১১ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৮শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৮শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি

‘মূলত আমি একজন কবি, রাজনীতিবিদ নই’

কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সঙ্গে আলাপ

পাকিস্তানের লাহোরে জন্ম নেয়া গত শতকের গুরুত্বপূর্ণ কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ সর্বভারতীয় প্রগতিশীল লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠাতাদেরও একজন। দুবার নোবেল মনোনয়ন ও ১৯৬২ সালে লেনিন শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।

সাম্যবাদী এ কবি জীবনভর সাম্রাজ্যবাদ আর প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে বাঙালির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন তিনি। এমনকি পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরে জেলেও যেতে হয় তাকে। মৃত্যুর দু’বছর আগে ১৯৮২ সালে পাকিস্তান, বিশ্ব রাজনীতি এবং শিল্পসাহিত্য বিষয়ে কবির একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আনোয়ার ইকবাল। সাক্ষাৎকারটি প্রথমে সে বছরেরই ২৮ জুন ‘দ্য মুসলিম ইসলামাবাদ’ এ প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে ‘ডন’ ২০১৩ সালে পুনরায় এটি প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন কবি কাউসার মাহমুদ।

ইসলামাবাদের কাভার্ড বাজারের কাছে একটি বাড়ির বাইরে এসে থামলাম আমি। এখানেই এককালে বেগম সরফরাজ ইকবাল থাকতেন। বর্তমানে এ রাস্তার নাম তার নামেই নামকরণ করা হয়েছে। এই সেই জায়গা, যেখানে বহু বছর আগে মহান ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি। যেটা দ্য মুসলিম, ইসলামাবাদে’ ১৯৮২ সালের ২৮ জুন প্রকাশিত হয়।

ইসলামাবাদ তখনও সবুজ পাতায় ঢাকা ছোট এক শহর। মহাসড়কের দু’পাশে লম্বা পাইন ও ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। মৌসুমি ফুলে সুগন্ধময় বাতাস। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড বৃষ্টিতেও সন্ধ্যাকালটি প্রায় সবসময়ই দুর্দান্ত। শীতের মৃদু ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় কেমন এক রহস্যময়তা জড়ানো ছিল চার ধারে। এই অসহ্য ও অপরিহার্য ধূলিকণা; যা এখন শহরকে চারদিক থেকে ঢেকে দেয়, তখন ছিল না। গাছের সবুজ প্যাঁচগুলো শহরের ভেতর রেখা হয়ে গিয়েছিল এবং শহরকে এক অর্থে সংকুচিত করেছিল। সঙ্গে সবুজ ঘাসের ঘন গালিচা মাটিকে ধুলো থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

সবকিছু পৃথক হত্তয়া ইসলামাবাদ কি ভেঙে যাচ্ছে? আশা করি, না। তবে বদলে গেছে ঠিক। ইসলামাবাদ সম্পর্কিত আমাদের প্রজন্মের অনেক মানুষ এবং সেসময়ের বহু জায়গা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বেগম সরফরাজ ইকবাল ও ফয়েজ সাহেব দুজনই মারা গেছেন। কাভার্ড বাজার আর নেই। এর অর্ধেক ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে আর বাকিটুকু হিংস্র হাতুড়িটির অপেক্ষায় রয়েছে।

তবে, আমি যখন ১৯৮২ সালে এ বাড়িতে আসি, ফয়েজ সাহেব, বেগম সরফরাজ এবং বাজার সবই সেখানে ছিল।

‘আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম’ ভেতরে প্রবেশ করতেই বেগম সরফরাজ ইকবাল আমাকে বলেন। কিন্তু আমি আগ থেকেই জানতাম তিনি ছিলেন এবং এটিও জানতাম কেন!

তিনি আমার অনুরোধে ইন্টারভিউটি এরেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু একটি শর্তে যে, তিনি প্রশ্নগুলো দেখবেন এবং তারপরই অনুমোদন করবেন। শুরুতেই তিনি আমাকে বলেন, ‘আমি সেন্সরশিপে বিশ্বাস করি না। তবে, তুমি সবেমাত্র তোমার ক্যারিয়ার শুরু করেছো এবং স্পষ্টতই আমি নিশ্চিত নই যে, তুমি এত বড় একটি সাক্ষাৎকার হ্যান্ডেল করতে পারবে কিনা!’

