১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৫ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

রাতে বীর, সকালে খলনায়ক

অবুঝদের চুপ থাকাটাই শ্রেয়

আমিনুল ইসলাম কাসেমী : ফেসবুক এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ রাতারাতি বীরের খেতাব লাভ করেন। আবার কোন কারণ বশতঃ ঐ বীর-পাহলোয়ান সাহেবের কোন কাজ যদি ফেসবুকের মুজাহিদ ভাইদের মতের খেলাফ হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভিলেনে পরিণত হন। কোন প্রকার রেহাই দেওয়া হয় না। বহু বছর ধরে তা দেখে আসছি। বহু বীরকে দেখে আসছি, রাতে তিনি বড় বীর, আবার সকালে হঠাৎ করে খলনায়ক।

কদিন আগে একজনকে দেখলাম, ‘খানকায়ে পীর আর ময়দানে বীর’ সে যে কি প্রচার-প্রচারণা!! পুরো ফেসবুক জুড়ে বীরের জয়গান। কত জন কত খেতাব তাঁকে দিলেন। কত মানুষ তাঁকে প্রশংসার সাগরে ভাসালেন। হঠাৎ এখন দেখি সেই বীর-মুজাহিদকে আর দু চোখে দেখতে পারছেন না। এখন যেন গনেশ উল্টে গেছে। সবার কাছে এখন খলনায়কের আসনে তিনি।

এরকম বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভুরি ভুরি প্রমাণ দেওয়া যাবে। সময়ে একজন মানুষ তাদের কাছে নায়ক আর দুঃসময়ে খলনায়ক। এভাবে রাতারাতি বদলে যাওয়া মোটেও ঠিক নয়। আবার যখন তাঁকে এভাবে নায়ক বানানো হয়, সে ক্ষেত্রেও চিন্তা- ভাবনা করে নায়কের আসনে বসানো উচিত।

তবে মনে রাখতে হবে, হেকমত-কৌশল বলে একটা জিনিস আছে। পলিটিক্স বলে একটা অধ্যায় আছে। সেটা কিন্তু আমাদের ফেসবুকের অপরিপক্ক মুজাহিদ ভায়েরা বুঝতে সক্ষম হন না। এছাড়া যারা মুরুব্বী, যারা জ্ঞানী, তাদের কত চিন্তা ভাবনা করে পা ফেলতে হয়, সেটাও কেউ বুঝতে চায় না।

আরবীতে একটা প্রবাদ বাক্য আছে, ‘ফে’লুল হাকীমে লা – ইয়াখলু আনিল হিকমাতে’। ‘জ্ঞানীদের কোন কর্ম হেকমত থেকে খালি নয়’। যিনি একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, আবার তিনি সুলুকের লাইনের বড় শায়েখ। ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁকে এখন সবচেয়ে বয়স্ক-মুরুব্বী বলা যায়, সেরকম একজন মানুষ নিশ্চয়ই বুঝে-শুনে সামনে এগোচ্ছেন। তিনি তো আর ছোট শিশু নন। অবশ্যই তাঁর কাজে অনেক পরিপক্কতা রয়েছে। হয়ত এহেন মুহুর্তে অনেকের কাছে সুবিধাজনক মনে হচ্ছে না। তবে এক সময় আসবে আবার তিনি নায়ক হয়ে যেতে পারেন।

দেশ ও জাতির চিন্তা করে কৌশলী হওয়া দরকার সকলের। যে যেখানেই আছেন, যে ময়দানেই কাজ করেন, বৃহত্তর স্বার্থ লক্ষ্য করা উচিত। অবস্থা বুঝে, হেকমত-প্রজ্ঞার সাথে চলা চাই। এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়া চাই, যার দ্বারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠি ক্ষতির সম্মুখিন হবে। কারো সাথে লিঁয়াজো করে চলা, কোন দলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এটা কিন্তু দালালী নয়। বরং তাঁদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার দ্বারা যদি দ্বীনি ফায়দা হয় তাতে অসুবিধা কোথায়?

