২৬শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জিলকদ, ১৪৪৩ হিজরি

রাত ৮টার পর ঢাকা শহর বন্ধের বিষয়কে কীভাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : আগামী ১ জুলাই থেকে ঢাকা শহর রাত ৮টার পর বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। অবশ্য রেস্তোরাঁ ও অত্যাবশ্যকীয় যে বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খোলা থাকবে।

টেকসই শহর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সব শহরের মতো দৈনন্দিন ভিত্তিতে ঢাকা শহরেরও সব ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও কর্মযজ্ঞ শেষ করার একটি সুনির্দিষ্ট সময় থাকা আবশ্যক উল্লেখ করে মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস বলেন, করোনাকালে জনজীবন যখন স্তব্ধ ছিল তখন প্রকৃতিকে নবউদ্যোমে জেগে ওঠতে আমরা দেখেছি। কারণ প্রকৃতির বিশ্রাম করার সময় লাগে। তেমনি ঢাকা শহরের ব্যবস্থাপনার জন্য সময় প্রয়োজন। আমরা সারাদিনই ঢাকার উপর অত্যাচার করব আর ঢাকা আমাকে সুন্দর পরিবেশ উপহার দেবে– সেটা কামনা করা যৌক্তিক নয়। পৃথিবীর সব শহরেরই একটি সময়সীমা আছে, ঢাকা শহরের কোনো সময়সীমা নেই। তাই এ বিষয়ে আমরা সবার সঙ্গে আলাপ করছি।

ঢাকায় এখন রাত ১০টার পর অসংখ্য পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করে এবং এর ফলে শহরের প্রবেশপথগুলো তীব্র যানজটের পাশাপাশি শব্দ ও বায়ুদূষণ অনেক বেড়ে যায়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাত আটটার পর দোকানপাট শপিং মলসহ যেসব জায়গায় জরুরি সেবা দেওয়া হয় না সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং এর ফলে রাত্রিকালীন যানজট ছাড়াও দূষণ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর আগে ঢাকায় এক সময় রাত আটটার পর দোকানপাট বন্ধ রাখার নিয়ম চালু ছিলো। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগ থেকেও এই সময়ে দোকানপাট আবার বন্ধ রাখার সংস্কৃতি চালুর অনুরোধ করা হয়েছিলো।

এখন সাধারণত ঢাকায় মধ্যরাত পর্যন্ত প্রায় সব ধরণের দোকানপাট খোলা রাখার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে যানজট যেমন মধ্যরাত পর্যন্ত লেগে থাকে, তেমনি দিন রাতের গড় তাপমাত্রাও কমে আসছে।

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে সেই ধারা অব্যাহত থাকলে রাজধানী ঢাকাসহ পাঁচটি বড় শহর আগামী কয়েক বছরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে।

গত ২০ বছরে রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস যেখানে সারা বিশ্বে তাপমাত্রা-বৃদ্ধিকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার জন্য লড়াই চলছে বলে এই গবেষণাটি জানিয়েছে।

আর শব্দ দূষণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবল।

অথচ পরিবেশ অধিদফতরের জরিপে দেখা যায় দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে।

যানবাহনের হর্ন, ভবনের নির্মাণকাজ, কল-কারখানা, মাইক ব্যবহার এবং, বিশেষ করে, ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে একসঙ্গে কয়েকশ গাড়ি হর্ন বাজানোকে শব্দ দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনার জন্যই শহরের কাজকর্মের সময়সীমা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা দরকার।

বাংলাদেশ প্লানার্স ইন্সটিটিউটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় দিনের চেয়ে রাতে বেশি ধূলি-দূষণ হয় এবং পরিবেশের যত সূচক আছে তার সব দিক থেকেই ঢাকা পিছিয়ে আছে কারণ শহরটি প্রতিনিয়ত নিপীড়িত হচ্ছে।

তিনি বলেন, নিউইয়র্ক শহরের হয়তো বিশ্রাম দরকার হয় না কারণ পরিবেশসহ তাদের সব ব্যবস্থাপনার সূচক অত্যন্ত উঁচুতে। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে তা হয় না। তাই এ শহরকে বিশ্রাম দেয়া দরকার। তবে একই সঙ্গে শহরের উপর থেকে চাপ কমাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কোনটি কখন শুরু হবে সেটির সমন্বয় দরকার।

, ঢাকায় দিনের চেয়ে রাতেই বেশি ধূলা ছড়ায় এবং শব্দ ও বায়ু দূষণের দিক থেকে বিবেচনা করলে শহরটি ব্যাপকভাবে দূষিত।

এ নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, এই অবস্থায় শহরটিকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়া দরকার। তবে এ জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনাও থাকা দরকার, যাতে দিনের কিছু বিশেষ সময়ে যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

বুয়েটের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আফসানা হক বলছেন, আগে যখন রাত আটটায় দোকানপাট বন্ধ হতো, তখন যান চলাচলসহ বেশ কিছু বিষয়ে তার একটি সুফল পাওয়া যাচ্ছিলো।

তিনি বলেন, শহরকে স্বস্তি দিতে হবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। শহরমুখী মানুষের স্রোত যদি শহরের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হয় তাহলে সেই শহর টিকবে কীভাবে? অন্যদিকে শহরের মধ্যে জায়গা কম তাই অল্প জায়গার বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এতে শহর যেমন বিশ্রাম পাবে তেমনি নাগরিকরাও দরকারি সব সেবা পাবে কোন কাজ ব্যাহত হওয়া ছাড়াই।

তবে বিশ্রামটি যেন কার্যকর হয় এবং তাতে শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিময়তা যাতে নষ্ট না হয় সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, কার্যকর বিশ্রামের জন্যই কিছু নিয়ম শৃঙ্খলা আরোপ করা দরকার। এখন মধ্যরাত পর্যন্ত সব খোলা না রেখে বরং খুব জরুরি নয় এমন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাত আটটার মধ্যে বন্ধ করার মাধ্যমেই এর সূচনা হলো বলে মনে করছেন তারা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com