২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

মানবিক বিবাহের ইসলামিক দৃষ্টিকোণ

  • ফয়জুল্লাহ আমান

নারী পুরুষ পরস্পরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি পবিত্র সম্পর্ক গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে এগিয়ে যায় মানব সভ্যতা। নানান সম্পর্কের সুতোয় বেঁধে ফেলে পুরো মানবতাকে এই বিয়ের সম্পর্ক। একদিকে বংশ বিস্তার, অন্যদিকে বিবাহের মাধ্যমে আত্মীয়তার মধুরতার সম্বন্ধ। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তিনিই জল থেকে সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তারপর মানুষের মাঝে স্থাপন করেছেন বংশগত ও বৈবাহিক সম্বন্ধ, তোমার প্রতিপালক সব কিছু করতে সক্ষম।’ [সুরা ফুরকান, আয়াত: ৫৪]

স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের ইসলামিক ধারণা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সুরা রুমের একটি আয়াতে, ‘মহান আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি হচ্ছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের ভেতর থেকে তোমাদের জীবনসঙ্গি সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট প্রশান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও মায়া সৃষ্টি করেছেন; নিশ্চয় চিন্তাশীল মানুষের জন্য এতে নিদর্শন আছে।’ [সুরা রুম ২১, কাছাকাছি অর্থে দ্র. সুরা নাহল ৮০]

বলা বাহুল্য স্বামী স্ত্রীর মাঝের এই মধুর সম্পর্ক কেবল যৌন চাহিদা মিটানোর সম্পর্ক নয়। বরং এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও মমত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। এই ভালোবাসার কারণে তারা সারা জীবন অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ থাকে এবং একে অপরের প্রতি থাকে নির্ভরশীল। এটিকেই ব্যক্ত করা হয়েছে ‘লিতাসকুনু’ শব্দে। আমরা তাসকুনু শব্দটির অর্থ করেছি প্রশান্তি। কিন্তু এর ভেতর ‘সুকুন’ অর্থাৎ স্থায়িত্ব ও স্থিরতার অর্থ রয়েছে। স্থির ও স্থায়ী এক সুন্দর সম্পর্কের নির্দেশ করে পবিত্র কুরআনের এ শব্দ।

ছোট ছোট দাম্পত্য জীবনের সমষ্টিতে গড়ে ওঠে সমাজ। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষ সহজ ও সুখদ জীবন কাটায়

স্বভাবগতভাবে স্বামী স্ত্রীর মাঝে চিরকালীন প্রেমের বন্ধনের যে প্রতিশ্রুতি এবং পরস্পরের প্রতি নির্ভরতার যে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আয়াতটিতে প্রকাশ পেয়েছে তা পাঠককে খুব বেশি বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। পরস্পরের প্রতি এই নির্ভরতার কারণেই মানবপ্রজন্ম টিকে রয়েছে আবহমান কাল ধরে। নারী পুরুষের এই বৈবাহিক সম্পর্ককে আমরা বলি দাম্পত্য। ছোট ছোট দাম্পত্য জীবনের সমষ্টিতে গড়ে ওঠে সমাজ। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষ সহজ ও সুখদ জীবন কাটায়। এগিয়ে নেয় সভ্যতার জয়যাত্রা।

এখানে এসে পাঠকের কাছে একটা প্রশ্ন করা যাক, বিবাহ ও ব্যাভিচারের মাঝে কী পার্থক্য? বিয়ের দ্বারা যা অর্জিত হয়, ব্যভিচারের মাধ্যমে কি তা অর্জন করা সম্ভব নয়? একজন নারী ও একজন পুরুষের পারস্পরিক দৈহিক যৌনানন্দই যদি হয় বিবাহের চূড়ান্ত লক্ষ্য, তাহলে তা ব্যাভিচারের মাধ্যমে আরও সুন্দরভাবেই সম্পাদিত হতে পারে। কারণ বিবাহের মাঝে দায়িত্ববোধের বোঝা রয়েছে। আছে অনেক সামাজিক প্রথা। আরও আছে বহুবিদ বিধিনিষেধ। ব্যাভিচারে এর কোনোটির প্রয়োজন হয় না। একত্র হলো, ফুর্তি করলো, মাস্তি মারলো, সুখ উপভোগ করলো, তারপর আবার স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ালো। খুব সহজ। বিয়ের চেয়ে ঢের বেশি ঝামেলা মুক্ত। নির্ঝঞ্ঝাট।

