স্মরণ । আমিনুল ইসলাম কাসেমী
মানুষের বন্ধু ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ.
একজন ভিনদেশী মানুষ হয়ে বাংলাদেশের প্রতি যার গভীর ভালবাসা ছিল। এদেশের সংকটকালে তিনি বুক চিতিয়ে দিয়েছিলেন। বুভুক্ষ মানুষের পাশে তিনি ছিলেন সব সময়। আমাদের এই সোনার দেশ শত্রু মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘরে ফিরে যান নি। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশে দ্বীনি মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়েছিল। কেউ খোলার সাহস পাচ্ছিল না। ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে এসে সরাসরি তৎকালিন সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের সাথে সাক্ষাত করেন। বন্ধ হওয়া সকল মাদ্রাসাগুলো খুলে দেওয়ার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধু সেই আহবানে সাড়া দিয়ে দেশের সকল মাদ্রাসা খোলার অনুমতি দেন।
সেই মহান ব্যক্তি, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের স্পন্দন, ইসলামী বিশ্বের অগ্রদুত, আওলাদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কুতুবে আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, এর বড় সাহেবজাদা,ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ.।
ফেদায়ে মিল্লাতকে সর্বপ্রথম দেখেছি ঢাকা মালিবাগ মাদ্রাসা থেকে। আপাদামস্তক নুরানী শোভায় সুশোভিত এক মহান ব্যক্তিত্ব। যার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর তিনি। উজ্জল জ্যোতিময় প্রাণপুরুষ তিনি। যতবারই তাঁকে দেখেছি, শুধু তাকিয়ে থাকতাম তাঁর নুরানী মুখমন্ডলের দিকে। কি অপুর্ব সৃষ্টি মহান আল্লাহর। পেয়ারা হাবীবের বংশধরদের মধ্যে তিনি যেন নুর ভরে দিয়েছেন।
মালিবাগ মাদ্রাসার বিভিন্ন প্রোগ্রামে ফেদায়ে মিল্লাতকে দেখেছি। উর্দু- হিন্দি মিশ্রিত বয়ান। মাঝে মাঝে দু একটা বাংলা শব্দ উচ্চারণ করতেন। কথাগুলো হৃদয় ভরে যেত। পিপাসিত অন্তর তৃষ্ঞা মেটাতো। কি যে যাদুময় কথা, প্রতিটি স্রোতার মন-মগজে বিশাল পরিবর্তন আসত। কোন সুরেলা ওয়াজ নয়, পেশাগত বক্তাদের মত কোন কথা নয়। তিনি যেটাই বলেছেন, তা যেন স্রোতাগণ এমন তৃপ্তি আস্বাদন করেছেন, যা বলে কাউকে বোঝানো যাবেনা।
সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ, একজন উঁচু স্তরের আলেম এবং বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। দারুল উলুম দেওবন্দের মত প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক। আবার রিয়াজত- মুজাহাদা করেছেন শীর্ষ বুজুর্গদের তত্বাবধানে। বিশেষ করে তাঁর পিতা কুতুবে আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ,, এর নিবিড় ছায়ায় গড়ে ওঠেছিলেন। দীর্ঘকাল পিতার খেদমত এবং আত্মার সংশোধনে তিনি ছিলেন নিবিষ্ট। যার কারণে তিনি অতি উচ্চ তবকায় নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। হুবহু যেন পিতার ফটোকপি।
হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ,, এর মত তিনিও হয়ে ওঠেছিলেন বিশ্ববরেণ্য। বিশ্ব মুসলিমের পাশে তাঁর উপস্হিতি ছিল সব সময়। যে কোন দুর্যোগে, যে কোন সমস্যায় ফেদায়ে মিল্লাত ছুটে গেছেন। সে সব সমস্যা তিনি নিরসন করেছেন। অতি কাছে গিয়ে তাদের কথা শুনেছেন। সব সমস্যাগুলো সমাধান করার ফিকির নিয়ে থেকেছেন তিনি।
