রাজস্ব বাড়াতে নিরীক্ষায় জোর এনবিআরের

রাজস্ব বাড়াতে নিরীক্ষায় জোর এনবিআরের

নিজস্ব প্রতিবেদক : আগামী অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে দুই লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে করের হার ও আওতা না বাড়িয়ে উল্টো ছাড় দেয়া হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। রাজস্বের বড় লক্ষ্য অর্জনে তাই ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে এনবিআর। এর অংশ হিসেবে নিরীক্ষার মাধ্যমে কর ফাঁকি বন্ধ করতে চায় সংস্থাটি। এজন্য নিরীক্ষার ওপর জোর দিয়ে অর্থবিলে বেশকিছু আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এনবিআর বলছে, ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়ে ও নিরীক্ষার বাইরে থেকে প্রতি বছর বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এটা বন্ধে এবার নিরীক্ষার আওতা বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাবিত অর্থবিলে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে নির্দিষ্ট মান অনুসরণের নির্দেশনা এসেছে। একই সঙ্গে নিরীক্ষার জন্য তথ্যপ্রাপ্তিতে  ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), স্টক এক্সচেঞ্জ, যৌথ মূলধনি কোম্পানিগুলোর নিবন্ধনের কার্যালয় (আরজেএসসি), অ্যাকাউন্টিং ফার্ম ও ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিকে বাধ্য করার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে এনবিআর যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নিরীক্ষার জন্য তথ্য চাইতে পারবে।

বর্তমানে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে আয়কর ফাইল নিরীক্ষা করা হয়। একটি কর অঞ্চলে যতসংখ্যক ফাইল থাকে, তার ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত নিরীক্ষা করা যায়। এর বাইরে এনবিআর চাইলে যেকোনো সময় করদাতার ফাইল নিরীক্ষা করতে পারে। আগের বছরের চেয়ে কম আয় দেখানো, নিয়মিত রিটার্ন জমা না দেয়া ও আয় গোপন করলে এ নিরীক্ষা করা হয়। একজন করদাতার ফাইল সাধারণত চার বছর পর নিরীক্ষার আওতায় আনতে পারে এনবিআর। তবে আগামী অর্থবছর থেকে এ নিরীক্ষার আওতা বাড়ানো হচ্ছে। কোনো কোম্পানি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সমবায় সমিতি উেস কর না দিলেই তাদের বাধ্যতামূলক নিরীক্ষার আওতায় আনা হবে। কোনো চাকরিজীবী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে বাধ্যতামূলক নিরীক্ষা চালানো হবে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানে। আয়কর-সংক্রান্ত মামলায় প্রতিষ্ঠানের জবাব সন্তোষজনক না হলেও সেখানে পুনর্নিরীক্ষার ব্যবস্থা যোগ করা হয়েছে এবারের অর্থবিলে। অন্যদিকে ভ্যাট আইন সংশোধন করে নিরীক্ষার তথ্য নিতে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সব নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বাধ্য করা হয়েছে। নিরীক্ষায় ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়নে আন্তর্জাতিক মানদ- অনুসরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

এনবিআরের করনীতির প্রথম সচিব শব্বির আহমেদ বলেন, মানুষের ওপর নতুন করে করের বোঝা না চাপিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য অনেক প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। এনবিআরের নিরীক্ষা কার্যক্রম সীমিত হওয়ার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকির সুযোগ পায়। আমাদের দেশে যে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও করদাতা রয়েছেন, তারা ঠিকমতো কর দিলেই কর জিডিপি অনুপাত অনেক বেড়ে যাবে। এবারের অর্থবিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে কর আহরণে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের ৮২ বি ও সি ধারা সংশোধন করে উেস করের রিটার্ন দাখিল না করা সব প্রতিষ্ঠান এবং যেসব চাকরিজীবী আয়কর রিটার্ন নির্দিষ্ট সময়ে জমা না দেবেন, তাদের প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক নিরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। একই আইনের ৩৫ ধারা সংশোধন করে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে নির্দিষ্ট মানদ- নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ৩৫ (আই) ধারা অনুযায়ী এখন থেকে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে এনবিআরের কাছে আর্থিক প্রতিবেদন দাখিল করতে গেলে তা অবশ্যই বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (বিএএস), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (বিএফআরএস), ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএফআরএস) অনুসরণ করতে হবে। তা না হলে আর্থিক প্রতিবেদন গ্রহণ করবে না এনবিআর।

১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের ১৬৬ নং ধারা সংশোধন করে আর্থিক প্রতিবেদন ও রিটার্নে ভুল তথ্য দিলে শাস্তির বিধান আরোপেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১৬৯ নং ধারা সংশোধন করে কর কমিশনারের নিরীক্ষার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষমতাবলে একজন কমিশনার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আলোকে যেকোনো কোম্পানির রিটার্ন নিরীক্ষা ও পুনর্নিরীক্ষার সুযোগ পাবেন।

এদিকে আয়করের পাশাপাশি ভ্যাটের ক্ষেত্রেও নিরীক্ষার পরিধি বাড়িয়েছে এনবিআর। অর্থবিল ২০১৮তে মূসক আইন, ১৯৯১-এর ২৪(১)(ডি) ‘কর্তৃপক্ষকে সহায়তা’ শীর্ষক ধারায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্টক এক্সচেঞ্জ, বিএসইসি, আরজেএসসি, হিসাব ও নিরীক্ষা ফার্ম এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। ফলে এখন থেকে মূসক কর্মকর্তারা আগের চেয়ে বিস্তৃত পরিসরে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। কোম্পানির পক্ষ থেকে দেয়া তথ্যের সত্যতাও যাচাই করতে পারবেন তারা। একই আইনের ধারা ৪০-এর দফা (খ) সংশোধন করে পণ্য বা সেবা বাজেয়াপ্তকরণ ও কর ফাঁকি রোধ করতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। এতে কাস্টমস, এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের বিভাগীয় কর্মকর্তা ও রাজস্ব কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কমিশনারদের নিরীক্ষাকালে পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ৪ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সীমা দেয়া হয়েছে। ফলে কর্মকর্তারা কোনো প্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষা করে নির্দিষ্ট হারে পণ্য ও সেবা বাজেয়াপ্ত করতে পারবেন।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ও কমপ্লায়েন্সের জন্য নিরীক্ষার পরিধি বাড়ানো হলেও এতে হয়রানির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেয়ার ফলে তারা ব্যবসায়ীদের অযথাই হয়রানি করেন। ফাইল রি-ওপেনিংয়ের নামে তাদের বারবার ডাকা হয়। এতে আইনজীবীসহ বিভিন্ন পক্ষকে আর্থিক সুবিধার সুযোগ করে দেয়ার পাশাপাশি করদাতাদের নিয়ে টানাহেঁচড়া করা হয়।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, রিটার্ন জমা দেয়ার পর তা রি-ওপেনিং যেন বন্ধ হয়, সে দাবি করেছি এবারের বাজেটে। এনবিআর তা না করে নিরীক্ষার আওতা বাড়িয়েছে। কর ফাইল নিরীক্ষার উদ্দেশ্য বৃহৎ করদাতাদের জন্য হলেও এখন অপেক্ষাকৃত ছোট করদাতাদের বেলায়ও হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ নিরীক্ষা ছাড়াই কর ফাইল পুনরায় খোলা হচ্ছে। এক্ষেত্রে একেক কর কমিশনার একেক ‘ফরমান’ জারি করেন। এসব ফাইল ১৮ হাত ঘুরে যায়। কোনো কোনো কর কমিশনারের গাড়িচালকও কর-সংক্রান্ত কাজ করছেন। করদাতারা এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *