১১ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৮শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৮শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি

মুসলিমদের ১০০১ আবিষ্কার | পর্ব- ১

আমরা যারা মুসলিম তাদের অনেকেরই খুব জানতে ইচ্ছে করে, মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের দিনগুলোর গল্প। পশ্চিমা সমাজের শৈল্পিক, বৈজ্ঞানিক ও আর্থসামাজিক উত্থান এবং বিজ্ঞানের গল্পগুলোর পাতায় পাতায় শুধু পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের নাম দেখে আমরা রীতিমত হতাশ হই। তাই এই রমজানে ইসলামের সোনালী যুগে উদ্ভাবিত বিজ্ঞান, সাহিত্য, কলা প্রভৃতিতে মোটা দাগের আবিষ্কারগুলো নিয়ে পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য একটা সিরিজ নিয়ে হাজির হয়েছেন ‘মুবাশশির হাসান সাকফি’। তিনি খুব সহজভাবে বিষয়গুলো আলোচনার করার চেষ্টা করেছেন। যেহেতু তিনি একজন বিজ্ঞান ও একইসাথে ধর্মের ছাত্র, তাই আশা তার লেখা ও অনুবাদ পাঠকের কাছে ভালো ও সহজ মনে হবে।

মধ্য যুগ, বর্বরযুগ ও সোনালী যুগ: মূলত ৫ম থেকে ১৫শ শতক পর্যন্ত এই এক হাজার বছরের সময়ব্যপ্তিকে মধ্যযুগ বলে। এই যুগে পশ্চিমা সভ্যতা অন্ধকার, অনাচারে ডুবে গেছিল বলে একে ইউরোপের বর্বরযুগ বা অন্ধকার যুগ বলা হয়। অন্যদিকে ইসলামের সুচনাই ঘটে এই ব্যপ্তিতে। এই সময়েই জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে বলে একে মুসলিমদের সোনালী যুগ বলা হয়।

মধ্য যুগ কেন গুরুত্বপূর্ণ: ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের প্রফেসর সেলিম আল হাসানি তার বই ১০০১ ইনভেনশনস এর মাধ্যমে এই যুগের সম্পর্কে মোটামুটি স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। তিনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একটি লাইভ শো-তে বলেন, আমার এক বন্ধু ডেনিয়েল কার্ডেল আমাকে বললেন, তুমি বাগদাদের ওদিক থেকে এসেছো। তুমি তো জানো, ৫ম থেকে ১৫শ শতক পর্যন্ত প্রায় এক হাজার বছরের একটা বড় শূণ্যস্থান আছে আমাদের বিজ্ঞানের ইতিহাসে। তোমার এ বিষয় নিয়ে কাজ করা উচিৎ।

সেলিম আল হাসানি যদিও এত বড় ইতিহাস নিয়ে প্রথমে কাজ করতে রাজি হতে চাননি। পরে তিনি দেখলেন, আসলেই এই মধ্যযুগের ইতিহাস পাঠ্যবই থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমাদের ছেলেপুলেরা পাঠ্যবই পড়ে, বিজ্ঞানীদের নিয়ে জানে। কিন্তু সেখানে মধ্যযুগের কোনো কথাই নেই! ইউরোপীয়দের হাতে লেখার কারণে আরবদের কথা না হয় এল না। কিন্তু তখন তো ইউরোপীয় একটা অঞ্চল আন্দালুস (বর্তমান স্পেন)। সেখানকার কোনো বিজ্ঞানীরও নাম পাওয়া যায় না। সুতরাং পুরো বিজ্ঞানের ইতিহাসে মুসলিমদের নাম নেই, এমনকি মেয়েদরও কোনো নাম নেই! এক হাজার বছরের ইতিহাস তো স্রেফ উধাও হয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া মধ্যযুগের এক হাজার বছর যদি বিজ্ঞানের চাকা একদম বন্ধই হয়ে যেত তাহলে এক হাজার পর হুট করে অভূতপূর্ব এই উত্থানের কারণ কী? তাই আমি বুঝতে পারি, আমার বন্ধুই ঠিক ধরেছে এবং আমাদের এ বিষয়ে কাজ করা উচিৎ।

মুসলিমদের মৌলিক অবদান: আবিষ্কার তো সব জাতিই করেছে। হিন্দু, খৃস্টান, বৌদ্ধ, পৌত্তলিক, নাস্তিক সব জাতি থেকে পৃথিবীবাসী উপকার পেয়ে এসেছে। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে মুসলিমদের একটা বিশেষ অবদান আছে।