আমি তাকে প্রশ্নগুলো দেখাই। তিনি সেগুলো দু’বার পড়েন এবং আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘না, কোনো সাক্ষাৎকার হবে না। তুমি বড়জোর ফয়েজ সাহেবের সঙ্গে চা-পান করে বিদায় হতে পার।’

আমি ‘কেন’ জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলেন : ‘এগুলো প্রশ্ন নয়। নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য। উর্দু পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হওয়া উচিত নয়, একটি রাষ্ট্রের কোনো আদর্শ থাকতে হবে না, শিল্পের পক্ষে পাকিস্তানের কোনো জায়গা নেই এবং ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত।’ এখানে প্রশ্ন কোথায়? তাছাড়া কেনইবা কোনো কবি এমন বিতর্কে জড়িয়ে পড়বেন?’

তার তিরস্কার আমাকে খুবই হতাশ করে। এই প্রথম এটি আমার কোনো দীর্ঘ সাক্ষাৎকার হতে যাচ্ছে এবং আমি সত্যিই এর অপেক্ষায় ছিলাম। অগত্যা তার অভিযোগের বিরুদ্ধে আমি আর নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করি না; কিন্তু আমার ভাগ্য ভালোই ছিল বোধহয়। তার অমন ডাঁট-ধমকের কাজ শেষ হতেই ফয়েজ সাহেব ঘরে ঢুকলেন।

‘ভাই, সোবাহ, সোবাহ কিস পর নারজ হো রাহি হ্যায়’ (সকাল সকাল কার উপর অমন রাগ হচ্ছো)? তিনি জিজ্ঞেস করেন।

‘মুসলিম থেকে এ সাব রিপোর্টার’ এসেছেন, বেগম সরফরাজ স্বর উচ্চগ্রামে তুলে জানান। আমি তাকে আপনার সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কিন্তু তার প্রশ্নগুলো একজন কবির চেয়ে রাজনীতিবিদের পক্ষেই বেশি দেখছি। তাই তাকে প্রাতঃরাশের পর চলে যেতে বলেছি।

‘না, না না। মন খারাপ করবে না। তরুণদের সঙ্গে তো একেবারেই নয়’ ফয়েজ সাহেব মৃদু হাসেন এবং আমাকে ডেকে ওনাকে প্রশ্নগুলো দেখাতে বলেন।

বেগম সরফরাজের অমন গুরুগম্ভীর পরিবেশে, নতুন এ আশার এক চিলতে রশ্মি দেখে কিছুটা স্বস্তি আসে আমার। ধীর পায়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যাই। যেখানে ফয়েজ সাহেব প্রাতঃরাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমি তার সামনে প্রশ্নগুলো রাখি। সেগুলো পড়ার সময় তিনি আমাকে তিন কাপ চা তৈরি করতে বলেন।

আমি চা তৈরি করছিলাম। কিছুক্ষণ পর কাগজটি রেখে তিনি বলেন : ‘আপনার নোটবুকটি নিয়ে আসুন। আসুন প্রাতঃরাশের সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি শেষ করার চেষ্টা করি।’

আমরা সাক্ষাৎকার শুরু করি। তিনি একটি প্রশ্ন বা রাজনৈতিক বক্তব্য পড়তেন, যেমনটি বেগম সরফরাজ ইকবাল একইসঙ্গে যথাযথভাবে বলছিলেন এবং আরেকবার বলছিলেন : ‘এটি পুনরায় পড়ে নিন।’ এ প্রক্রিয়াতে আমি যে রাজনৈতিক বক্তব্যগুলো উত্থাপনের চেষ্টা করেছি তিনি তা পরিবর্তন না করে, প্রতিটি রাজনৈতিক বক্তব্যকে একটি সাহিত্যের ইস্যুতে পরিণত করেছিলেন। একাধিকবার তিনি আমাকে বলেছিলেন কীভাবে আমার অনুভূতিগুলো একটি ভালো লেখার অংশে গতিপথ করতে হয়।

