২৮শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৬শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

শায়েখ ইবনে শায়েখ

শায়েখ ইবনে শায়েখ

আমিনুল ইসলাম কাসেমী

উস্তাদ বা শায়েখের ছেলে উস্তাদতুল্য। তাদেরকে ভালোবাসা মানেই নিজের শায়েখকে ভালবাসা। শায়েখদের সন্তানকে মহব্বত করা মানে প্রিয় শায়েখের প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। কোন উস্তাদের ছেলের সাথে ভাল ব্যবহারের দ্বারা শায়েখের অন্তর খুশি হয়। সেই খুশির কারণে শায়েখের দুআ-ফয়েজ হাসিল করা যায়।

পক্ষান্তরে শায়েখের সন্তানের প্রতি দুর্ব্যবহারে শায়েখের অন্তরে কষ্ট অনুভব হয়। এর দ্বারা শায়েখের ফয়েজ বঞ্চিত থাকে মানুষ। সে কখনো উস্তাদের দুআ পায় না।

লাইলি -মজনুর কেচ্ছা আমরা অনেকেই জানি, মজনু লাইলির শহরে প্রবেশ করে শহরের বিভিন্ন দেয়াল এবং অলি- গলিতে ঢুকে বিভিন্ন জিনিসপত্র চুম্বন করতে ছিল। লোকেরা মজনুকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কেন এসব জিনিস চুম্বন করছ? এর দ্বারা ফায়দাটা কী? প্রতি উত্তরে মজনু বলেছিল, আমি তো আসলে শহরের দেয়াল চুম্বন করছি না, আমি চুম্বন করছি, এই শহরে যে লাইলি আছে, সেই লাইলিকে আমি চুম্বন করছি।

ঠিক এটা ছিল লাইলিকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। লাইলিকে মজনু কত্ত ভালবাসে, সেটা হাতে কলমে মানুষকে বুঝিয়েছে। উস্তাদের সন্তানকে ভালবাসা- মহব্বত করা, নিজের শায়েখের সন্তানকে ভালবাসা, এটা যেন শায়েখের প্রতি অফুরন্ত ভালবাসা।

আমি হাটহাজারীর আনাস মাদানীকে ভালবাসি শুধু আল্লামা আহমদ শফির কারণে। কেননা, আল্লামা আহমদ শফি রহ. তিনি আমাদের ছারে তাজ, আমাদের আলেম সমাজের নয়নমণি। সেই কারণে আনাস মাদানীকে ভালবাসা।

হ্যাঁ, তবে আনাস মাদানী সাহেবের কিছু ভুল ত্রুটি রয়েছে। সেটা আমিও স্বীকার করি। তবে সেটার জন্য সংশোধনের ব্যবস্থা কিন্তু ছিল। ইচ্ছে করলে তাঁকে সেসব ভুল থেকে ফিরিয়ে এনে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলী থেকে বাঁচা যেত। কিন্তু বিষয়টা এমন হল, শায়খের সামনে শায়েখের ছেলেকে হেনস্তা করা হল, যেন শায়েখকে হেনেস্তা করা হয়েছে। তাঁকেই কষ্ট দেওয়া হয়েছে। আরো কত কিছু হয়েছে, সেদিকে আর যেতে চাই না।

আমাদের মুরুব্বীদের দেখেছি, তাঁরা উস্তাদদের সন্তানের প্রতি সীমাহীন ভালবাসা রাখতেন। আল্লামা কাজী মু’তাসীম বিল্লাহ রহ.কে দেখেছি, ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ.কে যেন তিনি মাথায় তুলে ধরতেন। অথচ ফেদায়ে মিল্লাত কাজী সাহেবের উস্তাদ ছিলেন না। উস্তাদ সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.- এর সন্তান। সে হিসেবে আসআদ মাদানীকে উস্তাদের মত সম্মান করতেন। মনে হত আসআদ মাদানী সাহেবই কাজী সাহেবের উস্তাদ।

আল্লামা মাহমুদ মাদানী দামাতবারাকাতুহুম, তাঁকে বড় মহব্বত করেন আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব। মাহমুদ মাদানী সাহেব কিন্তু ফরীদ সাহেব হুজুরের ছোট। তারপরেও প্রিয় শায়েখ ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী-এর মত ইজ্জত করেন তাঁকে।