ফিলিপ কে হিট্রি বলেছেন, মুসলিমরা ছিল লিংকার (সংযোক রক্ষক) বা ট্রান্সলেটর (অনুবাদক)। তারা গ্রীকদের জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্প-সাহিত্যকে এক হাজার বছর লালন করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ফিলিপ কে হিট্রির কথাটা আংশিক সঠিক। তবে তিনি অনেকটা দরজার ছিদ্র দিয়ে আকাশ দেখার চেষ্টা করেছেন। কারণ আমরা জানি মুসলমানদের অনুবাদের এই যুগের পরেই ইউরোপীয়ানরা চালু করে লাতিনীকরণ যুগ (Latinization period)। অর্থাৎ মুসলমানদের লেখা বইগুলোর লাতিন ভাষায় অনুবাদ করার প্রয়াস। অথচ ইউরোপীয়দের কেউ তো আর শুধু অনুবাদক বলে খাটো করবে না। কারণ মুসলিমদের মত ইউরোপীয় এইসব বিজ্ঞানীগণ জ্ঞানের পিপাসায় কাতর হয়েই অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছেন। যে অনুবাদযজ্ঞ মানবসভ্যতাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ এবং অগ্রগামী।

এটাও সত্য যে, প্রাচীন হিন্দু, গ্রীক ও রোমান সভ্যতাও অনেক কিছুই তাদের পূর্ববর্তী মিশরীয়, আসিরীয় এবং ব্যবলনীয় সভ্যতা থেকে গ্রহণ করে এসেছে। আফসোসের বিষয়, গ্রীক কিংবা রোমানগণের গ্রন্থসমূহে থেকে পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের তেমন কারও নামই জানা যায় না, হিন্দু গ্রন্থগুলোতেও না। আরবি গ্রন্থসমূহে স্পষ্ট করেই সব গ্রীক, রোমান, হিন্দু পণ্ডিতদের নাম ধরে ধরে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও মিশরীয়, আসিরীয়, ব্যাবিলনীয় সভ্যতার ওপর বর্তমান অনেক গবেষণায় আমরা নিশ্চিত হয়েছি, বিজ্ঞান একক কোনো জাতি বা সভ্যতার হাতে গড়া বস্তু নয়।

সেলিম আল হাসানির মতে মুসলিমদের মৌলিক অবদান হলো, আন্তসাংস্কৃতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিনিময়। হ্যাঁ, মুসলিমরাই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। বাগদাদের এই জ্ঞানের দুয়ারের নাম ছিল, বায়তুল হিকমাহ বা জ্ঞানের আলয়। এখানে পৃথিবীর সকল সংস্কৃতির জ্ঞান বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা শুরু করে মুসলিমরা। ভারত, পারস্য, চীন, গ্রীক প্রভৃতি সংস্কৃতির বই নিয়ে এই বায়তুল হিকমাহের বিশাল সম্ভার। এখানে এসব বই নিয়ে চলত দিনরাত গবেষণা, অনুবাদ, পর্যালোচনা এবং নতুন নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা। এরিস্টোটল, প্লেটো, পীথাগোরাস, ইউক্লিড, গ্যালেন, সুশ্রুত, চরক, আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত প্রমুখের জীবনের সকল কীর্তি নিয়ে চলত গবেষণা, ভুলশুদ্ধ নির্ণয় এবং সমন্বয়সাধন।

মূলত মুসলিমদের ইচ্ছা ছিল পুরো পৃথিবীর সকল সংস্কৃতির জ্ঞানকে এক জায়গায় একত্র করে পর্যালোচনা করা। এরকম উদ্যোগ আগে কারও মাথায় তো আসেই নি; এতটা সৎসাহসও কারও বুকে ছিল কি না সন্দেহ। কারণ অজানা সব ভাষায় রচিত এত অজানা জ্ঞানের ভাণ্ডারে হাত দিতে হবে। নেই ডিকশোনারি, নেই পূর্বধারণা, নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান! মূলত বায়তুল হিকমাহই তো এই ধারার পথিকৃত!

