৩০শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৪ঠা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে যেতে চাই : প্রধানমন্ত্রী

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শিশুদের জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যত আমরা গড়ে যেতে চাই। এজন্য আমি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাও করে দিয়েছি।

তিনি বলেন, আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। এই মর্যাদা ধরে রেখে আগামী দিনে আমরা বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবো। এটা হচ্ছে আমাদের অঙ্গীকার। আর আজকের শিশুরাই হবে সোনার বাংলার আগামী দিনের কর্ণধর।

বৃহস্পতিবার বিকেলে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধির সৌধের ১ নং গেটে আয়োজিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০২তম জন্মবার্ষিকী, জাতীয় শিশু দিবস ও মুজিববর্ষ উদযাপন কমিটির আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন। এই মাটির ধূলামাটি মেখে হেসে খেলে বড় হয়েছেন। এই মাটি থেকেই শিখেছেন মানুষকে ভালবাসতে। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে। মানুষের জন্য তিনি কিভাবে একটি উন্নত জীবন দেবেন, এই শিক্ষাটাও তার এই মাটির থেকে পাওয়া। আবার এই মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত। তারই নেতৃত্বে পেয়েছি আমার স্বাধীনতা, পেয়েছি আত্মমযার্দা, পেয়েছি আত্মপরিচয়, পেয়েছি একটি রাষ্ট্র। আমি আজকে জাতির পিতার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমি জানি না কি অপরাধ ছিলো তার। এই দেশকে ভালোবেসেছিলেন আমার বাবা। দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। এই দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। যেন এ দেশের মানুষ ভবিষ্যতে উন্নত জীবন পায়। সেই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের জন্য।

সকল শিশুদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু শিশুদেরও গভীরভাবে ভালবাসতেন। এ দেশের অগতিন শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে গিয়ে তিনি যে জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন কিন্তু সেই কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। শিশুদের জাতির পিতা অত্যান্ত ভালবাসতেন। আর ভালবাসতেন বলেই আমরা ১৭ মার্চকে শিশু দিবস হিসাবে ঘোষণা দেই। কারণ শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীনতার পরপরই যে সংবিধান দিয়েছিলেন সেই সংবিধানে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। এছাড়া শিশু অধিকার আইনও তিনি করে দিয়েছিলেন। সেইসাথে শিশুদের সুরক্ষার জন্য কেয়ার অ্যান্ড প্রটেকশন সেন্টার যা বর্তমানে সারকারি শিশু পরিবার নামে পরিচিত, সেটা তিনি প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, মাত্র সাড়ে ৩ বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তখনই ঘাতকের বুলেটের নির্মম আঘাত। আমি আর আমার রেহানা বেঁচে গিয়েছিলাম। স্বজনহারা ব্যথা বুকে নিয়ে এ দেশে রিফিউজিদের মতো কাটাতে হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমি ফিরে এসেছিলাম। সে অবস্থায় ঘাতক, যুদ্ধাবিরোধী, আলবদর, রাজাকারদের রাজত্ব ছিলো। তারপরও আমি ফিরে এসেছিলাম আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য। এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। এ দেশের শিশুদের যেন আগামী দিনে আমাদের মতো স্বজনহারা বেদনা নিয়ে বাঁচতে না হয়। তারা যেন সুন্দর জীবন পায়, উন্নত জীবন পায়।

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শিক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধু ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১৯৯৬ সালে আমরা যখন সরকার গঠন করি তখনও আমরা শিশুদের উন্নয়নের জন্য, শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নিয়ে যেতে, তারা যেন পিছিয়ে না পড়ে সেজন্য প্রতিটি এলাকায় স্কুল তৈরি করে শিক্ষার ব্যবস্থা করি। জাতির পিতার মতো আমরাও অনেক স্কুল জাতীয়করণ করি।