‘একজন ভালো সাংবাদিক তার সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ব্যক্তিকে তার পছন্দসই জিনিসগুলো বলতে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে। আপনি নিজেই কিছু বলবেন না। ঠাণ্ডা মাথার হোন, সুশৃঙ্খল এবং ভালোভাবে প্রস্তুত হোন। সংবেদনশীল হওয়া কোনো উপকারে আসে না’ ফয়েজ সাহেব শান্তস্বরে বলেছিলেন।

যাহোক, এ সাক্ষাৎকারটি ‘দ্য মুসলিমে’ প্রকাশিত হয়েছিল এবং ইকরাম আজমের বই ‘পোয়েমস ফ্রম ফয়েজ’ (১৯৮২, নায়রং-এ-খায়াল পাবলিকেশনস) এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি এ কারণেই সম্ভব হয়েছিল, কারণ, ফয়েজ সাহেব একজন ‘সাব রিপোর্টারের’ জন্যও সময় দিতে রাজি ছিলেন। -আনোয়ার ইকবাল

আনোয়ার ইকবাল : বলা হয়, আপনি নিজেকে সবসময়ই দেশের লোকদের সঙ্গে পরিচয় দেন। কিন্তু যখনই তারা কোনো সমস্যায় পড়েন আপনি তাদের ছেড়ে চলে যান?

কবি ফয়েজ আহমেদ : আপনি যদি এটা বলতে চান যে, আমি রাজনৈতিক দৃশ্যগুলো থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছি, তাহলে বিষয়টি একটু অন্যরকম। আসলে অতীতে আমি রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলাম; কিন্তু এখন ছেড়ে দিয়েছি। মূলত আমি একজন কবি, রাজনীতিবিদ নই। তবে জনগণের প্রতি আমার ভালোবাসা সবসময়ই আছে। দেশের জনগণের যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমি উদ্বিগ্ন হই। সর্বদাই আমি তাদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছি। অভিন্ন ও সাদৃশ্য রেখেছি। আমি আমার জনগণ ও আমার দেশ নিয়ে গর্বিত। আমি তাদের ছেড়ে যাইনি। কখনও ছাড়বও না।

আনোয়ার ইকবাল : তাহলে পাকিস্তানে না থেকে বৈরুতে কেন বসবাস করছেন?

কবি ফয়েজ আহমেদ : হ্যাঁ, কিন্তু কয়েক লক্ষ পাকিস্তানি তো দেশের বাইরে বসবাস করছেন। কেউ বলতে পারবে না তারা পাকিস্তানকে ভালোবাসে না। আমি বৈরুতে চাকরি নিয়েছি। আমাকে একটি সাময়িকী ‘লোটাস’ পত্রিকার সম্পাদক করা হয়েছে এবং এটি আমার দায়িত্ব। এজন্যই আপাতত বৈরুতে অবস্থান করছি।

আনোয়ার ইকবাল : কবে নাগাদ পাকিস্তানে ফিরে আসবেন?

কবি ফয়েজ আহমেদ : অদূর ভবিষ্যতে। তবে দ্রুতই আমি বৈরুতে ফিরে যাব। ‘লোটাস’-এর জন্য কোনো একটা বিকল্প ব্যবস্থা করব এবং তখনই কেবল আমি ফিরে আসতে পারব।

আনোয়ার ইকবাল : আপনার সর্বশেষ পাকিস্তান সফরের সময় কী ঘটেছিল?

কবি ফয়েজ আহমেদ : খুব বেশি কিছু নয়। করাচি বিমানবন্দরে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। ‘টোকিও লেখক সম্মেলনে’ যোগ দেয়ার পথে, ওখানে আমার এক রাতের জন্য যাত্রা বিলম্বিত করতে হয়। পরে মীর আলী আহমেদ তালপুর এবং অন্যদের মধ্যস্থতায় সেখানেই বিষয়টির মীমাংসা হয়ে যায় এবং আমি আমার পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাই।

আনোয়ার ইকবাল : ভিয়েতনাম বা প্যালেস্টাইন বিষয়ে কথা বলার সময় আপনি খুব স্পষ্টবাদী হলেও কাশ্মীর সম্পর্কে সমান সরব নন বলে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এটা কি সত্যি?

