১১ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২৭শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১২ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

সংবাদ শিরোনাম :

শবে বরাত এক মহিমান্বিত রাত

  • মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

শবে বরাত এক মহিমান্বিত রাত। এই রাতের তেরটি নাম রয়েছে। নামের আধিক্য এর মাহাত্ম প্রমাণ করে। আরবি বারাআত থেকে বরাত। বারাআত অর্থ মুক্তি। আল্লাহ তায়ালা এ রাতে ইমানদার বান্দাদেরকে গুনাহ থেকে মুক্ত করেন। এ ছাড়া এ রাতকে দুআর রাত, ভাগ্য রজনী, বরকতময় রাত, নিসফু শাবান, শাবান মাসের মধ্য রজনী, শাফাআতের রাত, ক্ষমার রাত, জাহান্নাম থেকে মুক্তির রাত, জীবন রাত্রি, তকদিরের রাত ও অন্য আরও অনেক নামে ভূষিত করা হয়েছে।

উপমহাদেশে শবে বরাত নামেই পরিচিতি পেয়েছে এই মহিমান্বিত রজনী। কুরআন হাদীসের ভাষ্য অনুসারে শবে কদর বছরের শ্রেষ্ঠ রাত। কিন্তু শবে কদর নির্দিষ্ট নয়। রাসূল (সা.) শবে কদরের দিন সম্পর্কে জানাতে হুজরা থেকে রেব হয়েছিলেন। দুজন লোককে ঝগড়া করতে দেখে নবীজী শবে কদরের তারিখ ভুলে গেলেন। এরপর নবীজী (সা.) বললেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে শবে কদর তালাশ করো। শবে কদর অনির্দিষ্ট হওয়ায় এবং শবে বরাত রমজানের কিছু পূর্বে হওয়ার ফলে শবে বরাত মুসলিম উম্মাহর নিকট অধিক গুরুত্ব পেয়ে এসেছে।

শবে কদর এক দিকে অনির্দিষ্ট, অন্য দিকে শবে কদর রমজান মাসে হওয়ার কারণে এটাকে কেন্দ্র করে খুব উৎসব মুখর থাকা যায় না। কারণ রমজান মাসে সারা দিন রোজা রেখে রাতে তারাবি আদায় করতে হয়, আবার ভোরে উঠে সেহরির চিন্তা করতে হয়। এসব কারণে শবে কদরকে কেন্দ্র করে শবে বরাতের মতো জমকালো আনুষ্ঠানিকতার ধারা গড়ে ওঠেনি।

শবে বরাতের মূল বিষয়টি একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কোনোভাবেই এটিকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রত্যেক বছর শবে বরাত নিয়ে আমাদের দ্বীনদার সমাজে বেশ বিতর্ক জমে উঠে। ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এ নিয়ে গরম আলোচনা হতে দেখা যায়। একপক্ষের দাবি অনুসারে সহিহ হাদীসে শবে বরাতের কোনো অস্তিত্ব নেই। আরেক পক্ষ শবে বরাতকে কেন্দ্র করে অনেক বেশি আনুষ্ঠানিকতা করে থাকেন।

মূলত দুই পক্ষই বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের শিকার। শবে বরাত আছে একথা যেমন সত্য, শবে বরাত উপলক্ষ্যে বিভিন্ন পদ্ধতির নামাজ বা অন্য মনগড়া ইবাদত সম্পর্কে হাদীসে কিছু নেই। শিআ সুন্নি উভয় সমাজেই বরাতের রাতে বিশেষ পদ্ধতির নামাজের নিয়ম মশহুর হয়েছে। এর কোনো ভিত্তি হাদীসে নেই। প্রতিটি বিষয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে আমাদেরকে। ইসলামে যা নেই, সেগুলোকে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই।

শবে বরাত নিঃসন্দেহে ধর্মীয় বিষয়। কিন্তু শবে বরাতের আনুষ্ঠানিকতা ধর্মের অংশ হিসেবে নয়, উপমহাদেশের মুসলিম কালচার হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।

তবে এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে। এক হচ্ছে ইবাদত, আরেক হচ্ছে সংস্কৃতি। ইবাদত আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তাতে রদবদলের কোনো অবকাশ নেই। আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল যেভাবে বলেছেন সেভাবেই ইবাদত করতে হবে। কমও করা যাবে না, বেশিও করা যাবে না। কেউ যদি যোহরের নামাজ চার রাকাতের জায়গায় পাঁচ রাকাত আদায় করে তাহলে তার কোনো সাওয়াব হবে না। অজুতে তিনবারেরর জায়গায় চারবার করে ধৌত করলে কোনো সওয়াব লাভ করতে পারবে না। এভাবে প্রতিটি ইবাদতেই আল্লাহ, আল্লাহর রাসূলের নির্দেশনা হুবহু মানতে হবে। কমবেশ করলেই তা বিদআত হয়ে যাবে।

