মৃত্যুঝুঁকি কমাবে ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বাড়বে সংক্রমণ

মৃত্যুঝুঁকি কমাবে ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বাড়বে সংক্রমণ

মৃত্যুঝুঁকি কমাবে ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বাড়বে সংক্রমণ

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম :: নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন গ্রহণের পরেও যে কারো মাঝেই কোভিড-১৯ সংক্রমণ হতে পারে। তবে যারা ভ্যাকসিন গ্রহণ করবেন তাদের সংক্রমণ মাত্রা হবে সীমিত ও একই সঙ্গে কমে আসবে মৃত্যুঝুঁকি। ভ্যাকসিন নেওয়ার তিন সপ্তাহ পরে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়তে থাকলেও সংক্রমণ এড়াতে হলে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন পর্যন্ত যে ভ্যাকসিনগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে তার কোনোটিতেই কোভিড-১৯ সংক্রমণ আর হবে না এমনটা এখন পর্যন্ত বলা হয় নি। যে কোনো ভ্যাকসিন একটা নির্দিষ্ট সময় পর থেকে কার্যকর হওয়া শুরু করে। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। আর এই ভ্যাকসিন নেওয়ার পর তিন সপ্তাহের মধ্যে যে কারও মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ পাওয়ার বিষয়টি তাই স্বাভাবিক। তবে সংক্রমণ কমিয়ে মৃত্যুঝুঁকি এড়াতে হলে ভ্যাকসিন নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার যে ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি গড়ে ১০০ জনের মাঝে ৭০ থেকে ৮০ জনকে নিরাপত্তা দেবে। ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এই সংক্রমণ এড়ানোর জন্য সবাইকে মাস্ক পরতেই হবে। একই সঙ্গে হাত ধোঁয়ার অভ্যাসের পাশাপাশি জনসমাগম এড়িয়ে চলাটাও জরুরি।

দেশে ভ্যাকসিন বিতরণ সংক্রান্ত কোর কমিটির সদস্য ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর বলেন, ‘ভ্যাকসিন নিলে কেউ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হবেন না, এমন কোনো নিশ্চয়তা এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা দেননি। ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ গ্রহণের ১৪ থেকে ২১ দিনের সময়সীমায় মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকে। ওই অ্যান্টিবডি তৈরি হলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তখন আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে। আর তাই ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে যদি কেউ আক্রান্ত হয় তবে সংক্রমণ মাত্রা হবে মৃদু। একই সঙ্গে ভ্যাকসিন গ্রহীতা ব্যক্তির মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ হলেও মৃত্যুঝুঁকির পরিমাণ কমে আসে।’

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস আক্রান্তদের মাঝে তারাই সবচাইতে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে যাদের অন্যান্য রোগে আক্রান্ত বা উপসর্গ আছে। এমন ব্যক্তিদের দ্রুতই ভ্যাকসিন নেওয়ার প্রয়োজন। কারণ তারা ভ্যাকসিন নিলে আক্রান্ত হলেও সংক্রমণ পরবর্তী জটিলতা কম মাত্রায় হবে। সংক্রমণ হলেও তাদের মৃত্যুঝুঁকি কমে আসবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে সারা পৃথিবীতে যেটা দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণ ঘটলেও সেটা মৃদু বা মাইল্ড ইনফেকশন। এক্ষেত্রে বলা যায় সংক্রমিত ব্যক্তির মাঝে জটিল উপসর্গ কম দেখা দিতে পারে। কেউ যদি আশা করে ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর থেকেই আর কখনো করোনা আক্রান্ত হবে না সেটা বিশাল ভুল হবে। কারণ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরই যে ভ্যাকসিন কাজ করা শুরু করবে বা কারও মাঝে সংক্রমণ পাওয়া যাবে না এমন নিশ্চয়তা কিন্তু কোথাও কোনো বিজ্ঞানীরা দেননি।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান খসরু বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন যে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হচ্ছে সেটার কাগজে কলমে এখন পর্যন্ত যে গবেষণা ফলাফল তাতে দেখা গেছে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়া থেকে শুরু করে প্রথম ২১ দিন পর্যন্ত যেকোনো ব্যক্তির ১০০ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’

তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন গ্রহণের পরে যদি কেউ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে তা মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনবে। তবে সেটিও কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। কাগজে কলমে গবেষণা ফলাফলে জানানো হয়েছে প্রথম ডোজ নেওয়ার পরে একজন ব্যক্তির সুরক্ষা পাওয়া শুরু হবে যেটি ৯০ দিন পরে সর্বোচ্চ মাত্রায় যাবে। এই ৯০ দিনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় ডোজ নেবেন।’

তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত যে গবেষণা ফলাফল পাওয়া গেছে তা দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ পরে দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ করা উচিত। বাংলাদেশে যেহেতু আট সপ্তাহ পরে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে তাই বলা যায় সেটি নেওয়ার দুই সপ্তাহ পরে তার মধ্যে একটা সুরক্ষা বলয় তৈরি হবে।’