মুসলিম বিশ্বের কোথায় তাঁর পা পড়ে নি? পুরো দুনিয়াটা তাঁর নখদর্পনে। মজলুম মানুষের কান্না যেন তাঁকে বেশী আঘাত করত। তিনি সইতে পারতেন না। সেখানে ছুটে যেতেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর যে কি অপরিসীম অবদান, তা ভোলা যাবেনা কোনদিন। একশ্রেণীর অবুঝ লোকেরা পাকি সৈন্যদের সাথে হাত মিলিয়ে এদেশের মানুষের উপর নির্যাতনের ষ্টীমরোলার চালাল। অন্যায় ভাবে জুলুম নির্যাতন করা হল। মা- বোনদের ইজ্জত লুন্ঠন করা হল, ঠিক তখনই সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী বাংলাদেশের মানুষের বিপদের বন্ধু রুপে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হাজার হাজার মানুষ সাথে নিয়ে পাকবাহিনীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে দিল্লির রাজপথে সংগ্রাম করেছিলেন।
আওলাদে রাসুল সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ, আজীবন মানুষের খেদমত করেগেছেন। স্বীয় পিতার বার্ধ্যেক্যে যেভাবে প্রাণপণ খেদমত করেছিলেন, তদ্রুপ আপামর জনতার খাদেম ছিলেন তিনি। নিজ দেশ ভারতের পাশাপাশি বিশ্ব মুসলিমের ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। সাম্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্হিরতার অবসান তিনি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
একজন রুহানী চিকিৎসক ছিলেন তিনি। কঠিন অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে তিনি পৌছে ছিলেন অনন্য উচ্চতায়। তাঁর বায়আত ও খেলাফত সবকিছু নিজ পিতার কাছ থেকে। পিতার ইজাজত পাশাপাশি আরো খ্যাতিমান বুজুর্গদের সোহবতে ধন্য হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর দাওয়াতী মিশন। বিশ্বব্যাপি তিনি পথহারা মানুষের আত্মার চিকিৎসা করেছেন। লাখো মানুষ সঠিক সন্ধান পেয়েছে তাঁর ওছিলায়। সর্বস্তরের মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। আলেম- উলামা, রাজনীতিবিদ, ডাক্তার,ইন্জিনিয়র, ব্যাবসায়ী, শ্রমজীবি, শিক্ষক, ছাত্র, সকলেই তাঁর থেকে উপকৃত হয়েছে।
আধ্যাত্মিকতার মিশনের একজন সফল মনিষা। বিরামহীন ভাবে মুসলিম বিশ্বের মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটেছেন। এবং এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শের উপর মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। তিনি যেন চলেছিলেন আকাবির – আছলাফের বাতলানো রাস্তায়। যেটা ছিল ” মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী” তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মত ও পথ।
এই স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি যে কতবার এসেছেন মানুষের কাছে। দ্বীনহীন মানুষকে কতবার যে তিনি দাওয়াত দিয়েছেন। সোজা রাস্তা দেখিয়েছেন, তার হিসাব একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন। হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে প্রতিবছর অসংখ্যবার তাঁর কদম পড়েছে এই বাংলাদেশে। শুধু রাজধানী ঢাকাতে নয়। পুরোদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তাঁর প্রোগ্রাম হত। ক্লান্তহীন ভাবে পথ চলা ছিল। একেবারে জীবনের অন্তিম সময় পর্যন্ত তাঁর সফর অব্যহত ছিল।
দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোতে হযরত আসআদ মাদানীর সবচেয়ে বেশী সফর হয়েছে। একবার নয়।বারবার তিনি এসেছেন। আত্মশুদ্ধির মেহনতে জুড়ে দিয়েছেন আলেমদের। বিংশ শতাব্দীর ক্রান্তিকালে আলেমগন যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই তিনি আলেম- উলামাদের আগলে রেখেছেন। বহু ওলামায়ে কেরাম যেন আত্মশুদ্ধির এই মহান রাস্তাকে ভুলে গিয়েছিল। গড্ডলিকা প্রবাহে জীবন চালাচ্ছিল তাঁরা। ফেদায়ে মিল্লাতের কোরবানী- মেহনত- মুজাহাদায় সন্জীবিত হয়েছিল আলেম সমাজ। যেন তারা প্রাণ ফিরে পেল।
আলেমগণ তো খানকার গদ্দিনশীনদের কাছে যেতে চায় না। তারপার আবার হকের কেতনধারী এবং হক- হক্কানিয়্যাতের মশাল প্রজ্জলনকারী মানুষের তো বড্ড অভাব। কিন্তু মাদারে ইলমী দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে যখন ফেদায়ে মিল্লাতের আগমন বারবার ঘটত। আলেমদের মাঝে এক চেতনা জাগ্রত হত। আর সেই আত্মার সংশোধনের চেতনায় এদেশের হাজার হাজার আলেম অনেক উপকৃত হয়েছেন। সেই সাথে হাজারো সাধারন মানুষ সঠিক পুণ্যের রাস্তায় ব্রত ছিলেন সারাজীবন।
এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী। অনেক শক্ত কঠিন হৃদয়ের মানুষগুলো তাঁর সোহবতে বিগলিত হয়েছে। অন্তর হয়েছে মোলায়েম। চক্ষুদ্বয় ভরে গেছে আল্লাহর ভয়ে অশ্রুতে। খোদাপ্রেমের শরাব পানে যেন তাঁরা তৃষ্ঞা নিবারণ করেছেন। মাদানীর সংস্পর্শে উলামায়ে কেরাম হয়েছেন ধন্য।
জীবন ও কর্ম
জন্ম: ১৯২৮ সনে ২৭ এপ্রিল জন্মগ্রহন করেন। এ বছরই তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস নিযুক্ত হন।
আসআদ মাদানী মাদানী রহ,, তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক, কুতুবে আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানীর বড় সাহেবজাদা। দাদা হলেন, তৎকালিন জমানার খ্যাতিমান বুজুর্গ, মশহুর আলেম মাওলানা ফজলুর রহমান গন্জে মুরাদাবাদীর খাস মুরীদ, মাওলানা সৈয়দ হাবীবুল্লাহ রহ,, তিনি আধ্যাত্মিকতার সাধনায় অনেক উচ্চ মাকাম হাসিল করেছিলেন।
শিক্ষাজীবন
প্রাথমিক শিক্ষাঃ সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ, এর প্রাথমিক শিক্ষা মায়ের কাছে। কিন্তু তাঁর বয়স যখন নয় বছর,তখন তাঁর আম্মার ইন্তিকাল হয়ে যায়। এরপর পারিবারিক শিক্ষক, শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানীর খাদেমে খাস এবং বিশিষ্ট খলিফা, মাওলানা ক্বারী আসগার আলী সাহেবের তত্বাবধানে লেখাপড়া করেন।
উচ্চ শিক্ষা
১৩৬১ হিজরীতে সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ, দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত অত্যান্ত সুনামের সাথে লেখাপড়া করেন। ১৩৬৯ হিজরীতে দাওরায়ে হাদীস পাশ করেন ইমতিয়াজী শানের সাথে।
শিক্ষকতা
১৩৭০ হিজরীতে দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক নিযুক্ত হন। দীর্ঘ বার বছর যাবত তিনি অত্যান্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন।
রাজনৈতিক জীবন
দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যাপনাকালীন সময়ে ভারতীয় মুসলমানদের প্রাণের সংগঠন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দে যোগদান করেন। অত্যান্ত দক্ষতার সাথে সংগঠনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান তিনি। ১৯৬০ সনে জমিয়তের উত্তরপ্রদেশের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সনে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী এবং ১৯৭৩ সন থেকে ইন্তিকালের পুর্বমুহুর্ত পর্যন্ত তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ছিলেন। সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ, তিন মেয়াদে ১৮ বছর ভারতীয় লোক সভার সংসদ সদস্য ( এমপি) ছিলেন।
আধ্যাত্মিক সাধনা
ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ, দাওরায়ে হাদীস ফারেগ হওয়ার পর সন্মানিত পিতা সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, এর কাছে বায়আত গ্রহন করেন। এরপর পিতার নির্দেশে রিয়াযত- মোজাহাদার জন্য মদীনা শরীফ গমণ করেন। দীর্ঘ এক বছর রওজার পাশে কাটিয়ে দেন।