তাহলে ব্যাভিচার আর বিবাহের মাঝে পার্থক্য কোথায়? পার্থক্য মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে। বিবাহের দ্বারাও যৌন চাহিদার নিবারণ সম্ভব। কিন্তু কেবল যৌনানন্দই বিবাহের লক্ষ্য নয়। লক্ষ্যের দ্বারাই সংজ্ঞা ও পার্থক্য নির্ণিত হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে আমরা বিবাহের যে লক্ষ্যগুলি পাই তা নিম্নরূপ-

১. বিবাহের মাধ্যমে একটি পরিবার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অনেকগুলো সম্পর্ক সেখানে তৈরি হয়। এই আত্মীয়তা সম্পর্কের মাধ্যমে তৈরি হয় ঘনিষ্ঠতা। পারস্পরিক সৌহার্দ ও ভালোবাসা। এভাবে নিকটাত্মীয়দের প্রতি সহমর্মিতার চর্চার মাধ্যমে পুরো বিশ্ব মানবের সাথে নিগুঢ় বন্ধন তৈরি করতে পারে মানুষ। বিবাহ ছাড়া মানুষের ভেতরের এই মানবিক অনুভূতির পূর্ণতা পাওয়া অসম্ভব না হলেও কঠিন। এই সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে সুরা রুমে।

২. দ্বিতীয়ত প্রজনন ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করণ। ব্যাভিচারের মাধ্যমে কোনো মানব সন্তান পৃথিবীতে আসলে তার রক্ষণাবেক্ষণ সুকঠিন হয়ে পড়ে। কারণ এতে সন্তানের দায়িত্ব কেবল তার জননীকেই নিতে হবে। পুরুষ বিয়ের সম্বন্ধ ছাড়া কোনো সন্তানের দায়িত্ব নিতে সম্মত হবে না। মানব শিশু যেন জন্ম লাভের পর এমন অসহায় অবস্থার সম্মুখীন না হয় সে জন্য বিবাহের বিধান দেওয়া হয়েছে ইসলামি শরিয়ায়। একটি ব্যাভিচার পুরুষের জন্য হয়ত অপরিসীম সুখানুভূতি, যার জন্য তাকে আট/দশ ঘণ্টা ব্যয় করাই যথেষ্ট। কিন্তু একজন নারীকে সামান্য কয়েক ঘণ্টার ফুর্তির মূল্য দিতে হয় দশ মাসের গর্ভ ধারণের যন্ত্রণা। পরবর্তী দশ বছর লালন পালনের বোঝা। এবং হয়ত পরবর্তী সারা জীবনের জন্য সন্তানের ভালো মন্দের সাথে বাধা পড়া। পুরুষ যদি বিয়ে ছাড়া দায়িত্বহীনভাবে কেবল কামনা চরিতার্থ করে তাতে নারীর কষ্টগুলো রহিত হয়ে যায় না। নারীর অসহায়ত্ব আর বিলাপ চাপা দেওয়া যায় না সাময়িক স্ফুর্তি ও আনন্দের বাহু তলে।

৩. বল্গাহীন অবৈধ যৌন সুখ উপভোগ থেকে রক্ষা করাও একটি বড় লক্ষ্য বিবাহ বন্ধনের। হযরত ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. আমাদেরকে বললেন, হে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের ভেতর যে সংসার করার ক্ষমতা রাখে সে যেন বিবাহ করে, কেননা বিবাহ: দৃষ্টিকে অবনমিত রাখতে এবং লজ্জাস্থানকে সুরক্ষিত রাখতে অধিক সহায়ক। [বুখারী, মুসলিম]