দেশে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ভ্যাকসিন নেয়ার পর পরই তা কাজ শুরু করবে এমন ধারণা সঠিক না। ভ্যাকসিন শুধুমাত্র শরীরে ভালো প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে কাজ করে। তবে সেটি একটা নির্দিষ্ট সময় পরে তৈরি হয়। ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেয়ার ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে ব্যক্তির শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকে। আর এই অ্যান্টিবডি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু কোন মাত্রায় অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে সেটি কিন্তু সবার ক্ষেত্রে একই মাত্রার নাও হতে পারে। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে যদি কেউ কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়ে থাকেন তবে সেটি ক্ষতির মাত্রা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনবে।’

তিনি বলেন, ‘করোনার জীবাণু শরীরে প্রবেশের পরে যদি কেউ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেন সেক্ষেত্রে সেটি কাজ নাও করতে পারে। কারণ ভাইরাসটি প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যকর থাকে। আর এই সময়ে তাই সংক্রমণ হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে সংক্রমণ হলেও সেটি মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনবে। তবে ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করলে সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু কারো শরীরে যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে বা অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে থাকে তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু সেটি হতে পারে ১০ হাজারের মধ্যে একজন আক্রান্ত হওয়ার মতো।’

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কার্যকরী সদস্য ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ বা ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে কেউ করোনা আক্রান্ত হবে না, এমনটা পুরো বিশ্বে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণায় প্রমাণিত হয়নি। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে দুই ডোজ ভ্যাকসিনের মাঝে দ্বিতীয়টি নেওয়ার দুই সপ্তাহ পর থেকে সর্বোচ্চ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়ার পরে কিছুটা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। কিন্তু তার কারণে সংক্রমণ প্রতিরোধ হয় না। বিশেষ করে তিন সপ্তাহের আগে তো কোনোভাবেই সংক্রমণ প্রতিরোধ হয় না। এরপর যেটি হয়, সেক্ষেত্রে দেখা যায় যে হয়তো আক্রান্ত ব্যক্তির হাসপাতালে যাওয়ার ঝুঁকি কমে আসবে। এক্ষেত্রে বলা যায় মৃত্যুঝুঁকিও কমে আসে এই সময়ে। কিন্তু তার আগে কিন্তু ঝুঁকি থেকেই যায়। সবচেয়ে ভালো অ্যান্টিবডি তৈরি হয় ভ্যাকসিনের দুই ডোজ নেওয়ার দুই সপ্তাহ পরে। আর তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি কিন্তু মেনে চলতেই হবে।’

যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের ইনকিউবেশন সময় (সুপ্তাবস্থা) হচ্ছে পাঁচ থেকে ১৪ দিন। অর্থাৎ ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার বা সংক্রমণের এই সময়সীমা পরে কোভিডের লক্ষণ প্রকাশ পায়। ভ্যাকসিন নেওয়ার সময় অনেকেই করোনায় সংক্রমিত থাকতে পারে, যার লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে ভ্যাকসিন দেওয়ার ৫-১৪ দিন পরে। আবার ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়ার ১০ থেকে ১২ দিনের ভেতরে কেউ ভাইরাসে সংক্রমিত হলে তার ভেতরেও কোভিডের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কারণ ভ্যাকসিন প্রদানের পরে প্রথম ১০-১২ দিন রক্তে এন্টিবডির (ইমিউনোগে¬াবিউলিন-জি) পরিমাণ থাকে অপর্যাপ্ত। তবে, ভ্যাকসিন দেওয়ার ১২-১৪ দিন পরে যদি কেউ ভাইরাসে সংক্রমিত হন, তাহলে ভ্যাকসিনে কিছুটা সুরক্ষা পেলেও পেতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে গবেষণা, তাতে দেখা গেছে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়ার পরে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত ৭৬ শতাংশ সুরক্ষা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জনকে টিকা দিলে ২৪ জনের কোভিড হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কোনো ভ্যাকসিনই শতভাগ প্রতিরক্ষা দেয় না। কোভিশিল্ডের ক্ষেত্রেও তাই ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরের ২১ দিন সময়ে যে কেউ কোভিড-১৯ সংক্রমিত হতে পারে। ২১ দিনের পরে গিয়ে অ্যান্টিবডি গঠন শুরু হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি কারো শরীরে কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ কম থাকে, তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন কাঙ্খিত সুরক্ষা নাও দিতে পারে। তবে, সেই সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। তাই, পত্রিকার খবর দেখে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। কোভিশিল্ড একটি কার্যকর ভ্যাকসিন। এর দুটি ডোজ নিলে কোভিড থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে ৮৩ শতাংশ। প্রথম ডোজ দেওয়ার ১২ সপ্তাহ পরে এই সুরক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু এই ভ্যাকসিন নেওয়াটা জরুরি যেন খুব দ্রুত সবার মাঝে সে অ্যান্টিবডিটা তৈরি হয়। এতে সংক্রমণের মাত্রাটা কমে আসে এবং মৃত্যুঝুঁকিও কমে আসে।’

উল্লেখ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত তিনটি ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে সবার আগে ফাইজারের ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে মার্কিন কোম্পানি মডার্নার উদ্ভাবিত করোনার ভ্যাকসিন অনুমোদন দেওয়া হয়। সর্বশেষ অনুমোদন পেয়েছে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটও তৈরি করছে। সিরাম ইনস্টিটিউটের এই ভ্যাকসিন বাংলাদেশে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় ভাবে প্রয়োগ শুরু হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *