২৫শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

রমজানের ফজিলত ও বরকত

মাহতাব উদ্দীন নোমান

আল্লাহ তাআলা মানুষকে আধ্যাত্মিকতা ও পশুত্বের এক সমন্বিত রূপে সৃষ্টি করেছেন। সহজ ভাষায় বললে মানুষের মধ্যে ফেরেশতা চরিত্র ও পশু চরিত্রের এক সমন্বয় রয়েছে। তার চরিত্র ও মূল সৃষ্টিতে ওইসব যৌগিক চাহিদাও রয়েছে যেগুলো অন্যান্য পশুদের মধ্যেও থাকে। আবার সাথে সাথে তার সৃষ্টিতে আধ্যাত্মিকতা ও ফেরেশতা চরিত্রের ওই নূরানী উপাদান রয়েছে যা ঊর্ধ্বজগতে পবিত্র সৃষ্টি ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্য।

মানুষের এই আধ্যাত্মিকতা ও ফেরেশতা স্বরূপ উপাদান তার পশুসুলভ চরিত্রের উপর বিজয়ী থাকার উপর এবং তার এই পশুত্বকে একটি সীমারেখায় নিয়ন্ত্রণে রাখার উপর তার সৌভাগ্য ও চূড়ান্ত সফলতা নির্ভরশীল। আর এটা তখনই সম্ভব যখন পশুত্বের শক্তিটি আত্মিক ও ফেরেশতা শক্তির আনুগত্যে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং এর বিরুদ্ধে অবাধ্যতা না করে।

মানুষের পশু শক্তিকে তার ফেরেশতা শক্তির অধীনে রাখার পাশাপাশি আল্লাহর বিধি-বিধানের সামনে নফসের চাহিদা, উদর ও যৌবন তাড়নার দাবীকে পরাস্ত করার একটি অন্যতম উপকারী মাধ্যম হল রোজা। রোজা মানুষকে তার আভ্যন্তরীণ কুপ্রবৃত্তির (যা তাকে অন্যায় ও আল্লাহ তাআলার নাফরমানীতে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করে) তাড়না থেকে রক্ষা এবং শুদ্ধি করে। তাকে উন্নত আদর্শ এবং পবিত্র চরিত্রের অধিকারী বানায়। যেহেতু এই বিষয়টি শরীয়তের বিশেষ উদ্দেশ্য সমূহের অন্তর্ভুক্ত এইজন্য পূর্বেকার সকল শরীয়তেও রোজার বিধান ছিল। পূর্ববর্তী উম্মত সমূহকেও এই রোজার হুকুম দেওয়া হয়েছিল।

দিনের রোজার সাথে রাতের তারাবিহর বরকত যুক্ত হয়ে এই মাসের দীপ্তময়তাকে আরো বৃদ্ধি করেছে।

এই উম্মতকে রোজার নির্দেশ দিতে গিয়ে কুরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হলো যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া (খোদাভীতি) অর্জন করতে পারো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)

রোজার এই প্রভূত কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রেখেই তাকে ইসলামের মূল পাঁচটি রুকন বা ভিত্তিমূলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘হযরত ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন; ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের উপর। এক. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এর সাক্ষী দেওয়া। দুই. নামাজ কায়েম করা। তিন, জাকাত আদায় করা। চার, হজ করা। পাঁচ, রমজান মাসের রোজা রাখা।’ (বুখারী ও মুসলিম)

অতঃপর এই পবিত্র রোজার জন্য একটি পবিত্র মাস রমজানুল মোবারকের নির্বাচন করা হয়। এই মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে এবং এ মাসে হাজার মাস হতে উৎকৃষ্ট, অসংখ্য রহমত ও বরকত সমৃদ্ধ একটি রাত লাইলাতুল কদর রয়েছে। এছাড়াও এ মাসের দিনের বেলায় রোজার সাথে সাথে রাতের বেলায় একটি বিশেষ এবাদত এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যা তারাবিহ নামে আমাদের সমাজে প্রচলিত। দিনের রোজার সাথে রাতের তারাবিহর বরকত যুক্ত হয়ে এই মাসের দীপ্তময়তাকে আরো বৃদ্ধি করেছে।