এ হাদীস থেকে বুঝতে পারা যায়, বিয়ের ভেতর একটা দায়-দায়িত্বের ব্যাপার আছে। সেই দায়-দায়িত্ব গ্রহণের মানসিক প্রস্তুতি যার ভেতর আছে রাসূল সা. তাকে বিয়ে করতে বলেছেন। বিবাহের অন্যতম লক্ষ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বশীল করা। নারী পুরুষের দায়িত্বানুভূতি সুদৃঢ় করা এবং পরস্পরের প্রতি ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠা।

আমরা উল্লেখযোগ্য যে লক্ষ্যগুলি উপরে উল্লেখ করলাম সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বিয়ের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের মাঝে যৌনানন্দের কোনো উল্লেখ নেই। নারী পুরুষের যৌন মিলনে অভূতপূর্ব যৌন সুখ আছে, অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু এটিকে বিবাহের লক্ষ্য বানানো হয়নি। এই যৌন কামনা ও তাড়না মূলত একটি টোপ বা জাল, এর মাধ্যমে অন্য কিছু অর্জন করা লক্ষ্য। আর সেই ‘অন্য কিছু’ হচ্ছে উপরে বর্ণিত লক্ষ্যসমূহ। গভীরভাবে না দেখলে মনে হতে পারে বিয়ে শাদির লক্ষ্যই হলো যৌন কামনা বাসনা পূর্ণ করা, কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর এখান থেকেই ব্যাভিচার থেকে বিবাহ পৃথক হয়ে যায়।

পবিত্র কুরআনে বিয়ে সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘এই (১৪জন নারী) ছাড়া বাদ বাকি অন্য যে কোনো মেয়েকে অর্থ সম্পদের মাধ্যমে লাভ করা তোমাদের জন্য হালাল গণ্য করা হয়েছে। তবে শর্ত হচ্ছে এই যে, তাদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে, অবাধ যৌন লালসা তৃপ্ত করতে পারবে না, তারপর যে দাম্পত্য জীবনের স্বাদ তোমরা তাদের মাধ্যমে গ্রহণ করো তার বদলে তাদের মোহরানা ফরয হিসেবে আদায় করবে।’ [সুরা নিসা, আয়াত: ২৪]

পরের আয়াতে আবার ইরশাদ হচ্ছে, ‘নারীদেরকে তাদের অভিভাকের অনুমতিক্রমে বিবাহ করো এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে মহরানা পরিশোধ করো, যাতে তারা বিয়ের আবেষ্টনির মাঝে সংরক্ষিত থাকে, অবাধ যৌন লালসা পরিতৃপ্ত করতে উদ্যোগী না হয় এবং লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম না করে বেড়ায়। (অর্থাৎ উপপত্নি হিসেবে গ্রহণ না করা হয়)।’ অবৈধ যৌন লালসা চরিতার্থ করার জন্য কুরআনে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে মুসাফিহিনা..। এটি সিফাহ শব্দ থেকে উদগত। ‘সিফাহ’ অর্থ ঝরানো। বিবাহ বহির্ভূত বীর্যপাতকে ‘সিফাহ’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাভিচারের সংজ্ঞা হচ্ছে যেখানে কেবল বীর্য স্খলন হয়, অন্য কোনো সম্বন্ধ সেখানে থাকে না। এ থেকে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয়, কেবল নিজের যৌন কামনা চরিতার্থ করা ব্যভিচারের লক্ষ্য হতে পারে, বিবাহের লক্ষ্য নয়।

যারা যৌনতাকেই বিয়ের লক্ষ্য বানিয়ে নিত্য নতুন বিয়ে করে থাকে, তাদেরকে লক্ষ্য করেই রাসূল সা. এমন কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেছেন

এভাবেই যিনা ও নিকাহের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য আমরা কুরআনুল কারীমে দেখতে পাই। হাদীসেও রাসূল সা. এ দিকে ইঙ্গিত করেছেন। যেসব নারী পুরুষ কেবল স্বাদ গ্রহণ করে বেড়ায় প্রিয় নবীজী সা. তাদের অভিশাপ দিয়েছেন কঠোর ভাষায়। ইরশাদ করেন, আল্লাহর লানত পড়ুক আস্বাদনকারী নারী পুরুষের উপর। [কাছাকাছি শব্দে তাবারানি ও ইবনু আবি শাইবায় হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।] এই স্বাদ গ্রহণ দ্বারা উদ্দেশ্য বাস্তব প্রয়োজন ছাড়া কেবল যৌন কামনা বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে বারবার জীবনসঙ্গি বদল করা। যারা যৌনতাকেই বিয়ের লক্ষ্য বানিয়ে নিত্য নতুন বিয়ে করে থাকে, তাদেরকে লক্ষ্য করেই রাসূল সা. এমন কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেছেন।

