শিশুর বেড়ে ওঠা এবং অভিভাবকের ভূমিকা

শিশুর বেড়ে ওঠা এবং অভিভাবকের ভূমিকা

গাজী শরিফুল হাসান : পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম পাঠশালা। পরিবার শিশুর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুস্থ জাতি গঠনে সুদূরপ্রসারী অবদান রাখে। পরিবারে শিশু শুধু বাবা-মা’র নিবিড় সান্নিধ্যই পায় না, আচার-আচরণ, নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ সম্পর্কে শিশু পরিবার থেকে শিখতে পারে। শিশুর পারিবারিক ভিত্তি তার জীবনব্যাপী দিকনির্দেশনার নিয়ামক শক্তি। পরিবারের গ-িতে অবোধ শিশু তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকেই অনেক কিছু আয়ত্ত করে। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়বোধ, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য এমনকি জীবন গড়ার নিশানাও সে নির্ধারণ করে এই সীমাবদ্ধ আলয় থেকেই। আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সমাজের এই অকৃত্রিম প্রতিষ্ঠানটি দেশ ও একটি সমৃদ্ধ জাতি বিনির্মাণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে আসছে। তাই শিশুর কাছে দেশ বা অন্যদেশ সবখানেই পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং সর্বজনবিদিত।

দেশেকালের রকমভেদে পরিবারের ধরনও ভিন্ন রকম হয়। প্রাচীনকাল আর বর্তমান যুগের সমাজব্যবস্থা একরকম নয়। ফলে পরিবার একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হলেও নিয়তই পরিবর্তনশীল। যুগের সঙ্গে সব সময়ই তাল মিলিয়ে চলতে হয়। সেভাবে পরিবারের ক্ষুদে সদস্যদেরও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রজন্মের ব্যবধান। বর্তমানে সারাবিশ্বে তোলপাড় শুরু করেছে তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রার বিষয়টি নিয়ে। আধুনিক পরিবর্তনশীল বিশ্ব যেভাবে গতিশীলতায় এগিয়ে যাচ্ছে, এ সময়ের প্রজন্মকেও একইভাবে তার অনুগামী হতে হবে। না হলে পিছিয়ে পড়া কিংবা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যাওয়ার আশংকা বেশি থাকে।

এক সময় এত দ্রুততার সঙ্গে সারাবিশ্ব বদলে যাওয়া প্রায় অকল্পনীয় ছিল। বন্যমানুষ থেকে বর্বর এবং সভ্যমানুষে রূপ নিতে সমাজকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। তার পরেও পৃথিবীর সব জায়গায় একই সময়ে এই বিবর্তন আসেনি। প্রাচীন গ্রীক, রোম, মিসরীয়, ব্যাবিলনীয় কিংবা ভারতীয় সভ্যতা বিবর্তনের ইতিহাসে আদিম নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আধুনিক বিশ্বে পরিবর্তনের ধারা এত গতিশীল এবং জগতব্যাপী যা অতি অল্পসময়ে ছড়িয়ে পড়তে দেরি করে না। ফলে এ প্রজন্মের শিশুদের সেভাবে সজাগ এবং তীক্ষèদৃষ্টি রাখতে হয় যাতে বর্তমান নতুন ধারা থেকে কোনোভাবে তারা বিচ্যুত না হয়। আর এখানেই পরিবার এবং অভিভাবকের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের শৈশব-কৈশোর আর বর্তমান প্রজন্মের শিশুর এই সময়টি এখন আকাশপাতাল তফাৎ। অভিভাবক আর সন্তানদের মধ্যে ব্যবধানও অনেক। একান্নবর্তী পরিবারে একজন শিশু বেড়ে ওঠে সর্বজনীন আদর্শিক বোধ নিয়ে। এটাই শিশুর পারিবারিক এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের থেকে প্রাপ্ত দীক্ষা। শিশুদের আলাদাভাবে প্রাধান্য দেওয়া তখন তেমনভাবে প্রচলিতও ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলায়’ উল্লেখ করেছেন, তিনি অন্য দশটি সাধারণ শিশুর মতোই তিনি বেড়ে উঠেছেন, জমিদারের কনিষ্ঠ সন্তানের দাপট নিয়ে নয়। কড়াশাসন আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অতি প্রয়োজনীয় প্রাপ্তি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যেত না। এখনকার অভিভাবকরাও সেভাবেই বড় হয়েছেন। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের চাওয়াপাওয়াকে গুরুত্ব দেয়ার প্রবৃত্তি কখনও জাগেনি। আর শিক্ষার ব্যাপারটিও ছিল একেবারে পরিবারের কর্তা-কর্ত্রীর যেভাবেই নির্ধারণ করতেন ঠিক সে রকম। অবশ্য তখনকার দিনের গৃহিণী মায়েরা অতখানি আধুনিক কিংবা অধিকার সচেতনও ছিলেন না। অল্পশিক্ষিত কিংবা প্রায় অশিক্ষিত মায়েরা সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারে তেমন মাথা ঘামাতেন না। বাবা তার ইচ্ছা এবং আদর্শিক বোধ সন্তানদের সামনে তুলে ধরতেন। আর ছেলেমেয়েরা নিজেরাই স্বাধীনভাবে তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারত।

