১১ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৮শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৮শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি

যাকাত আদায়ের গুরুত্ব ও হিকমত

প্রথম পর্ব

মাহতাব উদ্দীন নোমান

যাকাত ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রোকন। ঈমানের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ইবাদত হলো নামাজ ও যাকাত। একজন ধনী মুসলিমের জন্য নামাজের মত যথাসময়ে যাকাত প্রদান করাও আবশ্যক। এই জন্য কুরআন মাজীদে বহু স্থানে একসাথে নামাজ ও যাকাতের আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা সালাত আদায় কর এবং যাকাত প্রদান কর। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য অগ্রে প্রেরণ করবে তা আল্লাহর নিকটে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সূরা বাকারা : ১১০)

সূরা মুজাম্মিলের ২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, ‘তোমরা নামায কায়েম কর ও যাকাত প্রদান করো। আর আল্লাহ পাককে কর্জে হাসানা দিতে থাকো (আল্লাহ পাকের রাস্তায় দান করতে থাকো।) তোমরা নিজেদের উপকারার্থে যা কিছু কল্যাণকর কাজ করে পাঠাবে, তা অবশ্যই আল্লাহ পাকের নিকট পাবে। (আর যা পাবে) তা হবে উৎকৃষ্ট এবং পুরস্কার হিসেবে মহত্তর।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতকে ইসলামের মূল পাঁচটি ভিত্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। (১) আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল এই বিষয়ে সাক্ষী দেওয়া। (২) নামাজ কায়েম করা। (৩) যাকাত প্রদান করা। (৫) হজ্ব পালন করা। (৬) রমজানের রোজা রাখা। (বোখারী ও মুসলিম)

ঈমান এবং নামাজের পরেই যাকাতের দাওয়াত দেওয়া এবং যাকাতের তালিম দেওয়ার নির্দেশ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুয়াজ বিন জাবালকে ইয়ামানের দিকে প্রেরণ করার সময় বললেন, তুমি সেখানে যখন আহলে কিতাবদের নিকট পৌঁছাবে তখন তাদেরকে একথা সাক্ষ্যদানের প্রতি আহ্বান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রাসূল। তারা যদি এই কথা মেনে নেয় তাহলে তুমি তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, আল্লাহ তা’আলা দিন রাতে তাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। তারা যদি এটা মেনে নেয় তাহলে তুমি তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর সদকাকে (যাকাতকে) ফরজ করেছেন, যা তাদের বিত্তবানদের থেকে গ্রহণ হবে এবং তাদেরই দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হবে। তারা যদি এটিও মেনে নেয় তাহলে (এই যাকাত উশুল করার সময় বেছে বেছে) তাদের উৎকৃষ্ট সম্পদ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকো। (বরং মধ্যম মানের মাল গ্রহণ করবে এবং এই ব্যাপারে তাদের ওপর বাড়াবাড়ি ও অবিচার করবে না) এবং মাজলুমের বদদোয়াকে ভয় করবে। কেননা তার মাঝে এবং আল্লাহ তায়ালার মাঝে কোন পর্দা (অন্তরায়) থাকে না। (বুখারী ১৪৯৬, মুসলিম ১৯)

যাকাত প্রদানের উপকারিতা : যাকাত ফরয করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, সমাজের দারিদ্রতা বিমোচন করা। সমাজের গরীব দুঃস্থ লোকদের অভাব অনটন দূর করা। এতিম ও বিধবাদের অসহায়ত্ব দূর করা। যাতে সমাজের প্রত্যেকটা ব্যক্তি নিজের পরিবার সহ সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। এর দ্বারা উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্তদের মাঝে একটি সুন্দর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। আর্থিক বৈষম্য সমাজ থেকে দূর হয়ে যায়। হযরত মুয়াজ রা. এর হাদিসের মধ্যেও এই দিকে ইশারা করা হয়েছে, ‘যা তাদের বিত্তবানদের থেকে গ্রহণ হবে এবং তাদেরই দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হবে।’

