১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৫ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

যদি দেওবন্দের মত প্রতিষ্ঠান এদেশে গড়ে উঠত

আমিনুল ইসলাম কাসেমী

আজকে ফরিদপুর অঞ্চলের প্রসিদ্ধ একটি মাদ্রাসার মোহতামিম সাহেবের সাথে বর্তমান দেশের কওমী মাদ্রাসার তালিম-তরবিয়ত সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ধরে কথা হলো। বাংলাদেশের কওমীধারার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে নানান আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। দেশের কোন প্রতিষ্ঠানের কী হালাত, কোন মাদ্রাসা কিভাবে চলে? সে সব বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে অনেক কথা বললাম।

শেষে উক্ত মোহতামিম সাহেব আফসোস করে বলেন, আমাদের কিছু উলামায়ে কেরাম আজ দেশের মাঝে বহু হম্বি-তম্বি করে থাকেন। তাদের কারণে এখন দেশের কওমী অঙ্গনের উপর এমন দুর্যোগ। উনারা এসব বাড়াবাড়ি না করে যদি এই জাতির জন্য ভাল কিছু দ্বীনি প্রতিষ্ঠান উপহার দিতে পারতেন, তাহলে উম্মতের বড় উপকার হত। কিন্তু উনারা এমন কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন, যার দ্বারা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের উপর তার রেশ গিয়ে পড়ল, যার দ্বারা বড় ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ল আমাদের কওমী শিক্ষাব্যবস্থা।

আরো অনেক মল্যবান কথা তিনি বলেছিলেন। আসলে একটু গভীর ভাবে যদি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আমাদের ঐসব খ্যাতিমান উলামায়ে কেরাম যদি দ্বীনি মাদ্রাসাকে নিয়ে বেশী ভাবতেন, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতি কামনা করতেন, তাহলে অনেক বেশি ফায়দা হত। এ জাতি সীমাহীন উপকৃত হত।

দেখুন! আমরা নিজেদের দেওবন্দী দাবী করি, আকাবির-আসলাফের যোগ্য উত্তরসুরী ভাবি। কথায় কথায় আমাদের মুখ থেকে দেওবন্দ বের হয়। দারুল উলূম দেওবন্দের ঐতিহ্য অবদানের কথা জাতির সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু আজ পর্যন্ত দেওবন্দের মত কোন প্রতিষ্ঠান আমরা এই বাংলাদেশের জমিনে কেউ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। শুধু মুখে মুখে দেওবন্দ আর দেওবন্দ।

বাংলাদেশে কিন্তু দেওবন্দ থেকে যোগ্য আলেম কম নেই। দেওবন্দের মত যোগ্য শিক্ষক, যোগ্য মুহাদ্দিস বহু গুজরান হয়েছে। তারপরেও দারুল উলূম যেরকম, দারুল উলূমে তালীমের সিষ্টেম, দারুল উলূমে ছাত্রদের কী ধরনের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়। দারুল উলূমে কিভাবে দরস দেওয়া হয়। সেখানে মেধা বিকাশের জন্য ছাত্রদের সাথে কী কী করা হয়। তার কোন কিছু আমাদের দেশে নেই।

আজও আমাদের দরসগাহ আলাদা হয়নি। যেখানে ক্লাস সেখানেই খাওয়া-ঘুম চলে। দু-একটা মাদ্রাসা হয়ত কিছুটা উন্নতি করেছ। তবে সারাদেশের মাদ্রাসার অবস্থা হলো ভিন্ন কোন ক্লাসের স্থান নেই। এক জায়গাতে সব কিছু। সবচেয়ে যেদিকে আমরা বেশী দুর্বল, সেটা হলো, দারুল উলূম দেওবন্দে একজন ছাত্রকে যে ধরনের ফ্যাসিলিটি দেয়, তার কিছুই আমাদের দেশে নেই। একজর শিক্ষার্থী কত ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে সেখানে লেখাপড়া করেন, তার কোন কিছু দিতে আমরা পারিনি।

