৭ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: রাশিয়াতে ইসলাম

সময়টা তখন খ্রিষ্টিয় ৬৬৪ সাল। সেবার দেরবেন্তের মুসলিমরা পারস্য বিজয় করে। তাদের পারস্য বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইসলাম ধর্ম সর্বপ্রথম ককেশাস অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং আরবরা ককেশাস অঞ্চলের ক্ষমতা দখল করে। ককেশাস বা ককেশিয়া অঞ্চল ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যবর্তী সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। ভৌগলকভাবে কৃষ্ণ সাগর এবং কাস্পিয়ান সাগরের মাঝে এর অবস্থান।

আরবদের পারস্য বিজয়ের আড়াইশ বছর পর ৯০৫ এবং ৯১৩ সালে দেরবেন্তের স্থানীয় জনগণ আরবদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু সামান্দার ও কুবাচির মতো নগরকেন্দ্রগুলো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নেয় এবং ইসলাম ধর্ম ধীরে ধীরে পার্বত্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পরবর্তীতে পনেরোশ শতাব্দীর মধ্যেই এই অঞ্চল থেকে আলবেনীয় খ্রিস্টান ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যায়।

মানচিত্রে ককেশাস বা ককেশিয়া অঞ্চল, ছবি: সংগৃহীত।

একটা বিষয় জেনে রাখা ভালো যে, বর্তমান রাশিয়ান ভূখণ্ডের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল উত্তর ককেশাস অঞ্চলে অবস্থিত দাগেস্তানের অধিবাসীরা। ১৩৯২ সালের কথা, সেবার রাশিয়ার নিঝনি নভগরোদ প্রদেশের মিশার তাতাররা মাস্কোভির গ্র্যান্ড ডিউকদের অধীনে চাকুরি গ্রহণ করে। এর ফলে তারাই ছিলো মাস্কোভি অঞ্চলের প্রথম মুসলমান।

এরপর প্রায় পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কাসিমভের খানরা মাস্কোভির আশ্রয় লাভ করে এবং মস্কোয় বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত অভিজাতে পরিণত হয়। তবে তা সত্ত্বেও রুশদের কাজান বিজয় ছিল একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত, কারণ এর ফলে বিস্তৃত স্তেপভূমিতে রুশ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী দুই শতাব্দীতে রুশরা বাশকির ও কাজাখ স্তেপের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং এর মধ্য দিয়ে বহুসংখ্যক মুসলিম প্রজা লাভ করে।

ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে নিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত, ট্রান্সককেশিয়া এবং দক্ষিণ দাগেস্তানের ইরানী সাম্রাজ্যগুলো ক্রিমিয়ান খানাতের তাতার এবং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী উসমানীয় তুর্কিদের দ্বারা শাসিত হয়ে আসছিল। উত্তর ককেশাস এবং দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে তারা যে সব এলাকায় শাসন করেছিল, সেসব এলাকায় শিয়া ইসলাম এবং সুন্নি ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল।

এশিয়া বিজয়ের ফলে রাশিয়ার মুসলিম জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যায়। ১৮৯৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সে সময় রাশিয়ায় ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি সংখ্যক মুসলিম অধিবাসী ছিল বলে জানা যায়।

১৫৫২ সাল থেকে ১৭৬২ সাল পর্যন্ত বৈষম্যমূলক আাইনের মাধ্যমে মুসলমানদের উপর রাশিয়ার দমন-নিপীড়ন অব্যাহত ছিল। সেইসাথে মুসলমানদের শিল্প সংস্কৃতিকে আটকে রাখা হয়েছিল। এরই মধ্যে ১৫৭১ সালে ক্রিমিয়ান খানাতের তাতাররা দক্ষিণ রাশিয়ায় অভিযান চালায়। এই অভিযানে তারা মস্কোর কিছু অংশ পুড়িয়ে দেয়।

এদিকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ক্রিমিয়ান তাতাররা উসমানীয় সাম্রাজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে ক্রীতদাস-বাণিজ্য করে আসছিল, এবং ১৫০০-১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে প্রায় ২০ লক্ষ ক্রীতদাস রপ্তানি করেছিল ক্রিমিয়ান তাতাররা। পরবর্তীতে ১৭৮৩ সালে দ্বিতীয় ক্যাথেরিন গোল্ডেন হোর্ডের সর্বশেষ উত্তরসূরি রাষ্ট্র ক্রিমিয়া দখল করেন। এর ফলে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে ককেশাস পর্যন্ত রুশ সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত হয়।