এই ভূমিকার পর আমরা মিসয়ার বিবাহ সম্পর্কে আলোচনা করতে পারি। মিসয়ার বিবাহের বাংলা প্রতিশব্দ ‘মানবিক বিয়ে’ হতে পারে। মিসয়ার শব্দের উৎপত্তি নিয়ে আরব ভাষাবিদদের মাঝে বেশ মতানৈক্য রয়েছে। উপসাগরিয় অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক শব্দ এই মিসইয়ার। অতি সম্প্রতি এই শব্দটির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের বিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে সূচনাটা আরব থেকেই। আরবের শেখরা ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশ মিশর বা অন্যান্য দরিদ্র দেশে গিয়ে দরিদ্র কোনো মেয়েকে বিয়ে করেন। দেশে তার নিজের বৌ ছেলে মেয়ে রয়েছে। দীর্ঘ দিনের সংসার রয়েছে।

ভ্রমণের কথা বলে তারা এসব দেশে আসেন, তারপর কোনো বিধবা বা ইয়াতিম অসহায়া নারীকে বিয়ে করে কোনো হোটেলে ওঠেন। দশ পনের দিন উপভোগ করে ফিরে যান দেশে। এভাবে কয়েক দেশে কয়েকটি মানবিক বিয়ে করে সারা বছর কিছু দিন বাদে বাদে অভিসার করে বেড়ান। অনেক সময় এসব শেখ তাবলিগের কথা বলে দেশে দেশে ঘুরতে বের হন এবং একের পর এক বিয়ে করেন। কিছু দিন পর পর তালাক দিয়ে নতুন নতুন বিয়ে করতে থাকেন। অচেনা এলাকায় হওয়ার কারণে তার মান সম্মানের ভয় থাকে না। এবং দায়িত্বের বোঝাও তার থাকে না। প্রথমা স্ত্রী ও তার সন্তান সন্ততি এই বিয়ে সম্পর্কে জানতে পারে না। এবং বিয়ের সময়েই এসব মানবিক বধূর সাথে শর্ত করা হয়, তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারবে না।

বছরের যে কোনো সময় এসে সে তাকে ভোগ করবে। বিনিময়ে একটি বড় অংকের অর্থ তার জন্য বরাদ্দ করবে। হতে পারে তাকে একটি ফ্ল্যাট কিনে দিবে, তার বাসা ভাড়া দিতে থাকবে, অথবা জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি বিউটি পার্লার গড়ে দিবে। প্রয়োজনে খোরপোশ হিসেবেও কিছু অর্থ দিবে। কিন্তু সন্তান গ্রহণ করবে না, এবং কোনোভাবেই মিরাসের দাবী করতে পারবে না এবং প্রথমা স্ত্রী ও সংসারের সদস্য বা তার এলাকার পরিচিতদের মাঝে এই বিবাহের কথা প্রচার করা যাবে না। অবশ্য চাইলেও পল্লি গাঁয়ের অসহায়া নারী তার বিয়ের সংবাদ দূর অচেনা দেশের লোকদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না।

এই নিশ্চয়তা পেয়েই দরিদ্র এতিম বিধবা তালাকপ্রাপ্তা সরলা নারীদের এমন মানবিক বিয়ে করেন এসব মানুষ। ইদানিং আরবে বিভিন্ন অ্যাপসও তৈরি হয়েছে এমন মানবিক বিয়ের ঘটকালির জন্য। আরবের ভেতরেও এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে কয়েকদিনের জন্য এমন মিসয়ার বিয়ে করার চল শুরু হয়েছে। দায়বদ্ধ বিহীন অবাধ যৌনতাকে বৈধতা দানের প্রক্রিয়া বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সেখানে। সাধারণত এক হাজার ডলার বা তার চেয়ে কিছু কম বেশ খরচ করলেই একটি মিসয়ার বিবাহ করা যায়। সম্পর্কগুলো সেখানে ১৪ দিন থেকে দুই মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে।

