বলতে নিষেধ করেছেন?’

উলটো আরও নিজেও মনেপ্রাণে শুকরিয়া আদায় করতেন যে তিনি একজন সাইয়্যিদ। এই ‘নকশে হায়াত’-এর মাঝেই আলোচ্য অংশের কয়েক পৃষ্ঠা পরে হযরত মাদানী রহ. স্বতন্ত্র শিরোনামে ইসলামের দৃষ্টিতে বংশমর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং নিজের এই সৌভাগ্যের শুকরিয়া আদায় করেছেন আল্লাহর দরবারে। চোখে বিদ্বেষের ঠুলি এঁটে না থাকলে পেশাদার মিথ্যাজীবীর চোখেও এটা পড়ত।

শেষকথা বলব, বহু হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর আহলে বাইতের, বংশধরদের ফজীলত উল্লেখ করেছেন। নবীজীর বংশধরদের ফজীলত পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

আওলাদে রাসূলদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের বলব, এখন থেকে নামাজে দরুদের একটা অংশ যেন তারা বাদ দিয়ে দেন। ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ…’ না পড়ে কেবল ‘আলা মুহাম্মাদ’-ই যেন তারা থেমে যান। ‘আলি মুহাম্মাদ’ আর না পড়েন। প্রতিদিন নামাজে যাদের জন্য আমরা দরুদ পড়ি তাদের শানে বেয়াদবী করতে একটুও কি বুক কাঁপলো না? ধ্বংস হোক এই গোস্তাখদের।

নবীজীর বংশধর বলে শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ. যাকে সাথে করে নিয়ে পবিত্র রওযা মোবারকে সম্মুখ দিক থেকে সালাম পেশ করতেন

ফকীহুন্নাফস রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী, হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কী, ফজলে রহমান গঞ্জ মুরাদাবাদী, শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.) সহ সব আকাবির যাকে সমীহ করতেন, নবীজীর বংশধর বলে শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ. যাকে সাথে করে নিয়ে পবিত্র রওযা মোবারকে সম্মুখ দিক থেকে সালাম পেশ করতেন, মাওলানা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ., মুফতী নুরুল্লাহ রহ. সহ জীবিত ও প্রয়াত সব আকাবির যাকে শ্রদ্ধা করেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মতর, তাদের প্রতি নফরত ও বিদ্বেষ ছড়ায় এরা কারা? নিজেদের দুনিয়া আখেরাত বরবাদ না করতে চাইলে আশা করি এই সব দুরাচার তাদের ধৃষ্টতা থেকে ফিরে আসবে। আল্লাহ তাদের হেদায়াত দান করুন, আমীন।

‘নকশে হায়াত’ থেকে অনুবাদক মহোদয়ের অনুমতিক্রমে বংশের মর্যাদা সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ লেখাটির লিংকপাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম -এর পাঠকদের জন্য নিম্নে দিয়ে দেওয়া হলো। তাতে সবাই বুঝতে পারবেন, নবীজীর বংশে জন্মগ্রহণ মূল্যহীন কিছু নয়। এটা এক মহাসৌভাগ্য। আওলাদে রাসূলদের হিংসা না করে তাদের প্রাপ্য সম্মানটা দেওয়া উচিত। তাতে লাভ তাদের নয়, উম্মত হিসেবে আমাদেরই ফায়দা। কাল কেয়ামতে হাউজে কাউসারের পানি পান করার জন্য নবীজীর সামনে দাঁড়াতে হবে। তাঁর সন্তানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষনকারী কীভাবে সেদিন দাঁড়াবে তাঁর সম্মুখে?

হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উসিলাতেই আমরা ইসলাম পেয়েছি। তাঁর বংশধারাকে একমাত্র মুনাফেকরাই অস্বীকার করতে পারে। অন্য কেউ নয়।

আল্লাহ হেদায়াত করুন ও হেদায়াতের উপর অটল রাখুন, আমীন।

 

লেখকঃ শিক্ষক ও খতীব

সম্পাদনাঃ

মুফতি আব্দুস সালাম
পরিচালক, আত তুরাস একাডেমি
অতিথি লেখক, পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম

 

পড়ুনঃ বংশ মর্যাদা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি : শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী

 

মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার দায় লেখকের

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com