বর্তমান আজারবাইজানসহ ট্রান্সককেশীয় অঞ্চলের রাজ্যগুলো সহজেই রুশদের দখলে চলে আসে, কিন্তু উত্তর ককেশাস জয় করতে রাশিয়াকে অনেক হিমশিম খেতে হতে হয়। ১৮৫৯ সালে ককেশীয় মুসলমানেদর সামরিক ও ধর্মীয় নেতা ইমাম শামিল রুশদের নিকট আত্মসমর্পণ করলে ককেশাসের অবশিষ্ট জাতিগুলোও রুশদের করতলে চলে আসে।

সবশেষে ১৮৬৪ থেকে ১৮৭৬ সালের মধ্যে রাশিয়া এশিয়ায় কয়েক দফা সামরিক অভিযান চালিয়ে ছিল। ফলে এশিয়ার বুখারা, খিভা ও কোকান্দ খানাত অঞ্চলগুলোতে রাশিয়ান কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। কোকান্দ খানাতকে পুরোপুরিভাবে উচ্ছেদ করা হয়, এবং বুখারা ও খিভার বহু অঞ্চলকে রাশিয়ার তুর্কিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এদিকে মধ্য এশিয়া বিজয়ের ফলে রাশিয়ার মুসলিম জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যায়। ১৮৯৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সে সময় রাশিয়ায় ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি সংখ্যক মুসলিম অধিবাসী ছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতনের পর রাশিয়ায় ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার হয়। ২১টি রিপাবলিক নিয়ে রুশ ফেডারেশন বা রাশিয়া গঠিত হয়।

১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর রাষ্ট্রিয়ভাবে রাশিয়ায় সব ধর্ম ও ধর্মীয় কর্ম নিষিদ্ধ হয়ে যায়। মসজিদ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো ভেঙে ফেলা হয়। কিছু কিছু ধর্মীয় উপাসনালয়কে অফিস বা গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

নাস্তিক কমিউনিস্টদের নিবর্তনমূলক শাসনের ফলে রাশিয়ায় ইসলাম ধর্ম ৭০ বছর যাবত প্রকাশ্যে বিকশিত হতে পারেনি। ইসলামের শিক্ষা, প্রচার-প্রসার, দাওয়াত ও তাবলিগ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। রুশ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশাসন ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি পালন স্থগিত হয়ে যায়।

১৯৯১ সালে রাশিয়ায় ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন পাস হলে রাশিয়ায় ইসলাম আবারও জেগে ওঠে। বর্তমানে ১৪ কোটি ৬০ লাখ রুশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। কেবল মস্কোতেই আছেন ১০ লাখ মুসলমান। ইসলাম রাশিয়ার় দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। প্রথম বৃহত্তম ধর্ম হলো অর্থোডক্স খ্রিষ্টান। ৯০ শতাংশ মুসলমান আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারী।

ইতিহাস থেকে জানা যায় , ১৯১৭ সালের আগে রাশিয়ায় প্রায় ১৫ হাজার মসজিদ ছিল। বিগত ২০ বছরে আট হাজার মসজিদ নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। রাজধানী মস্কোতে আছে চারটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। পুরনো মসজিদ ভেঙে মস্কোতে গড়ে তোলা হয়েছে ছয় তলাবিশিষ্ট সুদৃশ্য এক মসজিদ কমপ্লেক্স। এর নাম মস্কো ক্যাথিড্রাল মসজিদ। এই মসজিদে প্রায় ১০ হাজার মানুষ একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। আশপাশের সড়ক বন্ধ করে দিয়ে আড়াই লাখ মুসলমান ঈদের নামাজ আদায় করে থাকেনও বলে জানা যায়।

মস্কো ক্যাথিড্রাল মসজিদ, ছবি: সংগৃহীত।

মস্কো ক্যাথিড্রাল মসজিদটি নির্মানে ব্যয় হয় ১৭০ মিলিয়ন ডলার। মসজিদটিতে রয়েছে- নামাজের স্থান, বিভিন্ন ছোট বড় হল, মিলনায়তন, গ্রন্থাগার, মিউজিয়াম ও প্রদর্শনীর গ্যালারি। ২০১৫ সালে রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ও ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে নিয়ে এ মসজিদ কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন।

রাশিয়ার মুসলমানরা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। সৌদি অর্থ সহায়তায় ইতোমধ্যেই কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বর্তমানে তাতার, বাশকির, চেচেন ছাড়াও রাশিয়ার স্থানীয় অধিবাসীরা ব্যাপকভাবে পবিত্র কুরআন চর্চায় এগিয়ে এসেছেন। এটা রুশ সমাজে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে তাৎপর্যপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রাখছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক রুশ মুসলিম হজ ও উমরাহ পালন করতে যান। ২০০৬ সালে ১৮ হাজার মুসলমান রুশ ফেডারেশন থেকে হজব্রত পালন করেন।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com