আমাদের এই দেশে কিন্তু যোগ্য লোকের অভাব নেই। বহু যোগ্য মানুষ ছিল এবং এখনো আছে। তারপরেও কিন্তু শিক্ষার্থীরা দেওবন্দ মাদ্রাসার সেই সুবিধাগুলো পায় না। উলামায়ে কেরাম যদি ঐ রকম ভাবে চেষ্টা করতেন, তাহলে অসম্ভব কিছু নয়। ঐ আঙ্গিকে আমাদের দেশে বহু প্রতিষ্ঠানের জন্ম নিত। তারা যেরকম ভিন্ন লাইনে মেহনত করে অনেক এগিয়ে গিয়েছেন, এই লাইনে মেহনত করলে জাতির অনেক ফায়দা হত। দারুল উলূম দেওবন্দের মত প্রতিষ্ঠান এদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াত।

একটু লক্ষ্য করে দেখুন, দারুল উলূম দেওবন্দে ছাত্রদের কত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। একজন ইলম অন্নেষী ছাত্রের জন্য কত ভাবে তাবে মদদ করা হয়। আমার মনে হয় পৃথিবীতে এমন প্রতিষ্ঠান আছে কিনা আমার জানা নেই। দারুল উলূম দেওবন্দে ছাত্রদের জন্য যেসব ব্যবস্থাপনা রয়েছে তা নিম্নে দেখুন-

(১) ভর্তি ফ্রি।
(২) কিতাব ফ্রি।
(৩) খাওয়া ফ্রি।
(৪) পরীক্ষা ফ্রি।
(৫) থাকার সিটের সাথে আলমারির সুব্যবস্থা।
(৬) একদিনের যে কোনো ঔষধ এক রুপি।
(৭) প্রতি মাসে দুইশ রুপি ভাতা।
(৮) প্রতি সাপ্তাহে স্পেশাল বিরিয়ানি জন প্রতি এক কেজি।
(৯) শীত মৌসুমে গরম পানির সুব্যবস্থা।
(১০) শীত মৌসুমে কম্বল-লেপ ফ্রি।
(১১) ছাত্রদের জন্য রয়েছে দারুল উলূম কর্ত্তৃক স্টুডেন্ট কার্ড, যা সর্বত্র প্রয়োজনীয় ও গ্রহণযোগ্য। সফর-আসফারে বড় কা‌জের জি‌নিস।
(১২) অজু-গোসল ও শৌচাগারের সুব্যবস্থা।
(১৩) বৈদ্যুতিক ব্যবহার ফ্রি।
(১৪) সনদপত্র ফ্রি।
(১৫) রমযানে আরো উন্নত খাবার ও ডাবল ভাতা।
(১৬) প্রতিটি ছাত্রকে বার্ষিক পুরস্কার।
(১৭) মাঝে মধ্যে বিভিন্ন কিতাবাদি হাদিয়া।
(১৮) ছাত্ররা লিখনী শক্তি অর্জনের জন্য রয়েছে দেয়ালিকার সুব্যবস্থা।
(১৯) কথিত আছে যে حسن الكتابة نصف العلم তাই ছাত্রদেরকে সুন্দর হাতের লিখা শিখানোর জন্য রয়েছে কিতাবত বিভাগের সুব্যবস্থা।
(২০) ছাত্ররা যেন লেখাপড়ার সাথে সাথে কর্মে অভ্যস্ত হয়ে উঠে, এর জন্য রয়েছে কারিগরি শিক্ষার সুব্যবস্থা।
(২১) ছাত্ররা যেন সুশৃঙ্খলভাবে খানা ওঠাতে পারে, এর জন্য রয়েছে পিতলে নাম্বার অঙ্কিত সকাল-সন্ধার টিকেট।
(২২) ছাত্ররা যেন সুন্দরভাবে পরীক্ষা দিতে পারে, এর জন্য রয়েছে প্রত্যেক ছাত্রের জন্য আলাদা আলাদা ডেক্স। চিত্তাকর্ষক বিশাল দারুল ইমতেহান, যাতে এক সাথে প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্র পরীক্ষা দিতে পারে।
(২৩) ছাত্ররা মাসিক ভাতা ওঠানোর জন্য রয়েছে প্রতি মাসের নামসহ অযিফা কার্ড।
(২৪) ছাত্রদের যেন কোন ধরনের অসুবিধা না হয়, এ জন্য ছাত্রদের খেদমতের জন্য রয়েছে বিভিন্ন খেদমত বিভাগ। যেমন: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ ইত্যাদি।
(২৫) ছাত্র ও দারুল উলূমের রক্ষণাবক্ষেণের জন্য রয়েছেন প্রতিটি গেইটে দারোয়ান।
(২৬) ছাত্রদের ব‌ক্তৃতাশক্তি অর্জনের নিমিত্তে প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন বিষয়ের উপর সেমিনারের আয়োজন।
(২৭) ছাত্ররা বিরোধীদের সাথে কিভাবে মুনাযারা করবে, তা শিক্ষাদানের জন্য মাঝেমধ্যে বিশাল মুনাযারার আয়োজন।
(২৮) ছাত্ররা ইলম অর্জনের সাথে সাথে আমলে পাবন্দী হওয়ার জন্য সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনই আছরের পর কোন না কোন উস্তাদের ইসলাহী মজলিসের আয়োজন।
(২৯) ছাত্রদের চাহিদা অনুযায়ী কিতাব পড়ার জন্য সর্ববিষয়ের উপর দারুল উলূম লাইব্রেরী সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা।
(৩০) ভর্তীচ্ছুক পরীক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে থাকার সুব্যবস্থা।
(৩১) আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্স।
(৩২) দা’ওয়াত ইলাল্লাহ বা সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামের সহীহ আকিদা বিশ্বাস ও আমল পৌঁছে দেওয়ার নিমিত্তে দাওয়াত ও তাবলীগের সাপ্তাহিক ও বাৎসরিক বিভিন্ন কার্যক্রম।
(৩৩) এমন কি বহির্বিশ্বে দাওয়াতের কাজকে ব্যাপক করার জন্য বিশেষ কোর্সের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষার সুব্যবস্থা।
(৩৪) মেধাবী ছাত্রদের জন্য রয়েছে তানহা কামরা। (স্বতন্ত্র কামরা) যেখানে একাকী পড়বে। কেউ ডিষ্টার্ব করতে পারবে না।
(৩৫) ছাত্রদের যে খাবার দেওয়া হয়, সেটা সেখানকার পরিবেশ অনুযায়ী রাজকীয় খাবার। সকালে উন্নতমানের ঘন ডাল সাথে রুটি। বিকেলে মহিষের গোস্ত ও রুটি। সারা বছরই চলে।
(৩৬) ট্রেনে ভ্রমনের জন্য হাফ টিকিটের ব্যবস্হা। কন্সিশন ফরম পুরণ করে মাদ্রাসা থেকে অনুমতি নিয়ে গেলে পুরো ভারত হাফ টিকিটে ঘোরা যায়।
(৩৭) দারুল উলুমে ছাত্রাবাস ভিন্ন। ক্লাস রুমে কেউ থাকে না।

