পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দুর্যোগের ঘনঘটা ছেয়ে বসেছে যমুনার উপকুলবর্তী এলাকাগুলোতে। চলতি মাসের শুরু থেকেই অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে যমুনার পানি। গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার মাত্র ৯৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে যমুনার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে অব্যাহত পানি বৃদ্ধির কারণে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন।
গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ২০টি গ্রামের ঘরবাড়ি, স্কুল, মাদ্রাসাসহ দুই শতাধিক স্থাপনা ও ৫০০ বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে ওই সব গ্রামের আরো কয়েক শতাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পয়েন্টে পানির বিপদসীমার মাপ হলো ১৩ দশমিক ৩৫ সেন্টিমিটার। গতকাল সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৩৮ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পায়। এর আগে গত শুক্রবার ১২ দশমিক ২০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপত্সীমার ৯৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির কারণে করতোয়া, ফুলজোড়, ইছামতী, হুরাসাগর, বড়াল, বিলসুর্য্য ও গুমানীসহ জেলার অভ্যন্তরীণ সব নদীতেও পানি বেড়েছে। এ অবস্থায় আগামী এক সপ্তাহে আরো প্রায় ৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে নদীভাঙন ও বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীরা।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এ সময় পানি বৃদ্ধি স্বাভাবিক ঘটনা। আর সব বাঁধ সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। বাঁধ ও পাড় ভাঙনরোধে নেয়া হয়েছে আগাম প্রস্তুতিও।
পাউবো সূত্র আরো জানায়, যমুনা নদীর ডান তীরে ৭৯ কিলোমিটার ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর থেকে কাজীপুরের মধ্যে পাটাগ্রাম এলাকায় ছয় কিলোমিটার এবং এনায়েতপুরের ব্রাহ্মণগ্রাম হাটপাঁচিল এলাকায় সাত কিলোমিটার ফাঁকা অংশ রয়েছে। এ ১৩ কিলোমিটার বাঁধই চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ পানি বৃদ্ধি বা কমার সময় এ অংশ বারবার ভাঙনের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার শাহজাদপুরে যমুনা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙনকবলিত গ্রামগুলো হলো শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরি ইউনিয়নের ভাটপাড়া, নতুন বাজার, গুদিবাড়ী, জগতলা, ঠুটিয়া ও হাটপাচিল, জালালপুর ইউনিয়নের পাকুরতলা, ভেকা ও বাঐখোলা। খুকনি ইউনিয়নের আরকান্দি ও ব্রাহ্মণগ্রাম, সোনাতুনি ইউনিয়নের ধীতপুর, শ্রীপুর, মাকড়া, সোনাতুনি, বড় চানতারা, বারপাখিয়া ও বানতিয়ার। চলতি মাসেই ওইসব গ্রামের দুই শতাধিক ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মসজিদ, ৫০০ বিঘা আবাদি জমি ও দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
কৈজুরি ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামের আলমাস হোসেন জানান, ভাঙনের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না। আটবার বাড়ি ভেঙেছে। প্রতিবারই সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আবারো যদি বাড়িঘর যমুনায় বিলীন হয় তবে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পরিষদের সাইফুল ইসলাম, জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ ও সোনাতুনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুত্ফর রহমান জানান, নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় স্রোত তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে শাহজাদপুরের যমুনা নদীর তীর এলাকায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। এ ভাঙনের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না তীর সংরক্ষণ বাঁধও।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল হক জানান, পানি বৃদ্ধির কারণে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। যেহেতু মাঠে বোরো ধান নেই এবং বাদামও ক্ষেত থেকে উঠে গেছে। তাই ফসলের খুব একটা ক্ষতি হবে না। তার পরও মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের পানি বৃদ্ধিজনিত ফসলের ক্ষতি নিরূপণে তালিকা করতে বলা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম রফিকুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহ ধরে যমুনা নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিপত্সীমার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। আগামী এক সপ্তাহে প্রায় ৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেভাবে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই ধারণা থেকে বন্যার আশঙ্কা করাই যেতে পারে।
তিনি আরো বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে। এ সময় পানি বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ জেলার সব বাঁধ গুরুত্ব দিয়ে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১৩ কিলোমিটার ফাঁকা অংশ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এতে ভয়ের কিছু নেই। বাঁধ ও পাড় ভাঙন রোধে আগাম প্রস্তুতিও নিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া এ ফাঁকা অংশে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণেরও পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এছাড়া শাহজাদপুরসহ জেলার নদীভাঙনকবলিত এলাকাগুলোয় ভাঙন রোধে বালির বস্তা, সিসি ব্লক ও জিও টেক্সপেপার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
/এএ