মাত্র দুই যুগ আগেও পারিবারিক পরিবেশ ছিল অন্যরকম। সন্তানদের যথার্থ পরিচর্যা কিংবা স্নেহযতেœর অভাব কোন কালেই ছিল না। তবে তারাই যে সংসারের মূল এমনটি ভাবারও কোন অবকাশ কখনই হয়নি। যিনি পরিবারের প্রধান তার মর্যাদা, সম্মান এবং স্থান ছিল সবার ওপরে। সেটা খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সঙ্গত কারণে তার দিকেই যেত। সেটা যেমন বয়সের কারণে পাশাপাশি উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ার জন্যও। ছেলেমেয়েরা বুঝত বাবা কষ্ট করে আয় করছেন তাদের যথার্থভাবে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে। সেই বোধে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত পিতা যখন কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরতেন সন্তানরা হয়ত বা এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিত মনের আনন্দে। ঘরে পরা পোশাক বাবার হাতের কাছে ধরত এমনকি পায়ের চটি জোড়াও কাছে এগিয়ে দিত। মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখত গৃহিণী মা কিভাবে সন্তান তার আদরের বাবার সেবা করছে।

পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে এক সময় সন্তানদের প্রবেশ করতে হতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তারও আগে ধর্মীয় শিক্ষাও পরিবার থেকেই দেয়া হতো। যার জন্য কখনও মক্তব, মাদ্রাসা কিংবা কোন উপসনালয় অবধি যেতে হয়নি। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা আর অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতিতে আজ বর্তমান প্রজন্ম অপরাধ জগত কিংবা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এটাও পারিবারিক অসংহতি কিংবা চাকরিজীবী পিতামাতার সময়ের স্বল্পতায় সন্তানের প্রতি সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি নতুন প্রজন্মকে সর্বনাশা সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তৎকালীন অভিভাবকরা স্বাধীনচেতা হিসেবে সন্তানদের বড় করলেও সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন যাতে কোন অশনিসঙ্কেত জাতির ভবিষ্যতদের জীবন বিপন্ন করতে না পারে।