কবি ফয়েজ আহমেদ : কে বলে কাশ্মীর সম্পর্কে আমার বক্তব্য স্পষ্ট নয়! সমান সরব নই! পাকিস্তান টাইমসে ‘কাশ্মীর’ সম্পর্কে যেসব সম্পাদকীয় আমি লিখেছি, সেগুলো দেখুন। দেখুন সেসব লেখায় আমার অবস্থান বা ভাবনা কি? সেখানে কাশ্মীর ইস্যুতে আমি কতটা উচ্চকিত ছিলাম? হ্যাঁ, ভিয়েতনাম ও ফিলিস্তিন বিষয়ে আমি ভিয়েতনামের পক্ষে সমর্থন দিয়েছি এবং ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করি। আন্তর্জাতিক এ ইস্যুগুলোতে আমার অবস্থান নিয়ে আমি গর্বিত।

আনোয়ার ইকবাল : সাম্প্রতিক অতীতে পাকিস্তানে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে, আপনি কি আপনার কবিতায় এ ঘটনাগুলো প্রতিফলিত করেছেন?

কবি ফয়েজ আহমেদ : আমি আমার চারপাশে যা কিছু দেখি, যা সম্পর্কে পড়ি; সেসব উপলব্ধি করি এবং আমার স্মৃতিতে সংরক্ষণ রাখি। এসব পরে আমার কবিতায় প্রতিবিম্বিত হয়। আমার সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘মেরে দিল, মেরে মুসাফির’ পুরোটাই পাকিস্তান, তার জনগণ এবং তাদের অনুভূতি সম্পর্কে। আমি অন্য সবার মতোই একজন পাকিস্তানি এবং নিজেকে কখনোই আমাদের জাতীয় জীবনের মূলধারার থেকে আলাদা মনে করিনি। এছাড়াও ‘হেকায়েত-ই-দিল’ নামে আমার কিছু কবিতা প্রকাশ হয়েছে। এর কবিতাগুলো কিছুটা নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; আর কিছু আমার দেশ সম্পর্কে।

আনোয়ার ইকবাল : আমাদের সময়ের কবি-সাহিত্যিকরা প্রকৃত যা দেখছেন বা উপলব্ধি করছেন; তা প্রকাশে খুব সতর্ক থাকছেন। মানে অপ্রিয় সত্য বা প্রকৃত প্রস্তাব প্রকাশে তারা কিছুটা চৌকস্যতা অবলম্বন করছেন। আপনি কি তাদের এ মনোভাবে সন্তুষ্ট?

কবি ফয়েজ আহমেদ : এ নতুন কিছু নয়। এটি একটি পুরনো ঐতিহ্য। যখনই পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়, আমাদের কিছু লেখক তাদের নিজস্ব জগতে আশ্রয় নেন। তারা তাদের কাল্পনিক মনোভাবের জন্য অনেক অজুহাত খুঁজে বের করেন। যেমন- ‘আর্টস ফর আর্টস সেক’ (শিল্পের জন্য শিল্প) এবং ব্যক্তিগত নন্দনতত্ত্ব। তবে কিছু লোক; খুব কম হলেও তাদের দায়বদ্ধতাটি সম্পাদন করে না এবং তারা হাবিব জলিবের মতো আরও বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে।

আনোয়ার ইকবাল : ‘আর্টস ফর আর্টস সেক’ বা শিল্পের স্বার্থের মনোভাবের জন্য ‘শিল্প’ সম্পর্কে আপনি কী বলেন?