এখানে পবিত্র রমজান মাসের ফজিলত সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো- ‘যখন রমজান মাস আসে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (বুখারি ৩২৭৭, মুসলিম ১০৭৯)

‘যখন রমজানের প্রথম রাতে আসে, তখন শয়তান ও দুষ্ট জিনদেরকে শৃংখলাবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং কোন দরজা খোলা রাখা হয় না। জান্নাতের সব দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং কোন দরজাই বন্ধ রাখা হয় না। একজন ঘোষণাকারী এই ঘোষণা দিতে থাকে “হে কল্যাণ প্রত্যাশী! তুমি সামনে অগ্রসর হও। আর হে মন্দের অন্বেষী! তুমি থেমে যাও। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক গুনাহগার বান্দা জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তি রয়েছে।” আর এটা রমজানের প্রতিরাতেই অব্যাহত থাকে।’ (তিরমিজি ৬৮২, ইবনে মাযাহ ১৬৮২)

কোন বড় জিনিস পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া সুন্দর হয় না। পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া আর কোন কাজ করলে তার সফলতা তো দূরের কথা, কোন কোন সময় তার দ্বারা অমঙ্গল হয়। রমজানের পরিপূর্ণ বরকত এবং রহমত পেতে হলেও আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান আসার পূর্বে সাহাবায়ে কেরামকে এই বরকত পূর্ণ মাসের পূর্ব প্রস্তুতি স্বরূপ ভাষণ দিয়েছেন। যাতে তারা পূর্বে থেকেই এই বরকত পূর্ণ মাসের পরিপূর্ণ বরকত ও সফলতা অর্জনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে।

হযরত সালমান ফারসী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাসের শেষ তারিখে আমাদের সামনে একটি ভাষণ দিলেন। এ ভাষণে তিনি বলেন :- হে লোকসকল! তোমাদের উপর একটি মহান বরকতময় মাস ছায়াপাত করেছে। এ মাসে একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ তাআলা এ মাসের রোজাকে ফরজ করেছেন আর রাতের কেয়ামকে তথা তারাবীকে নফল ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন কল্যাণকর কাজ (সুন্নত বা নফল ইবাদত) করবে, সে অন্য মাসের একটি ফরজ ইবাদতের সমান সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ আদায় করবে, সে অন্য মাসে ৭০ টি ফরজের সমান সওয়াব পাবে। এটা ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্যের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। এটা সহানুভূতির মাস। এ মাসে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন রোজাদারকে ইফতার করায়, তার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নাম থেকে তার মুক্তির ফায়সালা করে দেওয়া হয়। তাকে রোজাদারের সমান সওয়াব দান করা হয়, তবে এতে রোজাদারের সওয়াবের কোনো ঘাটতি আসবে না।

আমরা (সাহাবায়ে কেরাম) নিবেদন করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ !আমাদের সবার তো আর ইফতার করানোর মত সামর্থ্য নাই। তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহ তাআলা এই সওয়াব ওই ব্যক্তিকেও দান করবেন, যে কোনো রোজাদারকে একটি খেজুর বা এক চুমুক দুধ অথবা এক ঢোক পানি দিয়ে ইফতারী করিয়ে দেয়। আর যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে পেট ভরে আহার করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার হাউস থেকে এমন পানীয় পান করাবেন যে, জান্নাতে না যাওয়া পর্যন্ত তার আর কোন পিপাসাই হবে না। এটা এমন মাস যার প্রথম ভাগ রহমতের, মধ্যভাগ মাগফেরাতের আর শেষ ভাগ জাহান্নাম থেকে মুক্তির। যে ব্যক্তি এ মাসে নিজের গোলাম ও চাকরের কাজ হালকা করে দিবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দিবেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে দিবেন।