মোটকথা, এটা কিন্তু বড় আদব। একটা বেছাল গুণাবলী। এই গুণগুলো প্রতিটি আলেমের থাকা উচিত। সামান্য ভুলত্রুটির কারণে কোন উস্তাদের সন্তানকে ছুড়ে ফেলা কোন ভদ্রতা নয়। আর এর দ্বারা উস্তাদ থেকে কোন দুআ – ফয়েজ আশা করা যায় না।

শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.কে দেখেছি, তাঁর প্রিয় উস্তাদ আতাউল্লাহ বুখারী রহ.-এর সন্তানকে ইজ্জত করতে। তাঁকে সেই দরসে বুখারীর পঞ্চাশসালা পল্টন ময়দানের অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে নিয়ে এসেছিলেন। যথেষ্ট সম্মান করতে দেখেছি তখন।

এরকম প্রতিটি আলেম কিন্তু তাঁর প্রিয় উস্তাদের সন্তানকে মাথার তাজ মনে করেন। ভালবাসেন। মহব্বত করেন। চরমোনাই-এর সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. যখন বেঁচে ছিলেন, তখন দেখতাম, চরমোনাই-এর মুরীদদের হালাত। হুজুরের প্রতিটি সন্তানকে মাথার তাজ মনে করতেন। বর্তমানেও যারা বেঁচে আছেন, তাদেরও যথেষ্ট ভালবাসেন মুরীদগণ।

আমাদের প্রিয় শায়েখ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের ইসলাহী ইজতেমায় গিয়েছিলাম সেই খুলনাতে। বিগত নভেম্বর মাসের কথা। সেখানে গিয়ে দেখলাম, ফরীদ সাহেব হুজুরের বড় সাহেবজাদা মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুন সাহেবকে সবাই ” মিয়া ভাইজান ” বলে সম্বোধন করছেন। মাকনুন সাহেব আমারও অনেক ছোট। আবার খুলনার সে প্রোগ্রামে বড় বড় বহু মুহাদ্দিস, শায়খুল হাদীস উপস্থিত ছিলেন, তারা সবাই মাকনুন সাহেবকে ” মিয়া ভাইজান ” বলে ডাকছেন। খুবই ভাল লাগল। এটা নিঃসন্দেহে প্রিয় শায়েখের প্রতি সীমাহীন ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ।

হাটহাজারীর আন্দোলনের সময় ছাত্রদের কিছু যৌক্তিক দাবি থাকলেও আমি কিন্তু আনাস মাদানী সাহেবকে অপমান- অপদস্থ করার পক্ষে নই। কেননা, তিনি আমাদের শায়েখের সন্তান। বর্তমানে বারিধারাতে প্রিয় আল্লামা কাসেমীর সন্তান জাবের কাসেমীর মুহাদ্দিস পদে যোগদান, এবারো কিন্তু আমি সাহেববজাদা জাবের কাসেমীর পক্ষে। কেননা, তিনি আমাদের উস্তাদের সন্তান। জাবের কাসেমী সাহেব কোনভাবে হেনেস্তা হোন বা তাঁর অকল্যাণ হোক সেটা কামনা করি না।

শায়েখ চিরদিন শায়েখ। উস্তাদ চিরদিন উস্তাদই থাকবেন। ঠিক জাবের কাসেমী এখন আমাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব। আমি তাঁর সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।

কিন্তু “বেয়াদব মাহরুম গাশত ফজলে রব” বেয়াদব সব সময় আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে। কিছু ভাই যে, আমাদের প্রিয় শায়েখদের সন্তানদের নিয়ে ট্রল করেন, এটা বড় বেয়াদবী। শায়েখের সাথে বেয়াদবী করা হয়। এর দ্বারা উস্তাদের মনে আঘাত দেওয়া হয়। কোন ভদ্র সন্তান উস্তাদকে যেমন ভালবাসেন, ঠিক তাঁর সন্তানকে ভালবাসেন। উস্তাদের সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন।

আমরা আশা করব, আর ট্রল নয়। বিশেষ করে আমাদের উস্তাদ এবং তাঁর সন্তান ও দেশের হক্কানী ওলামায়েকেরামের শানে বিষোদগার করা বন্ধ করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আল্লাহ তায়ালা সকলকে কবুল করে নিন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com