২৫শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৩শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সূতিকাগার

শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় অমর একুশে

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সূতিকাগার

মা ন জু ম উ মা য়ে র

বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পুরোটাই বাঙালির ন্যায্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সেইসাথে ছিল রাজনৈতিক আন্দোলন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে অল্পদিনের মধ্যেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ নানাভাবে এই আন্দোলনের সমর্থনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন জনগণের দাবি ছিল বাংলাভাষাকে উর্দু ভাষার পাশাপাশি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করা হোক। এই দাবির সঙ্গে এটাও ছিল যে, পাকিস্তান এক জাতির রাষ্ট্র নয়। এই রাষ্ট্র বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্দি, বালুচ ও পাঠান এই পাঁচ জাতির রাষ্ট্র। এই পটভূমিতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ নেয়। বাংলাভাষার সর্বাঙ্গীন উন্নতি এবং রাষ্ট্রীয় সব কাজে বাংলাভাষা প্রচলন দাবি করা হয়। এই আন্দোলনে সবসময়ই গণতন্ত্রের আকাঙ্খা ও শ্লোগান যুক্ত ছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের বিকাশ তৎকালীন পাকিস্তানে হয়নি, বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বাভাবিক বিকাশও বাধার সম্মুখীন হয়। ্এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। কিন্তু স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করে জারি করা হয় সামরিক আইন।

সাংস্কৃতিক দমননীতির পাশাপাশি চলে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি। এই বিষয়ে গণচেতনা যখন প্রবল হয় তখনই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসাবে ৬ দফা আন্দোলন প্রবল রূপ ধারণ করে। আইয়ুব সরকার ৬ দফা আন্দোলন দমন করবার জন্য শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করে। এতে জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে, তখন দেখা দেয় ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। জনগণের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে করা হয় বঙ্গবন্ধু। তখন আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়। এরপরই ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন এবং নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। তিনি সংখ্যাসাম্যনীতি বাতিল করে জনসংখ্যা ভিত্তিক নীতি গ্রহণ করেন। তার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়। নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, আওয়ামী লীগ যা চাইবে তাই সংসদে করতে পারবে।

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের ৬ দফার প্রতি দৃঢ় সমর্থন নিয়ে এগুতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তখন সেনা প্রধানদের এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকা থেকে বিরত থাকেন।
তারপরই প্রতিবারে ২১ শে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশমান ছিল শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক, ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে এই চেতনা ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে তাজউদ্দিন আহম্মদসহ জাতীয় চার নেতা সব সময় সহযোগী হিসাবে কাজ করেছেন। এই অবস্থায় ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের ঘটনাবলী ও মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকে অনিবার্য করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারপ্রাপ্ত (বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে) রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ সরকার (মজিবনগর সরকার) পরিচালনা করেন।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে আটক ছিলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তিনি মুক্ত হয়ে ইসলামাবাদ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বীরের বেশে ঢাকায় আসেন ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাঙালির মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সৃষ্টিতে, যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজে ও দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে কাজ করেছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চেতনা। মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। এ চেতনা অবিনশ্বর।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com