২রা মার্চ, ২০২১ ইং , ১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৭ই রজব, ১৪৪২ হিজরী

সংঘর্ষ, মারামারি ও বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ ভোট

তৃতীয় ধাপে পৌরসভা নির্বাচন

সংঘর্ষ, মারামারি ও বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ ভোট

পাথেয় টোয়েন্টিফের ডটকম :  সংঘর্ষ, মারামারি ও ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে তৃতীয় ধাপে ৬৪টি পৌরসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অবশ্য অনেক পৌরসভায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট শেষ হয়েছে। শনিবার সকাল আটটা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে চলে বিকেল চারটা পর্যন্ত। ভোট গ্রহণ শেষে এখন চলছে ভোট গণনা। কটিয়াদীতে সংঘর্ষ, রামগঞ্জে গোলাগুলি, ধুনটে ও ফেনীতে প্রার্থীকে মারধর এবং গৌরীপুরে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সিংড়া, দর্শনা, কটিয়াদী, কলারোয়া, সরিষাবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি পৌরসভায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

বেশ কিছু নির্বাচনী এলাকায় সংঘর্ষ, গোলাগুলি, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টাসহ বিভিন্ন অনিয়ম  ও বর্জনের মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার শেষ হয়েছে তৃতীয় ধাপের পৌর নির্বাচন। তবে অনেক পৌরসভায় ব্যাপক ভোটার উপস্থিতিসহ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হতেও দেখা গেছে।

রাতের ভোট ঠেকাতে সকালে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালট পেপার পাঠানো হলেও কিছু কেন্দ্র্রে প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা নিজেরাই সিল মেরে ভোটের বাক্স ভরে দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। মুন্সীগঞ্জে জোর করে ব্যালট ছিনিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মারা ঠেকাতে না পারায় এক সহকারী প্রিসাইডিং ও এক পোলিং অফিসারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এদিকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আম্মাতুন্নেছা কিন্ডারগার্টেন স্কুল কেন্দ্রে পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের  সমর্থকরা গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুলিশের গাড়িতে হামলা চালিয়েছে। হামলায় মির্জাপুর থানার ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ওই কেন্দ্রের ভোটগণনা শেষে ফেরার পথে এ হামলার ঘটনা ঘটে।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম কাজিরখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনের সড়কে গোলাগুলি ও দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুলিশের এসআইসহ কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছে। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হামলায় নারীসহ ১০ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রে সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী বা প্রতিপক্ষ দলের মেয়র প্রার্থীর, কোথাও আবার কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ  হয়। দুপুরে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের টামটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে আনোয়ার হোসেন ও শামীম হোসেন নামের দুই এজেন্টকে আটক করা হয়। এই কেন্দ্র দখলের চেষ্টায় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে সকালে ১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী যুবলীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন রাজু ও ছাত্রলীগ নেতা কামরুল হাসান ফয়সাল মালকে আটক করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ পৌর নির্বাচনে মাঠপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার কৃষি ব্যাংকের জুনিয়র আফিসার ইমরান আলী ও পোলিং অফিসার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অফিস সহকারী মজিবুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। তাঁদের সামনে নৌকার ব্যালটে অবৈধভাবে সিল মারা হচ্ছিল।

ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি ওয়ার্ডের দুজন কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাতেম খান।

বগুড়ার নন্দীগ্রামে ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করে নৌকা মার্কায় সিল মারার অভিযোগে ৫০টি ব্যালট পেপার বাতিল করা হয়। এ সময় ওই অপকর্মের জন্য নন্দীগ্রাম সরকারি মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ওসমান গনি সরকার বেলালকে আটক করা হয়। দুপুরে নন্দীগ্রাম হাজি ওয়াজেদ আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করেন। ফেনীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীসহ দুই প্রার্থীকে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরিশালের গৌরনদীতে ব্যাপক নিরাপত্তাবলয়ে ভোটগ্রহণ হলেও কেন্দ্রের ভেতরে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। নৌকার সমর্থকরা বিএনপির প্রার্থীকে দুটি কেন্দ্রে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে দুপুরে ভোট বর্জন করেন তিনি।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে বিএনপির প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে অনিয়মের বেশ কিছু অভিযোগ আনলেও নির্বাচন বর্জন করেননি। টাঙ্গাইলের মধুপুরে কেন্দ্র দখল করে কিশোরদের দিয়ে ব্যালটে সিল মারা, ভোটারদের নৌকা প্রতীক দেখিয়ে সিল মারতে বাধ্য করা, এজেন্টদের বের করে দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে দুপুরেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বিএনপির প্রার্থী আবদুল লতিফ পান্না। নাটোরের সিংড়ায় ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপির প্রার্থী তায়জুল ইসলাম।

ভোট জালিয়াতি ও ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে নির্বাচন বর্জন করেন বিএনপির প্রার্থী। আরইউটি উচ্চ বিদ্যালয় (৪ নম্বর) কেন্দ্রে ব্যালট পেপার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রটি স্থগিত ও ব্যালট পেপার চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রিসাইডিং অফিসারসহ তিনজন এবং ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীর সমর্থকদের হট্টগোলে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া  দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