একটি সঙ্গিন মুহুর্ত যাচ্ছে। দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলো সব বন্ধ। বহু দ্বীনি ভাই ভিতরে আছেন। বাইরের আলো বাতাস তাদের স্পর্শ করতে পারছে না। এহেন মুহুর্তেও যদি কেউ গো ধরে বসে থাকেন, সেটা ভুল হবে বলে মনে করি। বরং কৌশলী রাজনীতিই হবে শ্রেয়। যদি ও কিছু কিছু ফেবু মুজাহিদদের কাছে বিষয়টা ভাল লাগবে না। তবে সেটাই কিন্তু বিজ্ঞজনদের কাছে সঠিক সিদ্ধান্ত।

দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লক্ষ্য করুন। যে সময়ে আলেমদের উপরে সবচেয়ে বড় দুর্দিন নেমে এসেছিল। হাজার হাজার আলেম শহীদ হলেন। পুরো ভারতবর্ষ থমথমে অবস্থা। কোন কোন অঞ্চল এমন অবস্থা হয়েছিল, মানুষ মরে গেলে জানাযা-দাফন কার্যের জন্য আলেম-উলামার সংকট দেখা দিয়েছিল। সেই সময়ে আমাদের বুজুর্গানেদ্বীন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে ফেললেন। ব্রিটিশদের মুখোমুখি লড়াই নয়। কেননা, আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে খালিহাতে এভাবে লড়াই করা সম্ভব নয়। তাই রাজনীতির নয়া কৌশল ছিল দারুল উলুম দেওবন্দের গোড়পত্তন। দ্বীনি মারকাজ ঠিক রেখে সেখান থেকে কর্মি বাহিনী তৈরী করা। ঠিক সেই নতুন কৌশলেই কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনী পরাজয় করেছিল।

আমাদের বাংলাদেশের আকাবিরে উলামা যেমন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এমনি ভাবে আল্লামা আহমাদ শফি রহ. তাঁরা কিন্তু লিঁয়াজো করে চলেছেন। রাজনীতিতে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী লিঁয়াজো করে চলা এটা দালালী নয়। বরং এটা একটা রাজনৈতিক কৌশল।

আমাদের উলামা-মাশায়েখগণ সকলেই কিন্তু মাদ্রাসা কেন্দ্রিক। মাদ্রাসার মধ্যে আলেমদের প্রাণ। এদেশে এমন কোন আলেম নেই যিনি মাদ্রাসার বাহিরে। প্রতিটি দেওবন্দী আলেম মাদ্রাসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একারণে মাদ্রাসাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। সর্বাগ্রে মাদ্রাসার স্বার্থ লক্ষ্য করা দরকার। মাদ্রাসা খোলার জন্য এবং দ্বীনি কাজগুলোকে অব্যহত রাখতে যদি কারো সাথে সখ্যতা রাখার প্রয়োজন হয়, তাহলে বৃহত্তর স্বার্থের দিকে লক্ষ্য করে করা যেতে পারে।

দেখুন! শুধু উনাকে দোষারোপ করে কী লাভ? এখনতো বড় বড় হস্তিগণ ও লিঁয়াজো করে চলার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। বারবার মন্ত্রী মহোদয়ের বাসায় যাওয়ার পরেও কোন সমাধানে আসতে পারছেন না। এখন আরেক মাননীয় মুরুব্বী হয়ত অন্য দিকে এগোনোর চেষ্টা করছেন বলে মনেহয়। তবে তাঁর দিলের খবর আল্লাহ ভাল জানেন।

এখানে ফেবু মুজাহিদদের উচিত খামোশ থাকা। আর ট্রল না করা ভাল। কেননা, বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং মুরুব্বীগন ভাল বুঝবেন কোন তরিকায় সামনে চলতে হবে। অবুঝদের চুপ থাকাটাই শ্রেয়। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।

লেকক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: রাজনীতিতে উলামায়ে দেওবন্দ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com