শায়খুল ইসলাম মাদানীর হায়াতকালে যখন তিনি মদীনায় ছিলেন, বেশ কিছু ঘটনা এবং বিভিন্ন চিঠিতে সুস্পষ্ট বোঝা যায়, আসআদ মাদানী সাহেব ইজাজত এর যোগ্যতা সম্পন্ন হয়েছেন।
শায়খুল ইসলাম মাদানী যখন ইন্তেকাল করেন, সেসময়ে শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ,, এবং হযরত মাদানী রহ, এর খলিফাগন ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ, কে খেলাফত প্রদান করত: শায়খুল ইসলাম মাদানীর জা- নশীন ঘোষনা করেন।
এরপর শুরু হল সুলুকের লাইনে খেদমত। পুরো ভারতবর্ষ সহ বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে তাঁর কর্মতৎপরতা। এ যেন এক বিপ্লব। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, সকল জায়গাতে তাঁর পদচারনা ছিল। সফরের পর পর। বিরাম- বিশ্রামহীন ভাবে ছুটে বেড়িয়েছিলেন।
মাহে রমজানে ইতিকাফ করতেন। পুরো রমজান হাজার হাজার আলেম এবং দ্বীনদার মানুষকে সাথে নিয়ে ইতিকাফে সময় পার করেছেন। বহু মানুষ তাঁর সংস্পর্শে এসে হেদায়েতের আলো পেয়েছেন। শত শত ওলামায়ে কেরাম তাঁর থেকে ইযাজত প্রাপ্ত হয়ে মানুষকে দ্বীনের পথে আহবান করে যাচ্ছেন।
ফেদায়ে মিল্লাতের খলিফাবৃন্দ ( আংশিক)
বাংলাদেশ –
১/ মাওলানা মরহুম আব্দুস সামাদ, চট্রগ্রাম।
২/ মাওলানা মরহুম শাহ আব্দুল হামিদ, বানিয়াচং,হবিগন্জ
৩/ মাওলানা মরহুম মুফতী নুরুল্লাহ , বিবাড়ীয়া।
৪/ মাওলানা ফয়জুল বারী, সিলেট।
৫/ মাওলানা আজিজুল হক সন্দীপ।
৬/ মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ, ঢাকা।
৬/ মাওলানা ইমরান মাজহারী, কুমিল্লা।
৭/ মাওলানা আব্দুল মতীন, ঢাকা।
৮ / মাওলানা হাফীজুদ্দীন, ঢাকা।
৯/ মাওলানা নুর মোহাম্মাদ, মোমেনশাহী।
১০/ মাওলানা আহসান হাবীব, ঢাকা।
ভারত
১/ সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী, দারুল উলুম দেওবন্দ।
২/ সাইয়্যেদ মাহমুদ মাদানী, মাদানী মন্জিল, দেওবন্দ।
৩/ মাওলানা ক্বারী সাইয়্যেদ ওসমান মুনসুপুরী, দারুল উলুম দেওবন্দ।
৪/ মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব, বিজনুর।
৫/ মাওলানা উসমান হাজারবী, দেওবন্দ।
ইংল্যান্ড
১/ মাওলানা হাসান সাহেব, বোডহানোভী।
২/ মাওলানা তরীকুল্লাহ, লন্ডন।
৩/ মাওলানা শাহজাদা খান, বার্মিংহাম।
দক্ষিণ আফ্রিকাঃ
১/ মাওলানা আইয়ুব কায়ুবী
২/ শায়েখ আহমাদ মুসলিম
৩/ ইব্রাহিম মুসা পান্ডব।
পাকিস্তান
১/ মাওলানা আইয়ুব জান, পেশোয়ার।
২/ মাওলানা সাইয়্যেদ মাজহার আসআদী।
ইরান
১/ জনাব তাজ মুহাম্মাদ, ইরান।
বার্মা
১/ মাওলানা আব্দুর রহমান কাসেমী, রেঙ্গুন।
এরকম প্রায় তিনশতের উপরে দেশ- বিদেশে তাঁর খলিফা রয়েছে। যারা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে সমাজের মধ্যে ছুটে বেড়াচ্ছেন। মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে চলেছেন।
জাতীয় পর্যায়ে ফেদায়ে মিল্লাতের অবিস্মরণীয় অবদান
মুসলিম জাতি যখন সুদী মহাজনের খপ্পরে আবদ্ধ। তাছাড়া মুসলমানদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সুদ মুক্ত কোন পদ্ধতি চালু করা যায়। , মানুষকে সুদ থেকে বাঁচানোর স্বপ্ন দেখতেন শায়খুল ইসলাম মাদানী রহ,,। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে দেখায়ে ছিলেন ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ,।
সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী সাহেব দেওবন্দের ওলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ ক্রমে তিনি “মুসলিম ফান্ড ” গঠন করেন। যেখানে মুসলিমদের সুদ মুক্ত ঋণ দেওয়া হয়। মুসলিম জাতিকে সুদ থেকে বাঁচাতে তাঁর এ অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন জেলাতে মুসলিম ফান্ডের শাখা- প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলায় হযরতের অবদান
ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলায় নজীরবিহীন অবদান রেখেছেন। যা কল্পনা করা যায় না, এরকম বিশেষ কাজে তাঁর অবদানগুলো জ্বল জ্বল করছে।
১৯৬৮ সনে কোলকাতার দাঙ্গা মোকাবেলা, ১৯৮০ সনে মুরাদাবাদ এর দাঙ্গা রোধ,১৯৮০ সনে ভাগলপুরে দাঙ্গা প্রতিরোধ, ২০০২ সনে গুজরাটের বীভৎস দাঙ্গা প্রতিরোধ, এভাবে জাতীয় পর্যায়ে যেখানে দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছে, তিনি নিরসনের জন্য এগিয়ে এসেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফেদায়ে মিল্লাতের অবদান
নিজের দেশ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি খেদমতের জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। বিশ্বের যেখানেই মুসলিমগণ নির্যাতিত হতে দেখতেন, সেখানেই তিনি এগিয়ে গিয়েছেন। ইরান- ইরাক যুদ্ধ, ইরাক- কুয়েত,ফিলিস্তিন, এভাবে যেখানেই মুসলিমদের দেখেছেন মজলুম, তখনই তিনি তাদের পাশে। সকল সংকট নিরসনে তিনি অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছেন।
১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু ছিলেন ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী
৭১ সনে পাকহানাদার বাহিনী যখন আমাদের দেশে জুলুম নির্যাতন শুরু করেছিল, তখনই তিনি ভারতে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলেন। স্মরণার্থী শিবিরগুলোতে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ছিলেন। কঠিন সেই বিপদের সময় বাংলাদেশের মানুষের বন্ধু ছিলেন তিনি। কোলকাতা, দিল্লি এবং ভারতের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরী হয়েছিল। বিভিন্ন জায়গাতে মিছিল- মিটিং সেমিনার করেছিলেন।
সর্বশেষ যখন আমেরিকা পাকহানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা এবং এদেশে দমন-পীড়নের লক্ষ্যে সপ্তম নৌবহর এ উপমহাদেশ অভিমুখে রওয়ানা করে, তখন সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী সাহেব পঞ্চাশ হাজারের বেশী লোক নিয়ে দিল্লিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে মার্কিন দুতাবাস ঘেরাও হয়।
ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহ, চতুর্মুখি খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন সারাজীবন। একদিকে দরস- তাদরীস,যেখানে এক যুগ কেটে গেছে। এরপর সুলুকের লাইনে তাঁর কঠিন অধ্যাবসায়। রিয়াযাত- মুজাহাদা। আত্মশুদ্ধির মেহনত করেছেন বিশ্বব্যাপি। অালেম এবং সর্বসাধারণের মাঝে তাঁর বিরামহীন খেদমত অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি তিনি খেদমতে খালক- এ নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। বিশ্বজুড়ে তাঁর অবিরাম গতিতে অদম্য সাহস নিয়ে মানুষের পাশে। কাল থেকে মহাকাল তিনি দ্যুতি ছড়িয়েছেন।
ইন্তেকাল
২০০৬ সনের ৬ ফেব্রুয়ারী দিল্লির এ্যাপোলো হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে দেওবন্দের মাকাবারায়ে কাসেমী, যেখানে দারুল উলুমের সুর্য সন্তানেরা শায়িত, সেখানে দাফন করা হয়। মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে সুউচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