কবি ফয়েজ আহমেদ : প্রকৃতই এমন হলে এতে কোনো সমস্যা নেই। সর্বোপরি এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক পরিবেশকে প্রতিফলিত করে এবং সেই সময়কালে সমাজের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মনোভাব সম্পর্কে কথা বলে। এটি কতটা বৈষয়িক তাতে কোনো সমস্যা নেই।

আনোয়ার ইকবাল : বর্তমানে আমাদের লেখকরা কি প্রকৃত সত্যটাই লিখছেন! এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

কবি ফয়েজ আহমেদ : এর কিছুটা সত্য এবং কিছুটা তা নয়। অবশ্য এটা সবকালেই এমন ছিল। কিছু রচনা ফ্যাশন হিসেবে লেখা হয়। কিছু জীবনের অভিজ্ঞতাকে ফুটিয়ে তোলে। আসলে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের সব লিখিত শব্দ কখনোই আসল বা প্রকৃত সত্য হয় না। এর কিছু কিছু বরাবরই অতিরিক্ত বা বাহুল্যপূর্ণ ছিল। মূলত এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হল, একজন কবি বা লেখকের স্বকীয়তা বা অন্তর্গূঢ় জাগ্রত হওয়া। অন্যের অনুকরণের পরিবর্তে নিজের অভিজ্ঞতাকে সৎভাবে প্রতিফলন করা তার কর্তব্য।

আনোয়ার ইকবাল : আপনি কি মনে করেন না যে, আমাদের উর্দু সাহিত্য কেবল কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং আগ্রহগুলোকেই প্রতিফলিত করে?

কবি ফয়েজ আহমেদ : দুর্ভাগ্যক্রমে এখন অবধি কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির লোকরাই উর্দুতে দক্ষ ছিলেন এবং সাহিত্য রচনা করতে পারেন। সুতরাং যে কারণে এটি একটি বিস্তৃত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। তবে উর্দুতে যা কিছু লেখা আছে তা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য অবশ্যম্ভাবীরূপে নয়। বিশ্বের সব মহান কবিরা শ্রমজীবী ?শ্রেণির ছিলেন না। এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, লেখক কোনো শ্রেণির অন্তর্গত! বরং তিনি কী লিখছেন এবং তিনি কী বিশ্বাস করেন তাই গুরুত্বপূর্ণ।

আনোয়ার ইকবাল : আপনি কি বিশ্বাস করেন না যে, উর্দুতে যা লেখা আছে তা জনসাধারণের প্রতি কমিউনিকেটেড না!

কবি ফয়েজ আহমেদ : না, এটা ভুল। এখন সবাই, এমনকি শ্রমিক শ্রেণির লোকরাও উর্দু শিখছে এবং সেই ভাষায় যা লেখা আছে তা শিক্ষিত এবং নিম্নশিক্ষিত উভয় শ্রেণিকেই জানানো হয়েছে। তাছাড়া এটি নিরক্ষরদের মাঝেও পৌঁছেছে।

আনোয়ার ইকবাল : তবে উর্দুতে যা লেখা আছে তা বুলিহ শাহ, শাহ লতিফ বা রহমান বাবার কবিতার মতো জনসাধারণের মাঝে জনপ্রিয় হতে পারে না। আপনি কি এ ব্যাপারে একমত নন?

কবি ফয়েজ আহমেদ : ঠিক আছে, সবসময়ই দুটি কণ্ঠস্বর এসেছে। কেবল আমাদের সাহিত্যেই নয়, বরং সব জায়গাতেই। যেখানে তাদের উৎকণ্ঠিত মনোভাব আমাদের মতোই একই রকম সামাজিক সেটআপ ছিল। সেখানে একজন জনসাধারণের প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং অন্যটি আদালত। এমনকি আদালতেও সাধারণ মানুষের জীবন প্রতিফলিত হয়। শুধু বাগ্বৈশিষ্ট্যটাই আলাদা। যখনই সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল এবং আদালত ছিল, ক্লাসিকের ভাষা কথ্য ভাষা থেকে উন্নীত হয়েছিল। কবিতা নিজেই কথ্য ভাষা নয়। এটিও আনুষ্ঠানিকভাবে হয়। কেবল বুলিহ শাহ এবং ওয়ারিস শাহ’ই জনগণ নয়। জনসাধারণের সিংহভাগ কবিতার ব্যাপারে সর্বসম্মত। তাছাড়া শিল্পের অন্যান্য রূপ সম্পর্কেও একই কথা বলা যেতে পারে। লোকশিল্পের প্রকাশ সর্বদা সামাজিক শিল্পের চেয়ে পৃথক। তবে এটি সম্প্রদায় বা মত প্রকাশের সামগ্রীকে অতিক্রম করে না। বেশ কয়েকটি জিনিস সর্বদা সমান এবং একে অপরকে ঢেকে রাখে। তবে যাইহোক, সাধারণত প্রভাবশালী শ্রেণির সংস্কৃতি প্রাধান্য পায় এবং সে কারণেই আমরা একে ক্লাসিক বলি। অন্যথায় লোকশিল্পও নিজস্ব শৈলীতে একটি ক্লাসিক।