তাছাড়াও যাকাত প্রদানকারীর জন্য কোরআন এবং হাদীসে অনেক ফাযায়েলের কথা রয়েছে।

এক. যাকাতের প্রতিটা টাকার বিনিময় সাতশ নেকি দেওয়া হবে। উন্নত এখলাসের কারণে নেকির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের মাল ব্যয় করে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি শস্যবীজ, যা সাতটি শীষ উৎপন্ন করে, প্রতিটি শীষে একশটি দানা থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে বহুগুণ দিয়ে থাকেন। আল্লাহতালা প্রাচুর্যময়, মহাজ্ঞানী।’ (সূরা বাকারা ২৬১)

দুই. যাকাত দেওয়ার দ্বারা অবশিষ্ট মাল পবিত্র হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা যাকাত ফরজ করেছেন তোমাদের অবশিষ্ট মালকে পবিত্র করার জন্য।’ (আবু দাউদ ১৪৫২)

তিন. যাকাত দেওয়ার দ্বারা আর সম্পদ কমে না বরং সম্পদ আরো বৃদ্ধি পায়। ‘সদকা মাল থেকে কোন কিছু কমাতে পারে না।’ (মুসলিম ২৫৮৮)

‘হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুরের মূল্য পরিমাণ সদকা করে, এবং আল্লাহ তা’আলা তো শুধুমাত্র হালাল বস্তু গ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা ঐ সদকাকে নিজের কুদরতি হাতে গ্রহণ করেন। অতঃপর তাকে পাহাড়ের মত হওয়া পর্যন্ত সদকাকারীর জন্য প্রতিপালন করেন যেমনভাবে তোমরা উটের বাচ্চাকে প্রতিপালন করো। (বুখারী ১৪১০, মুসলিম ১০১৪)

যাকাত আদায় না করার ক্ষতি : ফরয হওয়া সত্ত্বেও যারা যাকাত আদায় করে না তারা কত বড় ক্ষতিগ্রস্থতার শিকার! যাকাতের সকল সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর আদেশ অমান্য করার কারণে তাদেরকে যে মর্মান্তিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে তাও কুরআন মজীদে বলে দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যা তোমাদেরকে দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তারা যেন কিছুতেই মনে না করে যে, এটা তাদের জন্য মঙ্গল। না, এটা তাদের জন্য অমঙ্গল। যে সম্পদে তারা কৃপণতা করেছে কিয়ামতের দিন তাই তাদের গলায় বেড়ি হবে। আসমান ও যমীনের স্বত্ত্বাধিকার একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যা কর আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবগত। (সূরা আল ইমরান : ১৮০)

আরও পড়ুন: রমজানের ফজিলত ও বরকত

হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু সে তার যাকাত দেয়নি কিয়ামতের দিন তা এমন বিষধর স্বর্পরূপে উপস্থিত হবে, অধিক বিষয়ের কারণে যার চুল পড়ে গিয়েছে এবং তার দুই চোখের উপর বিশেষ দাগ রয়েছে এবং তা তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার উভয় অধরপ্রান্তে (চোয়ালে) দংশন করবে এবং বলবে, আমিই তোমার ঐ ধন, আমিই তোমরা পুঞ্জিভূত সম্পদ।’ (বুখারী ১৪০৩)

অন্য এক আয়াতে যাকাত না দেওয়ার শাস্তি হিসেবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উল্লেখ করেন, ‘আর যারা স্বর্ণ-রুপা পুঞ্জিভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না, তাদেরকে মর্মান্তিক শাস্তির সুসংবাদ দিন। যেদিন দোযখের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তার দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে। (বলা হবে) ইহা ঐ সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জিভূত করে রেখেছিলে। সুতরাং তোমরা পুঞ্জিভূত সম্পদের স্বাদ উপভোগ করো। (সূরা তাওবা ৩৪, ৩৫)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে নিজেদের যাকাত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আদায় করার তৌফিক দান করুন। এই পবিত্র রমজান মাসে আমাদের রোজাগুলো, তেলাওয়াত, যাকাত, তারাবিগুলো তিনি যেন মেহেরবানী করে কবুল করেন। আমিন।

লেখক: খতীব ও শিক্ষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com