এই মাসে তোমরা চারটি কাজ বেশি বেশি করো। দুটি কাজ তো এমন, যার দ্বারা তোমরা তোমাদের প্রভুকে সন্তুষ্ট করবে। আর দুটি কাজ তো এমন, যা থেকে বিমুখ থাকার কোন উপায় নেই। যে দুটি আমল দ্বারা তোমরা তোমাদের প্রভুকে সন্তুষ্ট করবে তা হল; কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করা এবং ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর যে দুটি আমল থেকে বিরত থাকার কোন উপায় নেই তা হলো; তোমরা আল্লাহর কাছে জান্নাত চাবে এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাবে।’ (সহীহ ইবনে খুযাইমা ১৮৮৭, বাইহাকী ৩৬০৮, এই হাদীসের সনদ যাইফ। কেউ কেউ এই হাদিসকে মুনকার বলেছেন। তবে শুধুমাত্র ফজিলত সম্পর্কে এটি গ্রহণযোগ্য।)

যারা এই মাসে নিজেদের গুনাহকে ক্ষমা করাতে পারে নাই তারা হতভাগা ছাড়া আর কিছুই না।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অবশ্যই রমজান মাসের প্রতিদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক গুনাহগার বান্দা জন্য (জাহান্নাম থেকে) মুক্তি রয়েছে। এবং প্রতিদিন প্রত্যেক মুসলমানের একটি দোয়া অবশ্যই কবুল করা হয়।’

রমজান মাসে আল্লাহ তাআলার রহমত এবং ব্যাপক মাগফেরাত থাকা সত্বেও যারা এই মাসে নিজেদের গুনাহকে ক্ষমা করাতে পারে নাই তারা হতভাগা ছাড়া আর কিছুই না। তারা জিবরাঈল আ. এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদদোয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

হযরত কাব ইবনে উজরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা মেম্বারের নিকট উপস্থিত হও। অতঃপর যখন আমরা উপস্থিত হলাম প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেম্বারের প্রথম সিঁড়িতে আরোহন করে বললেন, আমিন। অতঃপর দ্বিতীয় শ্রেণীতে আরোহন করে বললেন, আমিন। তৃতীয় সিঁড়িতে আরোহন করেও বললেন, আমিন।

অতঃপর যখন মেম্বার থেকে নামলেন তখন আমরা বললাম, হে রাসুল! আমরা আজকে আপনার থেকে এমন একটা জিনিস শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনি নাই। তিনি বললেন, জিব্রাইল আ. এসেছিলেন, তিনি দোয়া করেছেন ; ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি, যে রমজান পেয়েছে কিন্তু (রমজানের সুযোগ লাভ করেও তার গুনাহ গুলো মাফ করানোর সাধনা করে নাই) তার গুনাহ মাফ হয় নি। তখন আমি বললাম, আমিন (হে আল্লাহ কবুল করো)। যখন আমি দ্বিতীয় সিঁড়িতে আরোহন করলাম তখন জিব্রাইল বলেছেন ; ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি, যার সামনে আপনার নাম আলোচনা হয়েছে কিন্তু সে আপনার উপর দরুদ পড়ে নাই। তখন আমি বললাম, আমিন (হে আল্লাহ কবুল করো)। অতঃপর যখন আমি তৃতীয় সিঁড়িতে আরোহন করলাম তখন জিবরাইল বলেছেন ; ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে বা তাদের একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল অথচ সে (তাদের সেবা যত্ন ও খেদমত করে) জান্নাতের ব্যবস্থা করে নাই।’ (আত তারগীব ওয়াত তারহীব ১৪৮৩)

আরও পড়ুন: রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক নিগূঢ়

রমজান একদিন একদিন করে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন নিজের গুনাহগুলো ক্ষমা করানোর পূর্ণ চেষ্টা করতে হবে। এই ফজিলতপূর্ণ মাসের কোন একটা মুহূর্ত যেন আমাদের অলসতায় এবং উদাসীনতায় না কাটে সেই দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে এই রমজান মাসের বরকত, মাগফিরাত এবং নাজাত অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: খতীব ও শিক্ষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com