টাঙ্গাইলের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাকরাইল প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে তিন কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। জোর করে নৌকা প্রতীকে সিল মারা এবং ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগে বগুড়ার শিবগঞ্জে ভোট বর্জন করেছেন বিএনপির প্রার্থী মতিউর রহমান মতিন। বগুড়ার ধুনট পৌর নির্বাচনে অবৈধভাবে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত নৌকা প্রতীকের কর্মীসহ দুজনকে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন।

ঝালকাঠির নলছিটিতে বহিরাগতদের কেন্দ্র দখল, ভোটারদের কাছ থেকে ব্যালট কেড়ে নেওয়াসহ নানা অভিযোগে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী (স্বতন্ত্র) কে এম মাছুদ খান ও বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মো. মজিবুর রহমান নির্বাচন বর্জন করেন।

কিশোরগঞ্জে স্থগিত কেন্দ্রের ভোট এবং কটিয়াদীতে নির্বাচন বর্জন করেন বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা। পাবনার বালিয়াহালট কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ এক যুবককে আটক করে।

মেয়র হলেন যাঁরা : ফেনীতে নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী (আওয়ামী লীগ), চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় মতিয়ার রহমান (আওয়ামী লীগ), বগুড়ার ধুনটে এ জি এম বাদশাহ (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী), টাঙ্গাইলের মধুপুরে সিদ্দিক হোসেন খান (আওয়ামী লীগ), মৌলভীবাজারে মো. ফজলুর রহমান (আওয়ামী লীগ), সাতক্ষীরার কলারোয়ায় মনিরুজ্জামান বুলবুল (আওয়ামী লীগ), যশোরের মণিরামপুরে কাজী মাহমুদুল হাসান (আওয়ামী লীগ), নড়াইল সদরে আঞ্জুমান আরা (আওয়ামী লীগ) ও কালিয়ায় ওয়াহিদুজ্জামান হীরা (আওয়ামী লীগ), বরগুনার পাথরঘাটায় মো. আনোয়ার হোসেন আকন (আওয়ামী লীগ), দিনাজপুরের হাকিমপুর পৌরসভা নির্বাচনে জামিল হোসেন চলন্ত (আওয়ামী লীগ), টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে মো. মাসুদুল হক মাসুদ (আওয়ামী লীগ), বগুড়ার শিবগঞ্জে তৌহিদুর রহমান মানিক (আওয়ামী লীগ), নন্দীগ্রামে আনিছুর রহমান (আওয়ামী লীগ), কাহালুতে আব্দুল মান্নান (বিএনপি), গাবতলীতে সাইফুল ইসলাম (বিএনপি), বরগুনায় কামরুল আহসান মহারাজ (আওয়ামী লীগ), কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জি এম মীর হোসেন মীরু (আওয়ামী লীগ), বরুড়ায় বকতার হোসেন (আওয়ামী লীগ), চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে আ স ম মাহবুব-উল আলম লিপন (আওয়ামী লীগ), ঝালকাঠির নলছিটিতে আবদুল ওয়াহেদ খান (আওয়ামী লীগ), ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে মো. আব্দুছ ছাত্তার (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী), গৌরীপুরে সৈয়দ রফিকুল ইসলাম (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী), নাটোরে জান্নাতুল ফেরদৌস (আওয়ামী লীগ), নওগাঁর ধামইরহাটে মো. আমিনুর রহমান (আওয়ামী লীগ), রাজবাড়ীর পাংশায় মো. ওয়াজেদ আলী (আওয়ামী লীগ), রাজশাহীর কেশরহাটে শহিদুজ্জামান শহিদ (আওয়ামী লীগ), সিলেটের গোলাপগঞ্জে আমিনুল ইসলাম রাবেল (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী), জকিগঞ্জে আব্দুল আহাদ (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী), কুড়িগ্রামের উলিপুরে মামুন সরকার মিঠু (আওয়ামী লীগ), ময়মনসিংহের ভালুকায় ডা. এ কে এম মেজবাহ উদ্দিন কাইয়ুম (আওয়ামী লীগ), ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে সহিদুজ্জামান সেলিম (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে আবুল খায়ের পাটওয়ারী (আওয়ামী লীগ), মুন্সীগঞ্জে মোহাম্মদ ফয়সাল বিপ্লব (আওয়ামী লীগ), শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে মো. আবু বক্কর সিদ্দিক (আওয়ামী লীগ), নকলায় মো. হাফিজুর রহমান লিটন (আওয়ামী লীগ), টাঙ্গাইলের সখীপুরে আবু হানিফ আজাদ (আওয়ামী লীগ), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে মো. মুকিতুর রহমান রাফি (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী), পাবনায় শরীফ উদ্দিন প্রধান (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী), নওগাঁ সদর মো. নজমুল হক সনি (বিএনপি), ধামইরহাটে আমিনুর রহমান (আওয়ামী লীগ), নেত্রকোনার দুর্গাপুরে আলাউদ্দিন আলাল (আওয়ামী লীগ), জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে মনির উদ্দিন (আওয়ামী লীগ), চাঁপাইনবাবগঞ্জে রহনপুরে মতিউর রহমান খান (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী)।

নিউজটি শেয়ার করুন

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com