কিন্তু সংস্কৃতির বিষয়টি ভিন্ন। একেক অঞ্চলের একেক কালচার বা কৃষ্টি থাকে। এসব কালচার আর্থসামাজিক ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন কারণেই গড়ে ওঠে। এর সাথে ধর্মের কোনো সংঘর্ষ থাকে না। অনেকে না বুঝেই সেগুলোকে বিদআত বলে দেয়। অথচ বিদআতের সংজ্ঞায় শাস্ত্রবিদগণ একথা স্পষ্ট করেছেন, কোনো বিষয়কে ধর্মের অংশ মনে করে করলে তবেই তা বিদআত হবে। রাসূল (সা.) রুটি খেতেন, কেউ যদি তার অঞ্চলগত অভ্যাসের কারণে রুটি না খেয়ে ভাত খায় তাহলে এটিকে বিদআত বলা যায় না। এটা তার অভ্যাস ও সুবিধার ব্যাপার। খাওয়া দাওয়া পোশাক আশাকের মতই সাংস্কৃতিক বিষয়াদি।

শবে বরাত নিঃসন্দেহে ধর্মীয় বিষয়। কিন্তু শবে বরাতের আনুষ্ঠানিকতা ধর্মের অংশ হিসেবে নয়, উপমহাদেশের মুসলিম কালচার হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। তবে কালচার হিসেবে যা কিছু উদযাপিত হয় তার সব কিছুকে চোখ বুজে বৈধ বলে দেওয়া যায় না। দেখতে হবে, এসব উদযাপনের মাঝে কোনো শরিয়ত বিরোধী কিছু আছে কি না? অপব্যয়, অপচয় ও বেশরা কাজকর্ম নিঃসন্দেহে পরিত্যাজ্য। কিন্তু রাত জেগে নামাজ পড়া, দুআ করা, পর দিন রোজা রাখা, কবর জিয়ারত করা ইত্যাদি আমল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। ফকীর মিসকিন এতিমদের দান সদকা করা, গরিব দরিদ্র অসহায় মানুষকে সাহায্য করা শবে বরাতে নিষিদ্ধ হবার কোনো কারণ নেই।

শবে বরাত ঘটা করে উদযাপনের বিষয়টি আবহমান কাল থেকেই আছে। কেবল উপমহাদেশেই নয় বরং সেই তাবেয়িদের যুগ থেকেই এর প্রচলন আরম্ভ হয়েছে বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়।

একইভাবে শবে বরাতে হালুয়া রুটি বানিয়ে প্রতিবেশিদের বাড়ি বাড়ি বিতরণ করার একটা রীতি আমাদের উপমহাদেশে বেশ আগ থেকেই আছে। ঈদের দিন সেমাই খাওয়া সুন্নত নয়, রমজানে ছোলা মুড়ি দিয়ে ইফতার করাও কোনো সুন্নত নয়, আমাদের অঞ্চলের মানুষের বিশেষ খাদ্যাভ্যাস, যা এখানের সংস্কৃতির অংশ। এসব কাজ ইবাদত মনে করে করা হয় না। কাজেই এগুলোকে বিদআত বলা অতিরঞ্জন বৈ কিছু নয়। গরিব প্রতিবেশীদেরকে মিষ্টান্ন দ্রব্য বিতরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা না করে শবে বরাতে যেসব বেশরা অতিরঞ্জন হয় সেদিকে মনোযোগী হওয়া উচিত আমাদের। সারা রাত তরুণ ছেলেরা এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদে ছুটে বেড়ায়, দলধরে গোরস্তানে যায়.. ইত্যাদি অনেক বিষয় কুসংস্কারের মত জেঁকে বসছে। এসব বিষয়ে আলেম উলামার মনোযোগী হওয়া জরুরি।

বিবিসির একটি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শবেবরাত কেন্দ্রিক আয়োজনকে ১৯শ শতকের শেষ দিকে নবাবদের আমলে প্রচলিত হয়েছে বলে তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এর কিছু বাস্তবতা থাকতে পারে, কিন্তু শবে বরাত ঘটা করে উদযাপনের বিষয়টি আবহমান কাল থেকেই আছে। কেবল উপমহাদেশেই নয় বরং সেই তাবেয়িদের যুগ থেকেই এর প্রচলন আরম্ভ হয়েছে বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। তাবেয়িদের যুগের খালেদ ইবনু মিদান (মৃত্যু: ১০৩ হি.), মাকহুল, লুকমান ইবনু আমের প্রমুখ মনীষী শবে বরাতকে অত্যধিক মর্যাদা দিতেন। (লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃ. ১৯০) এই সব তাবেয়ি প্রথম শতকের মুসলিম, তাদের সময়ে অনেক সাহাবিও বেঁচে ছিলেন।

এ ছাড়া হযরত উমর ইবনু আব্দিল আযিয (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.) প্রমুখ মনীষীদের থেকেও এ রাতের ইবাদতের সপক্ষে রেওয়ায়াত রয়েছে। অন্তত বারোজন সাহাবি থেকে শবে বরাতের ফজীলত সংক্রান্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এখানে বিখ্যাত দুটি হাদীস তুলে ধরা হলো-

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের মধ্যরজনীতে সমস্ত মাখলুকের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং বিদ্বেষ পোষণকারী ও হত্যাকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। [মুসনাদু আহমাদ, হাদীস নং ৬৬৪২] অন্য বর্ণনায় রাসূল সা. বলেন, মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী। [তাবারানি- হাদীস নং ২০৩]

হযরত আয়শা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, এ রাতে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চাইতেও অধিক সংখ্যক লোকের গুনাহ মাফ করেন। [ইবনু মাজাহ- হাদীস নং ১৩৮৯]

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বরাতের মহিমান্বিত রাতে শরিয়তসম্মত পন্থায় ইবাদত বন্দেগী করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : শিক্ষক, খতিব, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com