এই মানবিক বিয়ের ধারণা আমাদের ফিকহের কিতাবগুলোতে নেই

আরবের বাইরে যারা এধরনের বিয়ে করেন তাদের অবশ্য দীর্ঘ দিন টিকে থাকে সম্পর্ক। বছরের পর বছর তারা এভাবে ভোগ করেন। চারের অধিক সংখ্যা হয়ে গেলে অবশ্য কোনো একটিকে তালাক দিয়ে নতুন একটি বিয়ে করেন কিন্তু ডিভোর্সি মেয়ের কাছে পুনরায় আসতে হলে বিবাহ নবায়ন করে হালাল পন্থায় তাকে পার্টনার হিসেবে গ্রহণ করে। বিবাহের এই ধরণ সম্পূর্ণই নতুন। অনেকেই এটিকে ‘নিকাহে সির’ তথা গোপন বিয়ের সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু মূলত নিকাহে সির সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। এই মানবিক বিয়ের ধারণা আমাদের ফিকহের কিতাবগুলোতে নেই। তাই নিকাহে সির-এর সাথে তুলনা করে একথা বলার অবকাশ নেই যে, কেবল ইমাম মালেক রহ.-এর মতে এটি অবৈধ, অন্যদের মতে বৈধ। কেউ কেউ মুতআ বিয়ের সাথেও তুলনা করতে চেয়েছেন। কিন্তু মুতআ বিয়ের সাথেও এর স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

ইরানের যে সব শিয়া শেখ মুতআ বিয়ের পক্ষে, মজার বিষয় হচ্ছে, তারা এই মানবিক বিয়ের বিপক্ষে কঠোর ফতোয়া দিয়েছেন। সুন্নি প্রধান সৌদি ও জাযিরাতুল আরবের অন্যান্য অঞ্চলের ধনী লোকেরা এধরনের বিয়ের সূচনা করেছে বলে আরব বিশ্বের অনেক শেখ এ মাসআলা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। তাদের অনেকেই এটাকে সহিহ ও হালাল বলে ফতোয়া দিলেও সাথে সাথে মাকরুহও ঘোষণা করেছেন। এদের মাঝে শাইখ বিন বায রহ. অন্যতম। তিনি স্পষ্ট এ বিবাহ বৈধ হবার পক্ষে রায় দিয়েছেন। সম্ভবত তার ফতোয়ার ভিত্তিতেই বাংলাদেশের সালাফি শায়খগণও বৈধতার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। কিন্তু আরব শায়খদের বৈধতার ফতোয়ায় আমরা দেখতে পাই- সেখানে দেখানো হয়েছে, বিয়ের সব শর্তই সেখানে বিদ্যমান। মেয়ের অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে, সাক্ষী আছে, মোহরানা আছে, খোরপোষ ও আবাসন আছে, মীরাস আছে, কেবল প্রথমা স্ত্রীর সমান রাত্রিযাপন মানবিক বধূর ভাগ্যে জোটে না। অপরদিকে শায়খ ইবনু উসাইমিন প্রথম দিকে বৈধতার ফতোয়া দিলেও পরবর্তীতে দ্বিধায় পড়ে যান, আর শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানি রহ. তো স্পষ্টভাবে না জায়েয হবার ফতোয়া দিয়েছেন।

