প্রতিচিন্তা । সালমা আফরোজ
শিশুশ্রম হ্রাসের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়
রাজধানীর মতিঝিল থেকে কাওরান বাজার। মাঝে পল্টন, জাতীয় প্রেসক্লাব, শাহবাগ ও বাংলামটর। এ পথেই দৈনন্দিন চলাচল। বাসের সিটে বসেই শোনা যায় ফেরিওয়ালাদের চিৎকার চেঁচামেচি। সিগনালে থামলেই বাসগুলোতে উঠে পড়ে অল্প বয়সি থেকে মধ্য বয়সি সব ফেরিওয়ালা ।
এ রকম একদিন বাসে লাফিয়ে উঠে আট-দশ বছর বয়সের দু’টি মেয়ে। একটু অবাক হতে হলো। যে বয়সে ওদের বাবা-মার আদরে ঘরে থাকার কথা, সে বয়সে তারা বাসে নতুন বছরের ক্যালেন্ডার বিক্রি করছে। নাকে ছোট ফুলপরা ছোট মেয়েটি কি নাম জিজ্ঞেস করতে হাসিমুখে বলল, হাসি। বাসের মাঝখানে ঘুরে ঘুরে চিৎকার করছে ‘আপা, ভাইয়া নতুন বছরের ক্যালেন্ডার নেন।’ ওরা জানালো বছরের অন্য সময় চকলেট বিক্রি করে। আর বছরের শেষ দিক থেকে নতুন বছরের শুরুর দিকে বিক্রি করে ক্যালেন্ডার। সারাদিন বিক্রির পর নাকি ভালই লাভ হয়। এ সময়টায় তারা চার থেকে পাঁচ হাজার টাকাও আয় করে।
সংক্ষিপ্ত আলাপে জানা গেল, হাসি থাকে স্টেডিয়ামের পাশে তার মায়ের সাথে। বাবা কে বা কোথায় সে জানেনা। মা মানুষের বাসায় ঝি’র কাজ করে। বড় হয়ে কী করবে জানতে চাইলে হাসি বলে, ‘আর কী করব এখন যে কাজ করছি সেটাই করব। মা বলেছে ঢাকায় ভাল লাগে না, দেশে চলে যাবে।’ দেশে গিয়ে তার বিয়ে দিয়ে দেবে। একথা বলতেই মনে হয় একটু লজ্জা পেল।
হাসির সাথী জোছনা। স্টেডিয়ামের পাশে বাবা-মা, এক ভাইসহ তাদের সংসার। তার বাবা রিকসা চালায়। মা রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করে। বাকি সময় বাসায় থাকে। জোছনার ইচ্ছা বড় হয়ে ব্যবসা করবে। তার মতে, ব্যবসা করলে তাড়াতাড়ি বড় লোক হওয়া যায়। জোছনার বাবার আদেশ প্রতিদিন কমপক্ষে দেড়শ’ টাকা রোজগার করতেই হবে। তা না হলে তাকে খেতে দেয়া হবে না। জোছনাও কম চালাক না। সে ক্যালেন্ডার বিক্রি করে প্রতিদিন যেভাবেই হোক দেড়শ’ টাকার বেশি রোজগার করে। বাবার টাকা দিয়ে বাকি টাকা ভবিষ্যতের জন্য জমায়। চলতে ফিরতে তার ঠোঁটে কোনো না কোনো বাংলা সিনেমার গান আছেই। বয়স সমান, শুধু পেশা ভিন্ন। যে বাসে করে একজন মা শিশুকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা কওে, সে বাসেই একই বয়সী শিশুরা বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে। এরকম হাজারো শিশুর সাধারণ নাম পথশিশু যাদের পথেই বসবাস, পথেই জীবন।
পথশিশুদের ব্যাপারে প্রতিক্ষণ ফাউন্ডেশনের প্রধান হেলেনা কবীর বললেন, এ সব শিশুদের পড়ালেখা শেখাতে তো হবেই। কিন্তু প্রথমেই তাদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। দেশের উন্নতি করতে হলে এদের বাদ দিয়ে নয়। প্রতিক্ষণের মতো প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, শিশু অধিকার ফোরাম, আশা’র মতো অনেক প্রকল্প রয়েছে এদের নিয়ে। এসব এনজিও ফাউন্ডেশন নারী ও শিশুদের চিকিৎসা সহায়তা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এ সাথে রয়েছে সরকারের নানা পদক্ষেপ।
বাংলাদেশে শিশুদের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে আমাদের সহযাত্রী যারা, তাদের মধ্যে শিশুর কল্যাণে পরিচালিত কর্মসূচি ফলপ্রসূ করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে কাজ করে ইউনিসেফ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ইউনিসেফ বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বহু সহযোগীর সাথে সম্মিলিতভাবে কাজ করে আসছে। আমাদের দেশে ইউনিসেফের মূল অংশীদার বাংলাদেশ সরকার। ইউনিসেফ ও সরকার ২০০৬ সালে একটি মৌলিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৮টি খাতে ১৬ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৪ শিশু শ্রমিক রয়েছে। এক গবেষণা মতে, শিশুশ্রম বেশি কৃষি ও কল-কারখানায়। সেখানে ১০ লাখের বেশি শিশু কাজ করে। এছাড়া দোকান পাটে ১ লাখ ৭৯ হাজার, নির্মাণ শিল্পে ১ লাখ ১৭ হাজার শিশু কাজ করে। বর্তমানে শিশুশ্রমে নিয়োজিত আছে এমন ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু এক সময় স্কুলে গেলেও এখন আর যায় না। ১ লাখ ৪২ হাজার শিশু কখনোই স্কুলে যায়নি বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমাদের সরকারের এ বিষয়ে রয়েছে নানা পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে উন্নত সমৃদ্ধিশালী করে এমনভাবে গড়ে তুলছেন, যেখানে আগামীর শিশুদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল থাকবে এবং তারা সুন্দর জীবনের অধিকারী হবে, যে স্বপ্ন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন। সরকার জাতীয় শিশুশ্রম বিলোপ নীতি-২০১০, জাতীয় শিশুনীতি-২০১১, ইন্ডিভিজুয়ালস উইথ ডিজএবিলিটিজ-২০১৩, বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ আইন-২০১৮ ও বাংলাদেশে শিশু একাডেমি আইন-২০১৮ প্রণয়ন করেছেন।
শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত স্কুলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ, প্রতিবন্ধী ও সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন। বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশে শিশুশ্রম বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। আমাদের সরকার শিশুদের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এরই মধ্যে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম প্রতিরোধ ও নিরসন বিষয়ক আইএলও কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে। যে কোনো সংঘাত, সংকট, দুর্যোগে শিশুদের অধিকার রক্ষায় সরকারের নানা পদক্ষেপ রয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকার ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নকে সামনে রেখে দেশ থেকে শিশুশ্রম নিরসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০২০ সালের মধ্যে এক লাখ শিশুকে পুনর্বাসন করার অঙ্গীকার সরকারের। সরকার সে অনুযায়ী কাজও করে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার আইএলও’র তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি শিশু নানা রকম ঝুঁঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের উদ্যোগ দেশ-বিদেশে বেশ প্রশংসিত হয়েছে।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধানে অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সব বাংলাদেশি ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে এবং ১৪ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের কিশোর/কিশোরী হিসেবে গণ্য করা হয়। স্কুল চলাকালীন সময় ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে তার পরিবারের লিখিত অনুমতি ছাড়া উৎপাদনশীল কাজে নিয়োগ দেয়া বা কাজ করিয়ে নেয়াকে শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথবা শিশুশ্রম বলতে শিশুদের শ্রমের সময় প্রত্যক্ষভাবে উৎপাদন কাজে এবং পরোক্ষভাবে গার্হস্থ্যশ্রমে ব্যয় করাকে বোঝায়।
জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০১৩ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত ছিল বর্তমানে সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে তা কমে এসেছে। নিশ্চই ধীরে ধীরে হাসি জোসনারাও ফেরিওয়ালা থেকে বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাবে। শিক্ষিত হয়ে দেশের উন্নয়নে হাল ধরবে।
শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে শিশুদের উন্নয়নের সার্বিক কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশ জাতীয় শিশুনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে কর্তৃপক্ষ সব সময়ই শিশু শ্রমিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। বিশ্বব্যাপী ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয় যথাযথ মর্যাদা এবং অঙ্গীকারকে সামনে রেখে। বাংলাদেশেও এর ব্যত্যয় নেই। পথ শিশুসহ দরিদ্র শিশুদের রক্ষায় এবং তাদের মর্যাদা নিশ্চিতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে নিরলস।
লেখক : কলামিস্ট