আনোয়ার ইকবাল : প্রচলিত আছে, আমাদের কবি ও লেখকরা যা লিখেছেন তা পাকিস্তানের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?

কবি ফয়েজ আহমেদ : এটি আসলে ‘পাকিস্তানের আদর্শ সম্পর্কে’ কী চিন্তা করে তার ওপর নির্ভর করে। এ সম্পর্কে প্রত্যেকেরই আলাদা ধারণা রয়েছে। যদি কেউ ধর্ম মানে, তবে কোনো পার্থক্য নেই। আমরা সবাই ইসলামে বিশ্বাস করি। যাইহোক, পার্থক্যটি বিশ্বাসের নয় বরং ব্যাখ্যার। এমন অনেক লোক আছেন যারা ইসলামকে বিভিন্ন উপায়ে ব্যাখ্যা করেন এবং যারা তাদের ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন তারা তাদের দৃষ্টিতে ভুল। প্রকৃতপক্ষে, তারা যে ব্যাখ্যাটি নিয়ে উদ্বিগ্ন; তা কিন্তু নয়। এটাই রাজনীতি এবং আপনি যখন রাজনীতির কথা বলেন, তখন মতামতের পার্থক্যটি খুব স্বাভাবিক।

আনোয়ার ইকবাল : আপনার সম্পর্কে আরও বলা হয় যে, আপনি পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী নন। এ ব্যাপারে আপনি কী মন্তব্য করতে চান?

কবি ফয়েজ আহমেদ : যারা বলে, তাদের যা ইচ্ছে বলুক। আমি কেবল পাকিস্তানের আদর্শেই বিশ্বাস করি না, আমি মনে করি, আমি যা লিখি তা সবসময়ই পাকিস্তানের আদর্শ অনুসারে থাকে। আমি এ মতাদর্শ থেকে কখনও পৃথক হইনি। তবে, পাকিস্তানের আদর্শ সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা যদি তাদের থেকে আলাদা হয় তবে এ ক্ষেত্রে আমি অপারগ।

আনোয়ার ইকবাল : উর্দুকে পাকিস্তানের ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ বলা হয়। এটি কি প্রকৃতই এর মৌল উদ্দেশ্যটি পূরণ করতে পারে নাকি এটিকে কোনো স্থানীয় ভাষা দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে হবে?

কবি ফয়েজ আহমেদ : আমরা উর্দু ছাড়া কিছু করতে পারি না। এটি একটি উন্নত ভাষা এবং প্রায় ৩০০ বছরের বিবর্তন প্রক্রিয়ার পর এ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যান্য ভাষাগুলো এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। তবে কিছু স্থানীয় ভাষা ভবিষ্যতে এ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে এবং উর্দু প্রতিস্থাপন হতে পারে; কিন্তু তা অদূর ভবিষ্যতে নয়।

আনোয়ার ইকবাল : আমাদের যদি একটি উন্নত ভাষার প্রয়োজন হয়, তবে উর্দুর চেয়ে বেশি উন্নত ইংরেজি কেন নয়?

কবি ফয়েজ আহমেদ : ইংরেজি কেবল তাদের দ্বারা কথিত; যারা একটি নির্দিষ্ট পটভূমি থেকে আসে এবং নির্দিষ্ট স্কুলে যায়। তারা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশও নয়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উর্দুকেই বুঝে।

আরও পড়ুন: চেঙ্গিস খান : মিথ ও মানুষ

 

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com