‘২০০৮ সালে দ্বিতীয়বার যখন সরকারে আসি তখন অনেকগুলো কাজ করে গিয়েছিলাম। যাতে শিশুদের জীবনটা সুরক্ষিত হয়। আমরা জাতীয় শিশু শ্রম নীতি ২০১০, পারিবারিক সংহিংসতা প্রতিরোধ আইন ২০১০, জাতীয় শিশু নীতি ২০১১, প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষার জন্য প্রতিবন্ধী অধিবার সুরক্ষা ২০১৩, নারী ও শিশু প্রতিহিংসা প্রতিরোধ ২০১৩-২৫ মেয়াদে একটি পরিকল্পনা আমরা প্রণয়ন করি। সেটা আমরা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আইন ২০১৮, বাল্যবিবাহ নিয়ন্ত্রণ জাতীয় পরিকল্পনা ২০১৮-৩০ পযর্ন্ত আমরা পরিকল্পনা করেছি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন আইন ২০৩০ আমরা প্রনয়ণ করেছি। শিশুরা স্কুল থেকে ঝড়ে না পরে সেজন্য মিড ডে মিল ও টিফিনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। শতভাগ শিশু যাতে স্কুলে যায় সে পদক্ষেপও আমরা নিয়েছি। করোনা ভাইরাসের সময় স্কুল বন্ধ ছিল আল্লাহর রহমতে এখন সব স্কুল খুলে গেছে। কাজেই এখন স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ আবার এসেছে। কোনরকম যেন তারা বঞ্চিত না হয় সেজন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’

শিশুদের খেলাধুলার আগ্রহ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রতি উপজেলায় একটি করে মিনি স্টেডিয়াম তৈরি করে দিয়েছি। সেখানে শিশুরা খেলাধুলা করতে পারবে, প্রতিযোগীতা করতে পারবে। অন্তঃস্কুল খেলাধুলা প্রতিযোগীতা, সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে শুরু থেকেই তারা নানা ধরনের শিক্ষা পেতে পারে সেই ব্যবস্থাও আমরা নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের শিশুরা সুরক্ষিত থাকবে, সুন্দর জীবন পাবে।

উপস্থিত শিশুদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জাতির পিতা শিশুদের খুব ভালবাসতেন। আমার ছেলে জয়ের সৌভাগ্য হয়েছে আমার বাবার কোলে চড়ে খেলাধুলা করতে। তিনি যখন বাচ্চাদের সামনে যেতেন তখন মনে হতো তিনিও নিজেও একটা শিশু। এটা ছিল তার চরিত্রের সবচেয়ে বড় একটা দিক। দুর্ভাগ্য ৭৫-এ শিশুরা মুক্তিযুদ্ধ পায়নি। কারবালার ময়দানেও এমন ঘটনা ঘটেনি, শিশু-নারীদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো। কিন্তু এই বাংলার মাটিতে যাদের জন্য আমার বাবা জীবন উৎসর্গ করেছেন, বছরের পর বছর কারাগারে ছিলেন, জাতি হিসাবে মর্যাদা দিয়েছেন সেই বাঙালিদের হাতে তাকে জীবন দিতে হয়েছে। এটা হচ্ছে সবচেয়ে কষ্টের, সবচেয়ে দুঃখের।

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী শুরু করেছিলাম। যে অনুষ্ঠানগুলো করার কথা ছিলো সেভাবে করতে পারিনি। করোনা প্রদুর্ভাবের কারণে আমরা সবকিছু ভার্চুয়ালি করেছি। ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছি। ২০২২ সালের ১৭ মার্চ আমরা মুজিববর্ষ উদযাপন করছি। ২৬ মার্চ পযর্ন্ত মুজিববর্ষ পালিত হবে। ২১ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পযর্ন্ত সরকারি শেখ মুজিবুর রহমান কলেজ মাঠে লোকজ মেলা আয়োজন করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ২০৪১, ২০৭১ আমাদের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন করবো। সেইসাথে ১০০ সাল পযর্ন্ত বাংলাদেশ কিভাবে উন্নত হবে সেই পরিকল্পনাও আমি প্রনয়ণ করে দিয়ে দিয়েছি।

বিকাল তিনটায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী এবং শিশুদের পক্ষে মনিয়া ইসলাম বক্তব্য রাখেন। পরে আলোচনা সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। দর্শক সারিতে বসে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

এর আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০২তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বেলা ১১টা ২০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছান। পরে বেলা সাড়ে ১১টায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ বেদিতে ফুল দিয়ে প্রথমে রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রী গভীর শ্রদ্ধা জানান। এ সময় কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দলের নেতৃবৃন্দকে সাথে দলের প্রধান হিসাবে এবং জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান। পরে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি শেষ করে হেলিকাপ্টারযোগে বেলা ১২টা ৪০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার উদ্দেশ্যে টুঙ্গিপাড়া ত্যাগ করেন।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com