মোটকথা : কেউ যদি দারুল উলূমের হয়ে যায়, দারুল উলূম তাঁর হয়ে যায়। মানে দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হতে পারলে শান্তি আর শান্তি। কেউ সেখানে গেলে আর ফিরে আসতে মনে চায় না।

ঠিক ঐ রুপ সুযোগ-সুবিধা ছাত্রদের দিয়ে কোন দ্বীনি প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে দাঁড় করানো সম্ভব। বহু মহারথী আছেন এদেশে। যাদের বহু যশ-খ্যাতি। তারা ইচ্ছে করলে দারুল উলূম দেওবন্দের আদলে এদেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। অনেকে বলতে পারেন, দারুল উলূম দেওবন্দের সাথে কী আর তুলনা চলে? সেটা তো আকাবির-আসলাফদের পূণ্যভুমি। আরে ভাই অসম্ভব কিছু নয়। ঐ রকম পুরোপুরি সব দিকে থেকে যদি নাও হয়, তবে অধিকাংশ দিকগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব।

এদেশের জনতার মন-হৃদয় সবই আছে। সবই সহজে পরিণত হবে, যদি আমাদের আলেম সমাজ এগিয়ে আসেন। এজন্য মনের মধ্যে বারবার সাধ জাগে, যদি দেওবন্দের মত প্রতিষ্ঠান এদেশে গড়ে উঠত। আল্লাহ তুমি কবুল কর। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: রাজনীতিতে উলামায়ে দেওবন্দ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com