যারা এই মানবিক বিয়েকে হালাল বলেন তাদের যুক্তি হচ্ছে, এখানে নারী পুরুষের পরস্পর সম্মতি আছে। ইজাব কবুল এবং দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি হলেই যেহেতু বিয়ে হয়ে যায় তাই এই বিয়ে হালাল বলা ছাড়া পথ নেই। কিন্তু অন্যরা বলছেন, ইসলামি শরিয়াতের মূল প্রকৃতির সাথে এ ধরনের বিয়ে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এভাবে বরং উছৃংখলতাকেই হালাল করা হবে। এধরনের বিয়ের বৈধতা দেওয়া হলে নারীর প্রতি চরম অবিচারের পথ খুলে যাবে এবং নারী হবে কেবলই কৃত্রিম হালাল(!) পন্থায় ভোগ্যপণ্য। এভাবে নারীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাকে অবমাননা ও অবমূল্যায়ন ইসলামে বৈধ হতে পারে না। বেশি থেকে বেশি বলা যেতে পারে, ইসলামি ফিকহের ফাঁকফোকরের আশ্রয় নেওয়ার ফলে ইসলামিক আইনের শাস্তি বিধানের আওতা থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হবে, কিন্তু কোনো ভাবেই এটির প্রতি উৎসাহিত করা যায় না। এমন অমানবিক বিষয়কে মানবিক নামকরণও করা যায় না, এবং অবশ্যই ইসলামের বিয়ের মাকাসিদের পরিপন্থী হিসেবেও ঘোষণা করতে হবে।

আরও পড়ুন: দেওবন্দ ও রাজনীতি | ফয়জুল্লাহ আমান

আমাদের দেশে রোহিঙ্গা শরনার্থিদের বিয়ে করার হিড়িক পড়েছিল আলেম উলামা ও ধার্মিক সাধারণ শ্রেণীর মাঝেও। অসহায়কে সহায়তা করার নাম করেই শুরু হয়েছিল এটি। এসব মানবিক বিয়ের অধিকাংশই স্থায়ী হয়নি। এবং শেষ পর্যন্ত ইসলামি শরিয়ার একটি চিরন্তন বিধানকে প্রহসনে রূপান্তরের অপপ্রয়াসই চোখে পড়েছে। আজকাল অনেক তরুণ ইসলামি বক্তা ও আলেম এমন মানবিক বিয়ের স্বপ্ন দেখছেন। তাদের মনে এই মানবিকতার ওয়াসওয়াসা ঘুরে বেড়াচ্ছে। শরিয়াতের গভীর জ্ঞান না থাকার কারণেই তারা এভাবে চরম প্রবঞ্চনায় পড়ে যাচ্ছেন। তাদেরকে বুঝতে হবে, কোনটি ইসলামের লক্ষ্য ও শিক্ষা আর কোনটি শয়তানের তালবিস বা নেক সুরতে ধোকা।

মানবিকতার নামে নিজের ভেতর থাকা সুপ্ত কাম বা বিকৃত লালসা অবদমনই এধরনের বিয়ের লক্ষ্য। কোনো নারীকে বিয়ে করলে তাকে তার হক দিতে হবে। তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তার আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমা স্ত্রীর সমান অধিকার তাকে দিতে হবে। প্রথমা স্ত্রীর মতোই সামাজিকভাবে তাকে বরণ করে নেওয়ার সৎ সাহস থাকতে হবে। মারা গেলে প্রথমা স্ত্রীর মতোই মানবিক বিয়ের স্ত্রীকেও মীরাসে শরিক করতে হবে। যদি বিয়ের সময় এ শর্ত করে নেওয়া হয়, তুমি উত্তরাধিকার দাবী করতে পারবে না, গর্ভধারণ করতে পারবে না, তাহলে তা বৈধ হবে না। কারণ এমন শর্ত স্পষ্ট কুরআন সুন্নাহ বিরোধী শর্ত। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘কিছু লোকের কি হলো, তারা আল্লাহর কিতাবে যে শর্ত নেই এমন শর্ত করে? আল্লাহর কিতাবে যেসব শর্ত নেই এমন কোনো শর্ত করলে তা বাতিল বলে পরিগণিত হবে। একশটি শর্ত করলে সবগুলিই বাতিল হবে। আল্লাহর শর্ত অধিক দৃঢ় এবং আল্লাহর কিতাব মানা অধিক কর্তব্য।’ [বুখারী]

ফিকহের ফাঁক গলে মূলত ব্যাভিচারকেই বৈধ করার অপচেষ্টা চলছে বর্তমান সমাজে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হেফাজত করুন। আমীন।

লেখক: খতিব, গবেষক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বংলাদেশ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com