শিক্ষাজীবনের অনুপ্রবেশ শিশুদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এ সময় সব থেকে বেশি নজর রাখতে হয় শিশুদের। মানসম্মত শিক্ষা ছাত্রছাত্রীদের জীবন গড়ার সত্যিকারের নির্ণায়ক। শিক্ষাই জাতির মেরুদ-। এমন একটি বাক্যের ভাব সম্প্রসারণ করতে করতেই ছাত্রজীবনের প্রাথমিক স্তর পার করতে হয়েছে। কোচিং শব্দটি তখন প্রায় অজানা। পারিবারিক আবহে শিশুরা শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে নিত। পরিবারে যিনি ইংরেজি এবং অঙ্ক ভাল জানতেন তারাই শিশু-কিশোরদের গণিত এবং ইংরেজি ভাষার ভিত্তি গড়ে দিতেন। বাকি দায়িত্ব পালন করতেন স্কুল শিক্ষকরা। শিক্ষক অতি সাধারণ গৃহ রাখা হতো। যারা দুর্বল এবং কিছুটা অমনোযোগী শিক্ষক সেসব শিশুর তত্বাবধানের দায়িত্ব নিতেন। তারা যথার্থভাবেই ছেলেমেয়ের সযতœ পরিচর্যায় লেখাপড়ার পর্বটি সামলিয়ে নিতেন। আর বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোনভাবেই তাদের দায়বদ্ধতাকে এড়িয়ে যেতেন না। স্কুলে এবং প্রায় প্রতিটি ঘরে পাঠ্যবই ছাড়াও জ্ঞানচর্চার হরেকরকম গ্রন্থ ছেলেমেয়েদের হাতের নাগালে থাকত। কারণ, তখন তো তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে হাতের মুঠোয় সারাবিশ্ব ছিল না (স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদি)। তখন বই পড়ে কষ্ট করে সব কিছু জেনে নিতে হতো।

এখন শিশু-কিশোররা পরিবার থেকে শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না, সময়ই বা কোথায়? কোচিং আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত চাপের মুখে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা হয়, সেখানে ঠান্ডামাথায় অন্য কোন শিক্ষা তাদের আগ্রহী করে না। প্রতিযোগিতার যুগে অভিভাবকরা নিজেরাও চান না তার সন্তান শিক্ষার্জনের পেছনে ছুটে বেড়ানো ছাড়া অন্য কিছু করুক। পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তারা দিগি¦দিক ছুটে বেড়াচ্ছে। কখনও অঙ্কের মাস্টার, কখনো ইংরেজি কোচিং। গোল্ডেন কিংবা জিপিএ-৫ পেতে তাদের যেভাবে এক কোচিং থেকে অন্য কোচিংয়ে ছুটতে হয় খাওয়া, ঘুম বিসর্জন দিয়ে। বিত্তবান অভিভাবকরা বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে সন্তানসহ মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নেন। মায়েদেরই বা এত সময় কোথায় রান্নাবান্নার দিকে নজর দেয়ার। ফলে যথার্থ পরিবার হয়ে যায় এক বিচ্ছিন্ন, অসংহত এবং অসঙ্গতির একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সুস্থ স্বাভাবিক পথে শিশু-কিশোরদের মেধা ও মনন বিকাশের সুযোগ নেই বললেই চলে।

বাবা-মাকে শিক্ষার অসুস্থ প্রতিযোগিতা, কোচিং এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অশুভ কার্যক্রমের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসাটা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা কার্যক্রম একটি বিকাশমান ধারা। যা কোন সীমাবদ্ধ আলয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। বর্তমান যারা অভিভাবকরা তারা পিতামাতার সজাগ সান্নিধ্যে অবাধ এবং মুক্তচিন্তায় নিজেদের মেধাবিকাশই করেননি জীবনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির থেকে সফলতার শীর্ষেও অবস্থান করছেন। সেই অভিভাবকের সন্তানরা অর্থাৎ আধুনিক প্রজন্ম স্বাধীনচেতা সুযোগ থেকে কেন বঞ্চিত হচ্ছে? চাপানো শিক্ষার গুরুভার বহন করতে করতে নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও তারা হারাতে বসেছে। নিজেরা ভাবতেও পারে না তাদের ভবিষ্যত লক্ষ্য কি? মা-বাবা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ধারায় তাদের নিজেদের সমর্পণ করতে হয়।

শিক্ষার্জনের যথার্থ নিয়ম ও বিধি অনুসরণ করে শিশু-কিশোরদের মেধা ও মনন বিকাশে, মুক্ত পরিবেশে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করাই একমাত্র ব্রত হওয়া উচিত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *