১৭ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১৫ই শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

রোজা, তারাবি, সেহেরি, ইফতার ও অন্যান্য

  • হাসান মাহমুদ

তারাবি

ঠাণ্ডা বাতাস নেমেছে কুরআনের সুরে—
হারুত ও মারুতের বাবেল শহরে নেমে আসার—
দৃশ্যায়ন যেন করোটিতে উঁকি দিচ্ছে বারবার।
মধুর নহর প্লাবিত হচ্ছে যেন ঐশী সুরে—
মস্তক থেকে মুছে যাচ্ছে গন্দমের মিথ।
দুধের নদীতে সন্তরণ করছি যেন অমৃতের স্বাদ
নিতে, সে স্বাদ হৃদয়ে খোদাই করে
বসে যাচ্ছে যেন চিরদিনের মতো।

এক পশলা ঠাণ্ডা বাতাস বুক ছুঁয়ে দিচ্ছে বারবার—
যেন বৃষ্টির ছন্দের মতো ফুরিয়ে গেল দীর্ঘ নামাজ।

রোজা

ত্বোওয়া-সিন-মিম, আমাদের শূন্যতা অসীম, অসীম—
প্রখর রোদে বৃষ্টিতে ভিজছে শিমুলের দিন।
হিমবায়ুতে দুলছে ক্ষুধার্ত সাদা পায়রার দল—
কি শহর, কি মফস্বল, কিবা গ্রামাঞ্চল;

প্রেমের তরীতে দুলছে মায়ার দোলাচল
যেন সে দুলদুলুনিতে তুষারের হিম-ঠাণ্ডা
হয়ে বয়ে যাচ্ছে হৃদয়ে অতল।

জাফরানের খুশবু উড়ছে যেন নৈঋত ছুঁয়ে—
রোজার দেহ তবু ছুটছে প্রেমে ফানা হয়ে।
আশিক দিল, মুছে দেয় আবিল চিরদিনের মত,
প্রেমের নৈঋত কোণ, ফোটায় প্রসূন ভুলে ক্ষত।
সুবহে সাদিক ছুঁয়ে সুবাসিত দিনের কিশমিশ ঠোঁটে—
রোজার প্রেমে মুমিনের মুখে মেশকে আম্বর ফোটে।

লায়লাতুল কদর

হাজার মাসের সুবাস তুমি কদর, কদর—
তোমার স্পর্শে অনুভূতি ছুঁয়ে যায় যেন দুধের নহর।
মহুয়া শালবনে যেমন বাচ্চাপাখি কাঁপে অরণ্য গহিনে—
তোমার অস্পৃশ্যতাও মধুর লাগে মৃদু অনুরণনে;

তোমার স্পর্শ পেলে মনে হবে দুধে ধুয়া যেন
কোনো জান্নাতি পাখি—
বলছে ডাকি;
এসো কদর, এসো কদর তোমাকে বুকে রাখি।

তোমার খুঁজে চঞ্চল মন, সারাক্ষণ, থাকে প্রেমে তাড়িত—
আহ কদর, প্রেমের বহর হৃদয় তোমার বরণে থাকে আহৃত!
হাজার মাসের সুবাসিত কদর তুমি, অন্তরীণ—
তবু, তোমার খুঁজে পাঁজরভাঙার বেদনাও
সুন্দর মনে হয়,
রমজানে তুমি আমার অভয়, অভয়—

কুরআন

সাদা পৃষ্ঠায় কালো অক্ষরে পৃথিবীর তাবৎ সুখবিধি—
জল-ঝরনার চেয়েও স্বচ্ছ প্রবাহ এই অক্ষর
ধরে বয়ে যায় অনন্ত ধারায়।

জোছনার মৃদু আলোর চেয়েও মৃদু আলো
ঝরে পড়ে আয়াতে, আয়াতে—
গোলাপের সৌরভ যার সুবাসে মোহিত;
সে সৌরভ অনন্ত সৌরভ।

যে খুশবু পবিত্রতার খুশবুতে হৃদয়ে হিল্লোল
বয়ে যায়, যেন ঝরনার প্রশান্ত কল্লোল
ডাকে স্বচ্ছতার হাতছানিতে—
এমন সুন্দরে দেহের সমস্ত মনোযোগে ধীরলয়ে পড়ি তারতীল নিয়মে, আলিফ-লাম-মিম—
কোনো সংশয় নেই আল- কুরআনে।

তাহাজ্জুদ

সুবহে সাদিকে ডাকছে ডাহুক, যেন ফানার শরাবে ডুব দিয়েছে অনন্ত প্রেমে—
সত্তার অনাদি, অনন্ত, অসীম প্রেমে ফানার শরাব গলছে তুষারের মতো।

একশো একটি পদ্মফুলের সুন্দর দৃশ্যের চেয়েও
সুন্দর; সুবহে সাদিকের ঠাণ্ডায় মিশে থাকা কপাল—
যেন ঝরে পড়া লাল আপেলের নন্দন দৃশ্যের
চেয়ে ঈষৎ কালো কপালের দাগ প্রেমময়;
তোমার কপাল জুড়ে প্রশান্ত সিজদার চিকন দাগ,
যেন পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর তোমার সিজদাচিহ্নে
মিশে আছে।

ইফতার

ক্ষুধা মুছে যায় তোমার প্রেমে—
খাদ্যের ঘ্রাণ হাওয়া হয়ে উড়ে তবু ওষ্ঠ শুকিয়ে
যায় যেন কিশমিশ রূপ—

প্রেমের মোড়কে আঁকিবুঁকি রোজার নিয়ত;
যেন ক্ষুধা উড়ে হাওয়া হয় রোজার বুকে—
তবু জলতৃষ্ণায় বয়ে যায় স্বর্গীয় ধারা,

রোজায়, মাগরিবের ছোট আজানে নামে
জান্নাতের খুশবু, বয়ে যায় ফল্গুধারা।
আর ঠোঁটে ঠোঁটে খেজুরের মিঠা লাগে যেন
জান্নাতের অনাবিল সুখ হয়ে—
তখন, পরম আনন্দ নামে ইফতারে, ইফতারে।

সেহেরি

অনাবিল সুখ নিয়ে ঘুমের ডানায় উড়ছে দেহ—
তবু কিসের তাড়নায় ঘুম হাওয়া হয়ে যায়
সুবহে সাদিকে।

এক অনন্ত প্রেম নামে অদৃশ্য থেকে—
হৃদয়ের আবিলতা মুছে যায় সেই প্রেমে;
হৃদয় যেন ভিজে যায় আসমানি ডাকে।
ঠাণ্ডা রূহ, যেন পুরোপুরি নিষিক্ত।

প্রেমের আকুলতা ফোয়ারা হয়ে ঝরে পড়ে
অনিদ্রার কোলে—

কী এক অথই প্রেম দিল থেকে মুছে দেয়
ঘুমের ঘোর!

জান্নাত

চিরসবুজ পাখি উড়ে বেড়াবে ফিরদাউসের ভেতর—
বর্ণাঢ্য পুষ্পরাজি, সফেদ প্রস্রবণধারা, জমকালো ফলের বাগানের বুকে চিরে যে মধুর নহর বয়ে যাবে;
ঠিক তার পাশেই হোক তোমার ঠিকানা।
সোনালি ও ধূসর রঙের ঘোড়া উড়ে বেড়াবে জান্নাতের জাফরানের গালিচায়—

কী যে সুন্দর ডানাঅলা ঘোড়া;
সে ঘোড়াটি হোক তোমার।
নিয়ন্ত পথে বিস্তৃতির যে নন্দন দৃশ্য হৃদয়ে ভেসে উঠবে, কী সুন্দর হবে হে সমস্ত সুন্দর!

ইয়াকুতের সৌন্দর্যে সবুজ প্রাণ উড়ে বেড়াবে
ডানাঅলা ঘোড়া নিয়ে—
তুমি হবে সবুজ প্রাণ; অমৃতধারায় তৃষ্ণা মিটাবে
শরাব পান করে।
পাতায় পাতায় যে ঘর্ষণের ধ্বনি হবে; সে সুর
শুনে তুমি ভুলে যাবে তোমাকে—

আহা জান্নাত, তোমার সৌন্দর্যে তুমি উপমা।

জাহান্নাম

যে লেলিহান অগ্নি গায়ের চামড়া খসিয়ে দেবে;
সে অগ্নি যেন আমায় স্পর্শ না করে—

গাঢ় কালো আগুনের উত্তাপ;
কেমনতর সইব বলো ছোট্ট মানুষটি হয়ে।

জাহিমের তাপ কিভাবে সইব?

প্রজ্জ্বলিত সায়ির নির্বাপিত করে দিও
তোমার ইশকের নুরে—

ঝলসানো সাকার আর হুতামার অগ্নিশিখায়
কেমন করে পুড়াবে তোমার ইশকের দিল?

যদি হাবিয়ার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাই
তখনও ফুটে যেন আমার ঠোঁটে তোমার জিকির—
পাপে যেমন গন্দমের বিষ ছুঁয়েছি মনে,
তবু পথ ফিরে চিনেছি তোমায়:

অন্ধের মতো পথ হারিয়ে পাপে ডুব দিয়েছি
জানি; তবু তোমার পথ ভুলিনি—

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com