মৎস্যখাতের উন্নয়নে নারী
আসাদুজ্জামান রিপন
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। মৎস্যখাত কৃষিখাতের একটি প্রধান উপখাত হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে। দেশের ১৪ লাখ নারী ও শিশুসহ প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্যখাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে বাগদা চিংড়ির পোনা আহরণ অর্থ উপার্জনের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম। উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি পোনা সংগ্রহকারী শ্রমশক্তির শতকরা ৮০ ভাগই নারী।
শুধু চিংড়ি পোনা সংগ্রহই নয়, মৎস্যখাতে নারীরা উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিং, জামালপুর জেলার কয়েক লক্ষ্য নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে গৃহস্থালী কাজের পাশাপাশি মাছের শুঁটকি তৈরি, সংরক্ষণ এবং বিক্রি করে বাড়তি আয় করছে। নারীরা মাছ চাষেও ব্যাপকভাবে এগিয়ে এসেছে। বাড়ির নিকটবর্তী ছোট পুকুর বা ডোবা, ধানক্ষেত এবং বড় পুকুরে খাঁচায় মাছ চাষ করছে নারীরা। বাড়ির কাছে ছোট ডোবায় পানিতে মাছ এবং উপরে মাচা বানিয়ে হাঁস চাষ করেও সফল হচ্ছেন তারা। উপকূলীয় জেলাগুলোতে ব্যাপকভাবে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। কাঁকড়া চাষের সাথে জড়িতদের বেশিরভাগই নারী। এছাড়া সরাসরি মৎস্য উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য উৎপাদন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নানাকাজে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। মৎস্য শিকারের জাল বুনা, মৎস্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিক্রয় প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের জরিপ মতে, মৎস্যখাতে শ্রমশক্তির শতকরা ৩৬ ভাগ নারী। নারীরা দেশের মৎস্যখাতকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং পরিবার ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন।
এক সময় নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওড় ইত্যাদি জলাশয় ছিল নানা প্রজাতীর দেশীয় মাছের প্রধান আবাসস্থল। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ৯০ ভাগ আহরিত হতো এ সকল জলাশয় থেকে। ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বসতি স্থাপন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পের প্রসার, কৃষির আধুনিকায়নে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং মনুষ্যসৃষ্ট বহুবিধ কারণে এসব প্রাকৃতিক জলাভূমি ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। ফলে বর্তমানে ঐ সকল জলাশয় থেকে মৎস্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্ধিত চাহিদার যোগান দিচ্ছে চাষকৃত মাছ। বাজার মূল্য এবং পুষ্টিকর খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মৎস্যচাষ একটি লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে অসংখ্য আধুনিক এবং বাণিজ্যিকভাবেও মৎস্য খামার গড়ে উঠছে। বর্তমানে কৃষি ফসলের সাথে মৎস্যচাষের একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। সারাদেশের ভরাট হয়ে যাওয়া অসংখ্য সরকারি খাস জলাশয়সমুহ পুকুর, দিঘি, মৃতপ্রায় নদী, বিল, হাওড় ইত্যাদি সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ করে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন অব্যবহৃত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। আবার জলাশয়ের নির্মিত পাড়ে বিকল্প কর্মসংস্থান হিসাবে ফলজ বৃক্ষরোপনসহ নানা ধরনের শাক সবজি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রবাদ আছে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্য। বাঙালিদের প্রতিদিনের খাদ্যশক্তির ৭৫ ভাগ যোগান দেয় ভাত। আর ভাতের সাথে এখনো আমাদের প্রধান সম্পূরক খাবার মাছ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ২৩০ টি নদী, শত শত হাওর-বাওড়, খাল-বিল মৎস্য সম্পদে ভরপুর। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের ৩ দশমিক ৭৭ ভাগ এবং কৃষি জিডিপি’র ২৫ দশমিক ৩০ ভাগ আসে মৎস্যখাত থেকে। দেশের মানুষের মোট প্রাণীজ আমিষের ৬০ ভাগ যোগান দেয় মাছ। দেশের মৎস্যখাত দুটি ভাগে বিভক্ত- অভ্যন্তরীণ ও সামুদ্রিক মৎস্য। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে উন্মুক্ত মৎস্য আহরণের অবদান ছিল ২৮ দশমিক ৪৫ ভাগ, চাষের মৎস্যের অবদান ৫৬ দশমিক ২৪ ভাগ এবং সামুদ্রিক মৎস্যের অবদান প্রায় ১৬ ভাগ। বিশ্ব খাদ্য এবং কৃষি সংস্থার ২০২০ সালের হিসাব মতে, বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় এবং অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষে বিশ্বে পঞ্চম।
পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস মাছ। সামুদ্রিক মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড এবং ভিটামিন ডি থাকে, যা শিশুদের স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। স্যামন, টুনা, সার্ডন, পোয়া, রূপচাঁন্দা, কোরাল ইত্যাদি মাছে প্রচুর পরিমাণ ওমেগা- ৩ ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়। তাছাড়া সামুদ্রিক মাছে প্রচুর আয়োডিন থাকে। আয়োডিনের অভাবে শিশুদের গলগ- রোগ, মানসিক প্রতিবন্ধিতাসহ নানাসমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার আয়োডিনের অভাবে গর্ভবতী মায়েরা নানারোগে আক্রান্ত হয়। তাই সামুদ্রিক মাছ নারী ও শিশুদের অনেক রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১, টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ঠ (এসডিজি) ও ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসাবে মৎস্যখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বৈশ্বিক করোনা ভাইরাস উত্তর বাংলাদেশে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ ও গ্রাম পর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বর্তমান সরকারের মূল নির্দেশনা হলো ‘দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি পতিত না রেখে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে হবে’। অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসাবে মৎস্য অধিদপ্তরাধীন উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্প অক্টোবর ২০১৫ হতে জুন ২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় সারাদেশের ৬১টি জেলার ৪৯টি উপজেলার মোট ২ হাজার ৫শত ৯৭দশমিক ৪৩ হেক্টর তালিকাভুক্ত পতিত/অব্যবহৃত বিভিন্ন জলাশয় পুনঃখননের মাধ্যমে মৎস্যচাষ উপযোগী করে সংস্কার করা হবে। ফলে ১০ হাজার ২ শত ৩৪ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনসহ প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে খননকৃত জলাশয়ে ১০ হাজার ৬০০ জন সুফলভোগীকে সংগঠিত করে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব মাছ চাষের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। দেশব্যাপী চলমান এ প্রকল্পটি মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী এবং সরকারের প্রণোদনা বাংলাদেশে মৎসখাতে সফলতার মূল কারণ। এছাড়া হাওড় ও বিলে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ, মা ইলিশ রক্ষা, মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করাতে বড় সাফল্য এসেছে। প্রজনন মৌসুমে ৬৫ দিন মৎস্য শিকার বন্ধ রাখা, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার মাধ্যমে মা মাছ রক্ষা করা হচ্ছে। মা ইলিশ রক্ষায় সরকার অনেকটা সফল হয়েছে। ফলে প্রচুর বড় ইলিশ বাজারে আসছে। জলাশয়ে ডালপালা দিয়ে মাছের আশ্রয় তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে মাছ ডিম দিচ্ছে, বর্ষায় তা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। বিলুপ্ত প্রায় মছের ওপর গবেষণা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে বড়ছে মাছ উৎপাদন।
গত ১০ বছরে মৎস্যখাতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মৎস্যখাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে। এ ইনস্টিটিউট থেকে ইতিমধ্যে মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ৬২টি লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ মৎস্য অধিদফতর এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছিল ৪৩ লাখ মেট্রিক টনে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মৎস্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে। খাদ্য এবং কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে প্রথম, যার পরিমাণ ৫ দশমিক ১৭ লাখ মেট্রিক টন। দেশ মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় গ্রামের সাধারণ মানুষ স্বল্পমূল্যে মাছ কিনতে পারছে, পুষ্টিও পাচ্ছে।
প্রচলিত মৎস্য উৎপাদনের পাশাপাশি অপ্রচলিত মৎস্যসম্পদ যেমন কুঁচিয়া, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, ইত্যাদি সংরক্ষণ ও চাষাবাদ কৌশল উন্নয়নে বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অপ্রচলিত মৎস্য পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের অপ্রচলিত মৎস্য রপ্তানির বড় বাজার চীন, জাপান ও ভিয়েতনাম। ফিস এক্সপোর্ট এসোসিয়েশন সূত্র মতে, বাংলাদেশ থেকে ইতালি, জাপান, কোরিয়া, চীন, জার্মানি, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকংসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মৎস্য রফতানি হচ্ছে। মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে গত অর্থবছরে ৪ হাজার ৩ শত ১০ কোটি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ।
মুজিববর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সরকারের নির্দেশনায় মৎস্য অধিদফতর দেশব্যাপী উন্নয়নমূলক নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। উক্ত কার্যক্রমের আওতায় নেত্রকোনা ও শরিয়তপুর জেলার দুটি গ্রামকে মৎস্যগ্রাম হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এ গ্রামের সকল জলাশয় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্য চাষের আওতায় আনা হয়েছে।
সরকারের মৎস্যখাতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, দারিদ্র্যবিমোচন, মৎস্যচাষি ও মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং কাক্সিক্ষত আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এ কার্যক্রমকে আরো বেগবান করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শীঘ্রই মৎস্যখাত দেশের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে জায়গা করে নিবে।