এই যে এত এত ভাষার রহস্য ভেদ করার তীব্র কৌতুহল এখান থেকেই জন্ম নিল ডি-সাইফারিং সায়েন্স বা ক্রিপ্টো অ্যানালাইসিস (সাইফার কথাটা আরবি সিফরুন থেকে এসেছে, সিফরুন অর্থ রহস্য)। রহস্য ভেদ করার জন্য যে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা হয়। এর জনক আবু ইউসুফ আল কিন্দি ছিলেন বায়তুল হিকমাহর পরিচালক।

গণিতের নতুন সংখ্যা আবিষ্কার হলো, যেখানে আরবি ও ভারতীয় গণিতের নতুন সংখ্যাপদ্ধতি চালু হলো শুধু আন্তসাংস্কৃতিক বিনিময়ের কল্যাণে। এই সংখ্যাব্যবস্থায় প্রথমবার ১ থেকে ৯ পর্যন্ত শব্দ ব্যবহার হল। পরে এতে শূণ্যকে যুক্ত করা হল। যিরো শব্দটাও সিফরুন>সিফার>যিফার>যির শব্দ থেকে এসেছে; সিফরুন অর্থ রহস্য; যেহেতু শূণ্য বলে কিছুই নেই কিন্তু গণিতে এর রহস্যজনক অবস্থান, একে ছাড়া গণিতের কোনো কাজই অসম্ভব তাই এর নাম যিরো।

মহাবিজ্ঞানী আল খোয়ারিজমি (বায়তুল হিকমাহর একজন পরিচালক) ভারত সফর করে এসে ভারতের পাটিগণিত নিয়ে লিখলেন কিতাব আল আদাদ আল হিসাব আল হিন্দি, নিজে আবিষ্কার করলেন আল জেবরা (আরবি শব্দ আল জাবরু অর্থ পুনর্সজ্জা; তার বই কিতাবুল জাবর ওয়াল মুকাবালাহ থেকে)। মহাজগতের রহস্যকে অনুমান করতে বিজ্ঞানের সমীকরণিক যে ভাষা ব্যবহৃত হয়, তারই নাম আল জেবরা। যে আল জেবরা ছাড়া বিজ্ঞান ও গণিত কাজই করতে পারে না।

আরও পড়ুন: মানুষ যখন আকাশে ওড়ে

এছাড়াও বর্তমান প্রোগ্রামিং জগতে বহুল ব্যবহৃত আল-গোরিদমও আল-খোয়ারিজমিরই প্রথম আবিষ্কার। কীভাবে সমস্যাকে পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে তার সমাধান করা হয় সেই বিজ্ঞান। আল খোয়ারিজমিকে লাতিনে আল গোরিতমি বলে ডাকা হয়। লাতিনে সব আরবি বিজ্ঞানীর নামই কিছুটা বিকৃত হয়ে গেছে। যেমন, হাসান ইবনে হায়সামকে ডাকা হয় আল হাযেন; আলোক বিজ্ঞানের জনক এই মহান বিজ্ঞানীই প্রথম এক্সপেরিমেন্টের সংজ্ঞা ও শর্তসমূহ নির্ধারণ। এজন্য তাকে এক্সপেরিমেন্টাল তথা ফলিত বিজ্ঞানের জনক স্বীকার করা হয়। তাছাড়া আরেকজন আছেন জাবের যাকে ইউরোপে ডাকা হয় গ্যাবার; রসায়নের জনক এই মহান বিজ্ঞানীর উপস্থিতিধন্য সময়কালকে ডাকাই হয় ‘দ্য টাইম অব গ্যাবার’ বা জাবেরের সময়কাল।

তো একের পর এক কাজ হতে থাকলো। প্রথম প্রকৃত আকাশ পর্যবেক্ষণের মানমন্দির (ট্রু অবজারভেটোরি) নির্মিত হলো, প্রথম বিশ্বকোষ (এনসাইক্লোপিডিয়া) রচিত হলো, তৈরি হলো প্রথম প্রোগ্রামযোগ্য মেশিন। ভাবতেই অবাক লাগে!

জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিমদের এত অবিস্মরণীয় অবদান সত্ত্বেও তারা আজ বিস্মৃত। আমরা এই ধারাবাহিক প্রবন্ধে মূলত প্রফেসর ‘সেলিম আল হাসানি’ এর ১০০১ ইনভেনশনস: মুসলিম হেরিটেজ ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (১০০১ আবিষ্কার: বিশ্বে মুসলিম সংস্কৃতি) বইয়ের অনুবাদ তুলে ধরবো। বিশ্বব্যাপী বিশেষভাবে সাড়া জাগানো এ বই এবং এর বিষয়বস্তু কতটা বিস্তৃত পাঠক আশা করি তাতে বিস্মিত না হয়ে পারবেন না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com